বিশেষ প্রতিনিধি : ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের সঙ্গে বেড়েছে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির প্রভিশন ঘাটতি। মার্চ প্রান্তিকের মতোই গত জুনে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ৬ ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ব্যাংক তিনটির ঘাটতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়ে ৮ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকায় উঠেছে।

মার্চে এসব ব্যাংকে ৭ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি ছিল। মূলত নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলোর এ পরিস্থিতি।

ঋণের শ্রেণিমান অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। সাধারণ ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে শুরু করে ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন রাখার বিধান রয়েছে। শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের বিপরীতে ২০, ৫০ ও ১০০ ভাগ হারে প্রভিশন রাখতে হয়।

ব্যাংকগুলোর অর্জিত মুনাফা অথবা উদ্যোক্তাদের জোগান দেওয়া মূলধন থেকে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। সাধারণভাবে প্রভিশন ঘাটতি থাকা অবস্থায় কোনো ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে পারে না। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংককে কয়েক ধাপে প্রভিশন সংরক্ষণের সুযোগ দিয়ে লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী সামগ্রিক ব্যাংক খাতে জুন শেষে ৪৩ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা প্রভিশন রাখার বাধ্যবাধকতা ছিল। ছয় ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের ঘাটতির কারণে সংরক্ষণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। এতে সামগ্রিক ব্যাংক খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। গত মার্চে ৪১ হাজার ৯২১ কোটি টাকা প্রভিশন রাখার প্রয়োজনের বিপরীতে ব্যাংকগুলো ৩৬ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা সংরক্ষণ করে। তখন সামগ্রিক খাতে ঘাটতি ছিল ৫ হাজার ২৩২ কোটি টাকা।

ঘাটতির তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে নানা অনিয়মের কারণে আলোচিত বেসিক ব্যাংক। ব্যাংকটির ঘাটতি বেড়ে তিন হাজার ৮০ কোটি টাকা হয়েছে। তিন মাস আগে ব্যাংকটির ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। নানা অনিয়মের কারণে আলোচিত আরেক ব্যাংক সোনালীর ঘাটতি ৭০৬ কোটি টাকা বেড়ে ২ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা হয়েছে।

আগের মতোই রূপালী ব্যাংকের ঘাটতি রয়েছে এক হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। মাত্র তিন মাসে ব্যাংকটির ঘাটতি ২১৬ কোটি টাকা বেড়ে ৭২৭ কোটি টাকা হয়েছে।

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ঘাটতি ২৯০ কোটি টাকা থেকে সামান্য কমে ২৬৯ কোটি টাকায় নেমেছে। আরেক ব্যাংক প্রিমিয়ারের ঘাটতি ২১৩ কোটি টাকা থেকে কমে ১৭৫ কোটি টাকা হয়েছে।

জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ দাবি করেন, তাদের প্রভিশন ঘাটতি কমলেও তথ্যগত ভুলে বেশি দেখানো হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে সোনালী ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দেখানো হয়েছে দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকা। তবে বাস্তবে ব্যাংকটির ঘাটতি রয়েছে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ আদায় জোরদারের মাধ্যমে এই ঘাটতি আরও কমানোর জন্য তারা চেষ্টা করছেন। আগামী প্রান্তিকে ঘাটতি আরও কমবে বলে তিনি আশা করেন।

গ্রাহকদের নানা সুবিধা দিয়েও খেলাপি ঋণ কমাতে পারছে না ব্যাংকগুলো। বিশেষ সুবিধায় প্রচুর ঋণ পুনর্তফসিলের পরও খেলাপি ঋণ বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে ব্যাংক খাতে ৭০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্তফসিল হয়েছে। বড় গ্রাহকদের পুনর্গঠন করা হয়েছে আরও ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ। এর পরও খেলাপি ঋণ বেড়ে গত জুনে ৭৪ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা হয়েছে।

তিন মাস আগের তুলনায় যা ৭৩৯ কোটি এবং এক বছর আগের চেয়ে ১০ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা বেশি। যদিও গত তিন মাসে মোট ঋণ বেড়ে ৭ লাখ ৩১ হাজার ৬২৬ কোটি টাকায় উঠেছে। এতে করে শতকরা হারে খেলাপি ঋণ সামান্য কমে ১০ দশমিক ১৩ শতাংশে নেমেছে। গত মার্চে মোট ঋণের ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ ঋণ খেলাপি ছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here