মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের দৈর্ঘ্য নিয়ে বিবাদ

0
1300
ডেস্ক রিপোর্ট : গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী (মেয়র মোহাম্মদ হানিফ) ফ্লাইওভার নিয়ে নতুন করে বিবাদে জড়িয়েছে ওরিয়ন গ্রুপ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ওরিয়নের দাবি, ফ্লাইওভারটির দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৮ কিলোমিটার। যদিও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিমপ্লেক্সের তথ্য উল্লেখ করে ডিএসসিসি বলছে, এর দৈর্ঘ্য আট কিলোমিটার।
১১ দশমিক ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ধরে ওরিয়ন যে আরবিট্রেশন মামলা করেছে, তাকে চ্যালেঞ্জ করে পরবর্তী শুনানিতেই এ-সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ জমা দিতে যাচ্ছেন ডিএসসিসির আইনজীবীরা।

HANIF FLYOVERখোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের সর্বশেষ অনুমোদিত ব্যয় ২ হাজার ১০৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। আর অনুমোদিত দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৪ কিলোমিটার। তবে দৈর্ঘ্য বেড়ে ১১ দশমিক ৮ কিলোমিটার হয়েছে— এ যুক্তিতে প্রায় ১ হাজার ১৭৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয় বাড়ানোর দাবি করে ওরিয়ন। এতে ফ্লাইওভারের ব্যয় দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৮৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। তবে এ প্রস্তাবে রাজি হয়নি ডিএসসিসি। পরে এ নিয়ে আরবিট্রেশন মামলা করে ওরিয়ন।

ফ্লাইওভারটি নির্মাণে ২০১০ সালে ভারতের সিমপ্লেক্সকে নিয়োগ দেয় ওরিয়ন। প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ তিনটি বার্ষিক প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের দৈর্ঘ্য আট কিলোমিটার। এ-সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ আরবিট্রেশন মামলার পরবর্তী শুনানিতে জমা দেবে ডিএসসিসি।

এদিকে ওরিয়ন গ্রুপের ওয়েবসাইটে ফ্লাইওভারটির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে কনসেশনারি ঠিকাদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সিমপ্লেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের নাম। আর ফ্লাইওভারের দৈর্ঘ্য উল্লেখ করা হয়েছে নয় কিলোমিটার। যদিও প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটের আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, ফ্লাইওভারটির দৈর্ঘ্য ১১ কিলোমিটার। এছাড়া মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের ক্রেডিট রেটিং করেছে ক্র্যাব। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ফ্লাইওভারটির দৈর্ঘ্য উল্লেখ করা হয়েছে ১০ কিলোমিটার।

HANIF.. 3ডিএসসিসির আইন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিউল আলম আরিফ এ প্রসঙ্গে বলেন, আরবিট্রেশন মামলায় ফ্লাইওভারের দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৮ কিলোমিটার দাবি করেছে ওরিয়ন। সে অনুযায়ী ফ্লাইওভারের ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। টোলের হারও এ যুক্তিতে বাড়ানো হয়েছে। অথচ সিমপ্লেক্স বলছে, এর দৈর্ঘ্য ৮ কিলোমিটার। ফ্লাইওভারটির দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার কমলে ব্যয়ও এক-তৃতীয়াংশ কমে যাবে। সে অনুপাতে কমাতে হবে টোলের হারও। তাই ওরিয়নের দাবি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এজন্য আগামী শুনানিতে এ-সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ জমা দেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, ফ্লাইওভারের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির যুক্তিতে ব্যয় বাড়ানোর দাবি করে ২০১২ সালে আরবিট্রেশনে মামলা করে ওরিয়ন। ২০১৩ সালের অক্টোবরে উদ্বোধনের পর দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির যুক্তিতে টোলের হার বাড়ানো হলে তার বিপরীতেও পৃথক মামলা হয়। উভয় মামলাই চলমান।

ওরিয়নের সর্বশেষ হিসাব মতে, ১১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ফ্লাইওভারটি নির্মাণে মূল ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮০২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এর সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করা হয়েছে ব্যাংকঋণের বিপরীতে ইস্যুকৃত অগ্রাধিকার শেয়ারের লভ্যাংশ ৪৮৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২৮৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তিতে ফ্লাইওভারের টোলও বাড়ানো হয়েছে যানবাহনভেদে ৭০-১০০ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল বলেন, ফ্লাইওভারের নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি এখন আর সিটি করপোরেশনের হাতে নেই। মামলা করায় বিষয়টি এখন আদালতের ওপর নির্ভর করছে। তবে সিটি করপোরেশন তার যুক্তি তুলে ধরবে। আদালত ব্যয় বৃদ্ধি যুক্তিসঙ্গত মনে করলে ওরিয়নের প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে। তা না হলে বাতিল হয়ে যাবে। সে অনুযায়ী টোলের হারও পুনর্নির্ধারণ করা হবে।

ফ্লাইওভারটি নির্মাণে ২০০৫ সালে চুক্তি করে তৎকালীন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন ও বেলহাসা-একম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস। এর মধ্যে ওরিয়নের শেয়ার ছিল ৫ শতাংশ। ওই সময় যাত্রাবাড়ী থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত ফ্লাইওভারটির দৈর্ঘ্য ধরা হয় সাত কিলোমিটার। তবে নকশায় ত্রুটির কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এর নির্মাণ বন্ধ করে দেয়া হয়।

পরবর্তী মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পুনরায় ফ্লাইওভারের কাজ শুরু করা হয়। তবে গুলিস্তানের পরিবর্তে এটিকে ফুলবাড়িয়া এলাকার আনন্দবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়। আর পাঁচ বছর বন্ধ থাকার পর ২০১০ সালে বিদেশী অংশীদারকে বাদ দিয়ে ওরিয়ন একাই ফ্লাইওভার নির্মাণ শুরু করে। আর ঋণ নেয়া হয় স্থানীয় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে।

২০১০ সালের জুলাইয়ে ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য সিমপ্লেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে ওরিয়ন। চুক্তি অনুযায়ী, ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য সিমপ্লেক্সকে প্রায় ৭৮৮ কোটি ৯০ হাজার টাকা দেয়ার কথা গ্রুপটির।

বিল্ড ওন অপারেট ট্রান্সফার (বিওওটি) পদ্ধতিতে ফ্লাইওভারটি নির্মাণ করেছে ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। আর নির্মাণ তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ডিএসসিসি। ২০১৩ সালের অক্টোবরে ফ্লাইওভারটির আংশিক খুলে দেয়া হয়। আর পুরো কাজ শেষ হলে ফ্লাইওভারটি পূর্ণাঙ্গভাবে খুলে দেয়া হয় ২০১৪ সালে। ১৩টি র্যাম্পযুক্ত চার লেনবিশিষ্ট ফ্লাইওভারের টোল থেকে ২৪ বছরে মুনাফাসহ নির্মাণ ব্যয় তুলে নেবে ওরিয়ন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here