অর্থ চুরির একটি ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংককে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার, ব্যাংকটির গভর্নর ও দুই ডেপুটি গভর্নরের অপসারণের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। আর ‘ভীষণ অযোগ্য’ আখ্যা লাভের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, তার উল্লেখ অবান্তর।

এরই মধ্যে ‘সবচেয়ে বড় সাইবার চুরি’ হিসেবে অভিধা পাওয়া ঘটনাটি এমন এক গোলকধাঁধা সামনে হাজির করেছে, যার পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করছেন ব্যাংকার, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।

গত ৫ ফেব্রুয়ারির পর ব্যাংক, ক্যাসিনো, কম্পিউটার আর কোটি ডলারের সমন্বয়ে এমন এক নাটকীয়তায় ঘটনাগুলো উন্মোচিত হয়েছে, যা হলিউডি সিনেমা থেকে কোনো অংশে কম নয়। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপত্তাবেষ্টিত লেনদেন ঘরের প্রিন্টারটি নষ্ট অবস্থায় পাওয়া যায়। ফলে কর্মকর্তারা আগের দিনের লেনদেনের তালিকা সংগ্রহে ব্যর্থ হন।

পরদিন কর্মকর্তারা ব্যর্থ হন সুইফট সিস্টেমে ঢুকতে, যেখানে বারবার এ বার্তা দেয়া হচ্ছিল যে, ‘একটি ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বা পরিবর্তিত হয়েছে।’ এর পর ৭ ফেব্রুয়ারি ছিল রোববার, যুক্তরাষ্ট্রে ছুটির দিন। আর বাংলাদেশের জন্য সপ্তাহের শুরুর দিন। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পক্ষে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

বিষয়টি গড়িয়ে যায় সোমবার পর্যন্ত। পুরো ঘটনাটিতে সময়ের ব্যবহার ছিল মুগ্ধ হওয়ার মতো। কারণ চীনা নববর্ষ উদযাপনের জন্য সোমবার ছিল ফিলিপাইনের সরকারি ছুটির দিন। আর এ সময়ের মধ্যে ফেডারেল রিজার্ভের বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ফিলিপাইনের ক্যাসিনো ও শ্রীলংকার এনজিওতে টাকা স্থানান্তর করা হয় মোট ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। সেতু, বিদ্যুেকন্দ্র ও ঢাকা মেট্রোসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের নামে এ অর্থ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে বেরিয়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে দোষারোপ করেছে। ফেডারেল রিজার্ভ লেনদেনটি করেছে, কারণ তাদের তা করতে বলা হয়েছে। এভাবেই সুইফটের মতো স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিগুলো কাজ করে থাকে। আর যেহেতু ওই অর্থ ফিলিপাইনের ক্যাসিনোয়  গেছে, সেহেতু দেশটির কর্তৃপক্ষ হারিয়ে যাওয়া ওই অর্থ শনাক্ত করতে পারেনি। কারণ ফিলিপাইনে ক্যাসিনোর ওপর অর্থ পাচাররোধী (অ্যান্টি মানি লন্ডারিং) আইন প্রযোজ্য নয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যে ব্যাংকের (আরসিবিসি) শাখা থেকে ওই অর্থের সিংহভাগ উত্তোলন করা হয়েছে সেখানকার ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা ছিল নষ্ট।

এ সাইবার চুরির ঘটনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দায়িত্বের বিষয়টি নির্ধারণ করা। লেনদেনের পুরো চক্রটিতে হতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ জড়িত। অথবা একটি ম্যালওয়্যার, ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিরাপত্তা বিষয়ে চরম অবহেলা কিংবা হতে পারে গোটা নিরাপত্তা কাঠামোরই ত্রুটি।

দ্বিতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, ব্যাংকিং খাতের লেনদেনের জন্য স্বয়ংক্রিয় বার্তা আদান-প্রদানের নিরাপত্তা-বিষয়ক প্রশ্নটি। এ ঘটনা একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের পদ্ধতি সম্পর্কেও প্রশ্ন হাজির করেছে, যা মূলত তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্যের নিরাপত্তার মূলনীতির ওপর নির্ভরশীল।

আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং অনলাইনে অর্থ স্থানান্তর অনুমোদনের জন্য সুইফটের ওপর নির্ভর করে। আলোচ্য ঘটনায় স্বত্বভোগী অ্যাকাউন্টগুলোকে স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকলের মাধ্যমে সুইফটই অনুমোদন দিয়েছে। যদিও সুইফট বার্তা পাঠানোর কোড চুরির তত্ত্বটি পুরো নিরাপত্তা কাঠামোকে ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে।

ওই অর্থ ফিলিপাইনের ক্যাসিনোগুলোয় গেছে। আর এটি বিস্ময়ের কিছু নয় যে, ফিলিপাইনের ক্যাসিনোগুলো অ্যান্টি মানি লন্ডারিং আইনের অধীন নয়। এ আইনি অস্ত্রের অনুপস্থিতিই হচ্ছে তৃতীয় চ্যালেঞ্জ। এটি তদন্তকে অনেক জটিল করে তুলেছে। কারণ ক্যাসিনোগুলো তদন্তে অংশ নিতে বা সহায়তা করতে বাধ্য নয়। নীতিগতভাবে তদন্ত সেখানেই বন্ধ হয়ে যাবে, যেখান থেকে ওই অর্থ আর্থিক খাত থেকে বেরিয়ে গেছে, আর তা হারিয়ে যাবে অবৈধ অর্থ পাচার নেটওয়ার্কের অন্ধকারে।

এটি একটি সত্যিকারের বহুজাতিক অপরাধ। পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত মেধা, সময় নির্বাচন ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে নিশ্ছিদ্রভাবে নকশা করা হয়েছে। পুরো ব্যাংকিং খাতই জড়িতদের নখদর্পণে। এমনকি সুইফট বার্তা প্রেরণের অনুমোদনও তাদের থাকতে পারে। যেসব অ্যাকাউন্ট এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, তা ২০১৫ সালের মে মাসে খোলা হয়েছে। লেনদেনের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের ছুটির দিনের পার্থক্যকে বিবেচনায় নিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পরদিনই ছিল চীনা নববর্ষের ছুটি। পুরো অর্থটি হারিয়ে গেছে ফিলিপাইনের ক্যাসিনোয়, যা আইনের আওতার বাইরে একেবারে।

এ ঘটনা বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোর মধ্যে অর্থ লেনদেনের অনুমোদন, বার্তা প্রেরণ, সাইবার ও তথ্যনিরাপত্তার পদ্ধতি পুনঃনিরীক্ষণের প্রয়োজনীয়তার দাবি নিয়ে হাজির হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বহু আইন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বকে এড়িয়ে এ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।

এমনকি যদি তদন্তে এ অর্থ চুরির পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণও উঠে আসে, তাহলেও বিচারিক সংস্কৃতি, দায়িত্ব, সাইবার ও অর্থ পাচারসংশ্লিষ্ট অপরাধ রোধে আন্তর্জাতিক আইনের ত্রুটি আরেকটি বাংলাদেশ ব্যাংক আরেক বিলিয়ন ডলার লোপাটের জন্য অপেক্ষমাণ থাকবে।

লেখক: মুনিশ শর্মা, আইডিএসএর অ্যাসোসিয়েট ফেলো।

(ভারতের ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের (আইডিএসএ) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মন্তব্য, প্রতিবেদনের জন্য ভাষান্তর)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here