কর ফাঁকির তালিকায় সেলিব্রিটিরাও

0
454

জুটডয়েচে জাইটুং : প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ফাইল। সেখানে রয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ট্রাস্টের সম্পদ গোপনের খতিয়ান। কর ফাঁকি দিতে গোটা দুনিয়ার হাইপ্রোফাইল লোকজন নিজেদের কতটুকু সম্পদ গোপন করেছেন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে ফাইলগুলোয়। আর এ খতিয়ানগুলো লিপিবদ্ধ ছিল বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্ আইনি প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকার রেকর্ডে।

পানামাভিত্তিক এ আইনি উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানটির সহায়তায়ই এত সম্পদ লুকিয়ে ছিল এত দিন। কী করে যেন বেনামি এক উৎস থেকে এগুলোর খবর একসময় চলে যায় জার্মান পত্রিকা জুটডয়েচে জাইটুংয়ের কাছে, সেখান থেকে তা পৌঁছে যায় শতাধিক সাংবাদিকের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসের (আইসিআইজে) হাতে। সেখান থেকেই তা বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যমগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে। প্রকাশ পায় সম্পদ গোপনকারীদের তালিকা। নড়ে-চড়ে বসে গোটা বিশ্ব।

কর ফাঁকির তালিকায় প্রভাবশালী রাজনীতিক ব্যবসায়ী সেলিব্রিটিএ তালিকায় কে নেই? পাশের দেশ ভারতের সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন ও তার পুত্রবধূ ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন থেকে শুরু করে ফুটবলার লিওনেল মেসি— রীতিমতো চমকে ওঠার মতো সব নাম। তালিকার ১৪৩ রাজনীতিবিদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান আছেন ১২ জন। অন্যদিকে সাবেকদের সংখ্যা ৬০।

পানামা পেপারসের মধ্যে ২০০ কোটি ডলারের সম্পদ গোপনের একটি ঘটনার সব সূত্র ইঙ্গিত করছে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দিকে। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে বিদেশে মুদ্রা পাচারের এক ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু সের্গেই রলদুগিন। পাচার হওয়া এ অর্থ গিয়ে পৌঁছেছে এক স্কি রিসোর্টে, যেখানে ২০১৩ সালে পুতিনের মেয়ে ক্যাটরিনা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তবে ক্রেমলিন বিষয়টিকে উড়িয়ে দিয়েছে।

বিদেশে পাচার করা সম্পদ গোপনের এ তালিকায় রয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের তিন ছেলে, ইরাকের সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং সাবেক উপরাষ্ট্রপতি আয়াদ আলাওয়ি, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেট্রো পোরোশেঙ্কো, যুক্তরাষ্ট্রে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ইউক্রেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী পাবলো লাজারেঙ্কো, মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের ছেলে আলা মোবারক এবং আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমুন্ডুর ডেভিড গুনলাগসন।

বাদ যাননি নিজ দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পরিবারও। মোসাক ফনসেকার সহায়তায় মুদ্রা পাচারের অভিযোগ উঠেছে মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মুহাম্মদ এবং সৌদি বাদশা সালমানের বিরুদ্ধেও। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ এবং লিবিয়ার সাবেক নেতা মোয়াম্মার গাদ্দাফির ঘনিষ্ঠরাও আছেন তালিকায়।

সম্পদ গোপনকারীদের মধ্যে রয়েছেন নামি-দামি ক্রীড়াবিদরাও। তবে সবচেয়ে বেশি কলুষিত হয়েছে ফুটবল অঙ্গন। তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসি ও তার বাবার বিরুদ্ধে আগে থেকেই স্পেনের আদালতে কর ফাঁকির মামলা চলছিল। এবার জানা গেল মোসাক ফনসেকার সহায়তায় সম্পদের পরিমাণ গোপন করেছেন তারাও।

কর ফাঁকিদাতাদের তালিকায় উঠে এসেছে ফরাসি ফুটবল কিংবদন্তি মিশেল প্লাতিনির নামও। আরেকটি দুর্নীতির অভিযোগে তিনি এরই মধ্যে ফিফা থেকে ছয় বছরের জন্য বহিষ্কৃত।

ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা ফিফার এথিকস কমিটি নিজেই পড়ে গিয়েছে নীতিগত সংকটে। কারণ এথিকস কমিটির সদস্য হুয়ান পেদ্রো দামিয়ানিও ফাঁস হওয়া তালিকার অন্যতম। তালিকায় হাই প্রোফাইল ফুটবল খেলোয়াড়ের মধ্যে ম্যান ইউর আর্জেন্টাইন তারকা গ্যাব্রিয়েল হেইঞ্জও রয়েছেন।

মোসাক ফনসেকার সহযোগিতায় নিজ দেশের বাইরে সম্পদের পরিমাণ গোপন করে কর ফাঁকি দেয়াদের তালিকায় ভারতীয়দের উপস্থিতিও কম না। পাঁচশোর বেশি ভারতীয় ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ট্রাস্ট এ দুষ্কর্ম ঘটিয়েছে। এদের মধ্যে তিনশোর বেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ট্রাস্টের বিষয় নিশ্চিত করেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

এদের মধ্যে যেমন চিত্রতারকা অমিতাভ বচ্চন ও তার পুত্রবধূ সাবেক বিশ্বসুন্দরী ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন ধনকূবের গৌতম আদানির বড় ভাই বিনোদ আদানি। এদের মধ্যে অমিতাভ বচ্চন অভিনয়ের বাইরে চারটি শিপিং কোম্পানির পরিচালকের পদে নিযুক্ত রয়েছেন। আর ঐশ্বরিয়া পিতা, মাতা ও ভাইয়ের সঙ্গে অংশীদারিত্বে খোলা একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে ২০০৫ সালে নিয়োগ পেলেও তা বন্ধ হয়ে যায় ২০০৮ সালে।

ব্যবসায়ীদের মধ্যে রিয়েল এস্টেট জায়ান্ট কেপি সিং ও তার পরিবারের নয় সদস্যও এ তালিকায় আছেন। দেশটির রাজনীতিবিদদের মধ্যে সম্পদ গোপনকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন পশ্চিমবঙ্গের শিশির বাজোরিয়া এবং লোকসত্য পার্টির সাবেক দিল্লি ইউনিট প্রধান অনুরাগ কেজরিওয়াল।

এ তালিকায় আরো আছেন মুম্বাইয়ের গ্যাংলর্ড ইকবাল মিরচি। তালিকার অনেকের ব্যাপারে কোনো ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি। তবে জল আরেকটু ঘোলা হলে আরো অনেক রাঘববোয়ালের নাম উঠে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সন্দেহ করা হচ্ছে বিভিন্ন ক্রিকেট ফ্র্যাঞ্চাইজিও কোনো না কোনোভাবে নাম গোপন করে সম্পদ লুকিয়েছে। ভারতের সিবিআই এবং আয়কর বিভাগ এরই মধ্যে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তদন্ত করছে। এর সঙ্গে মোসাক ফনসেকার তালিকা মেলালে আরো অনেকের গুমর ফাঁস হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here