৭ বছরের সর্বোচ্চ দামে চিনি বিক্রি, তবুও উধাও

0
701

বিশেষ প্রতিনিধি : রমজান শুরুর দু’দিনের মাথায় বাজার থেকে চিনি প্রায় উধাও। সরকারের সরবরাহ থাকলেও খুচরা ও পাইকারি কোনো বাজারে খোলা চিনি মিলছে না। এ ক্ষেত্রে খোলা চিনির ক্রেতারা বিপাকে পড়েছেন।

বিশেষ করে বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁ, মিষ্টি ও ইফতারির দোকানসহ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করেন এমন ক্রেতাদের সংকটে পড়তে হচ্ছে। দু-একটি দোকানে মিললেও তা ৭৮ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। খোলা বাজারে প্রতি কেজি চিনি ২০ টাকা বেশিতে বিক্রি হলেও ৫৫ টাকায় বিক্রি করছে টিসিবি।

২০১১ সালে সর্বোচ্চ ৭২ থেকে ৭৪ টাকায় চিনি বিক্রি হয়েছিল। গত সাত বছরের মধ্যে এবারই সর্বোচ্চ দর। চড়া দামের কারণে গত কয়েক দিন ধরে রাজধানীর বাজারগুলোতে অনেক মুদি দোকানি চিনি বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। কিছু কিছু দোকানে থাকলেও তা বেশিরভাগই প্যাকেট চিনি। এ চিনি অতিরিক্ত দামে অল্প পরিমাণে বিক্রি করছেন তারা।

এদিকে কোম্পানিগুলো ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত চিনির দাম বাড়িয়েছে। প্রতি কেজি খুচরা মূল্য ৭২ টাকা থেকে পরিবর্তন করে ৭৩ টাকা করা হয়েছে। প্যাকেট চিনি খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৭৩ থেকে ৭৮ টাকায়। টাউন হল বাজারের বিক্রেতারা জানান, যখন যে দামে পারছেন সে দামেই বিক্রি করছেন। কারণ প্রতি কেজি প্যাকেট চিনি ডিলারদের কাছ থেকে ৭২ টাকায় কিনতে হয়েছে।

কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা ফারুক হোসেন জানান, প্রতি কেজি প্যাকেট চিনি ৭১ টাকায় কিনেছেন। এর চেয়ে কম দামে চিনি পাচ্ছেন না। এ কারণে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। এ বাজারে অন্যান্য খুচরা বিক্রেতারাও একই কথা বলেন।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মগবাজার, হাতিরপুল, মোহাম্মপুর টাউনহল ও মিরপুর শাহআলী বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ খুচরা দোকানে খোলা চিনি নেই। বিক্রেতারা বলেন, অল্প পরিমাণে প্যাকেট চিনি বিক্রি হলেও বাজারের অনেক দোকান থেকে উধাও হয়ে গেছে চিনি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা আতঙ্কে খুচরা বিক্রেতারা খোলা চিনি নেই বলছেন।

তবে বাড়তি দামে কিছু দোকানি চিনির ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। মঙ্গলবার চিনি নিয়ে পাইকারি ও খুচরা দোকানগুলোতে দিনভর চলেছে চিনি আছে, চিনি নেই নাটক। বেশি দাম দিলে আছে। কম দাম হলে নেই।

খোলা চিনি কারওয়ান বাজারের পাইকারিতে বিকেলে ৩ হাজার ৭০০ টাকা বস্তায় (৫০ কেজি) বিক্রি হয়েছে। এতে কেজিতে দাম পড়ছে ৭৪ টাকা। সকালে বিক্রি হয় ৩ হাজার ৭৫০ টাকা, এ হিসাবে কেজি ৭৫ টাকা। তবে মৌলভীবাজারে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এই দামে কেনাবেচার কোনো চালান দিচ্ছেন না পাইকাররা।

তারা বলছেন, মিল থেকে তারা চিনি পাচ্ছেন না। গাড়ি গেলে ফেরত আসছে। সেখান থেকে কেউ কেউ চিনি নিয়ে বেশি দামে বাজারে ছাড়ছেন। এ কারণে চালানের মাধ্যমে বিক্রি সম্ভব হচ্ছে না। আর এ জন্য বাজারে চিনি আছে, চিনি নেই খেলা চলছে। যে বেশি দামে চিনি গোপনে কিনছেন তাকে দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ ক্রেতাদের কাছে খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে না।

চিনি পরিশোধনকারী বড় প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, গত রোববার তাদের মিল থেকে ২ হাজার ৮৪০ টন চিনি সরবরাহ করা হয়েছে। আজও (মঙ্গলবার) প্রায় সমপরিমাণ চিনি সরবরাহ করা হয়। তিনি বলেন, এখন মিল থেকে প্রতি কেজি চিনি ৫৮ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। মিল থেকে চিনি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা মজুদ রেখে অতিরিক্ত মুনাফা করছেন।

পুরো রোজার মাসে চিনির চাহিদা ২ লাখ টন। গত ৩ মাসে গড়ে প্রতি মাসে পৌনে ২ লাখ টন করে চিনি আমদানি হচ্ছে। এ মাসে ৩টি জাহাজে ১ লাখ ৭০ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছে। এ হিসাবে আমদানি চিনি পর্যাপ্ত পরিমাণ দেশে এসেছে। এ চিনি দিয়ে রমজানের পরেও তিন মাসে কোনো ঘাটতি হবে না। এর পরও গত দু’দিন ধরে বাজারে সংকট চলছে।

মিল গেটে ৫৮ টাকার চিনি দোকানে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে কেজিতে দামের ব্যবধান ২০ টাকায় পেঁৗছেছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, সঠিক বাজার মনিটরিং করা হলে সব কিছু স্বাভাবিক হবে।

বাজার মনিটরিংয়ের বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শফিকুল ইসলাম লস্কর বলেন, নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে। এ ধরনের কোনো অভিযোগ বা প্রমাণ তারা পাননি। এভাবে বাজারে কৃত্রিম সংকট বা বাড়তি দামে বেচাকনা হলে বাজার তদারকির মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে ক্রেতাদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে খোলাবাজরে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) চিনি বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায়। পাশাপাশি মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ ব্র্যান্ডের চিনি ও সিটি গ্রুপের তীর ব্র্যান্ডের চিনি খোলা ট্রাকে বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। রমজানের শুরু থেকে রাজধানীর ১০টি পয়েন্টে কোম্পানি দুটি প্রতি দিন ৫০ টন করে ১০০ টন চিনি বিক্রি করছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here