‘২০১৮ সালে শীর্ষে যাবে রূপালী ব্যাংক’

0
656

সেবার মানের দিক দিয়ে শীর্ষে নিয়ে যেতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আতাউর রহমান প্রধান। ব্যাংকের সব অনিয়ম দূর করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তিনি আশবাদী। ব্যাংকটিকে সেবার মানের দিক থেকে শীর্ষে নিয়ে যাওয়াই তার মূল লক্ষ্য। পাশাপশি দৃঢ়তার সঙ্গে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার কথাও জানালেন। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে স্টক বাংলাদেশকে এসব কথা বলেন তিনি।

১৯৮৪ সালে অর্থনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে সোনালী ব্যাংকে যোগদানের মাধ্যমে তার ব্যাংকিং ক্যারিয়ার শুরু হয়। সোনালী ব্যাংকে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন গ্রেডে পদোন্নতি পেয়ে সর্বশেষ উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তবে রূপালী ব্যাংকে যোগদানের আগে তিনি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে এম কম ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন-২০১৮ এ গণতান্ত্রিক ঐক্য পরিষদ থেকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংখ্যক ১২হাজার ৯৬৭ ভোট পেয়ে ১ম হয়েছেন। রূপালী ব্যাংকে যোগদান করেই তিনি ব্যাংকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি ও সাত বীরশ্রেষ্ঠের আবক্ষ প্রতিমূর্তি স্থাপন করেন। তার সঙ্গে আলাপচারিতার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো-

  • রূপালী ব্যাংককে শীর্ষে নিতে চান। সেই লক্ষেই কাজ করছেন। এই শীর্ষে নেয়া বলতে কি বোঝাতে চেয়েছেন?

মো. আতাউর রহমান প্রধান : রূপালী ব্যাংক এক নম্বর হতে চায়, তবে এর মানে এই নয় -হাজার কোটি টাকা মুনাফা করব। এক নম্বর মানে এই নয় যে, দুই হাজার শাখা খোলা হবে। আমরা ভালোমানের আমানত সংগ্রহ করতে চাই। সেবার মানের দিক থেকে আমরা শীর্ষে যেতে চাই।

আতাউর রহমান প্রধান, এমডি

গত বছর আমরা বলেছিলাম রূপালী ব্যাংক ঘুরে দাড়াবে। আমরা সেখানে সফল হয়েছি। এবারে আমাদের শ্লোগান হচ্ছে ‘শীর্ষে যাবার’। শীর্ষে যাবার কোন সীমাবদ্ধতা আসলে নেই। শীর্ষে মানে সবার উপরে- তা নয়। যেখান থেকে গ্রাহকরা বলবে, রূপালী ব্যাংকের সেবার মান অনেক ভাল। আমরা চাই আমাদের নন পারফর্মিং লোনকে কমিয়ে সিঙ্গেল ডিজিটে নিয়ে আসতে।

পারত পক্ষে নতুন করে আর যেন কোন ঋণ খেলাপি না হয়। আমরা এসএমই সেক্টরে লোন দিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। বড় বড় লোন না দিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লোন দিয়ে সব অঞ্চলে যেন টেকসই উন্নয়ন হয়, সেই চেষ্টা করছি। ইতিমধ্যে সে লক্ষ আমরা অর্জন করতেও সক্ষম হয়েছি।

আমাদের লক্ষগুলো যখন অর্জন করতে পারবো, গ্রাহক যখন সন্তুষ্ট হবে, রূপালী ব্যাংক যখন লাভজনক ব্যাংকে পরিণত হবে, তখনই আমরা মনে করবো শীর্ষে পৌছাতে পেরেছি। আমার মতে, শীর্ষে যাওয়া কখনোই থেমে থাকা নয়। এটা চলমান থাকবে।

  • দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং জনপ্রিয় হচ্ছে, সে বিষয়ে আপনি কি ভাবছেন?

মো. আতাউর রহমান : এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করতে হবে। এটি আমাদের এখন অগ্রাধিকার। কারণ সব জায়গায় আর শাখা নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

  • রূপালী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাই?

আতাউর রহমান : রূপালী ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি অবশ্যই অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় ভাল। আর্থিক যে রিফ্লেকশনগুলো আছে, সেগুলোতো থাকবেই। এক কথায় বলতে গেলে, বিগত বছরের তুলনায় আমরা ভাল আছি। ২০১৬ সালে ব্যাংক লোকসানে ছিল। বর্তমানে ১০০ কোটি টাকার লোকসান কাটিয়ে প্রায় ৫৩৮ কোটি টাকা প্রফিট করেছি। সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে রূপালী ব্যাংকের একাউন্ট সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। আমাদের প্রায় দেড় কোটি একাউন্ট আছে।

অটোমেশনে ২০১৬ সালে আমাদের তেমন কোন গতি ছিল না। অথচ ২০১৭ সালে আমরা পুরোপুরি অটোমেশনে আসতে পেরেছি। অটোমেশনের ফলে আমরা এক কোটি মায়ের একাউন্ট খুলতে পেরেছি। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মায়েদের একাউন্টে টাকা দিতে সক্ষম হয়েছি। সরকারের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের কাছে আমাদের কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে। সেদিক থেকে আমরা এবার শেয়ার হোল্ডারদের ২৪% ডিভিডেন্ট দিয়েছি। এছাড়া শেয়ারের মূল্যও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।

ব্যাংকিং লেনদেনের বাইরেও আমাদের আরো বেশ কিছু অর্জন রয়েছে। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু রূপালী ব্যাংকের যে লোগো করেছিলেন, বিভিন্ন সময়ে তা পরিবর্তীত হয়েছিল। আমরা এবারে সেই ‘৭২ এর লোগোতে ফিরতে সক্ষম হয়েছি। এছাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর একটি মুরাল স্থাপন করেছি। সাত বীরশেষ্টদের জন্য একটি গ্যালারি স্থাপন করেছি।

স্বাধীনতার স্বপক্ষের বিষয়গুলোর হয়তো আর্থিক কোন মূল্য নেই, কিন্তু আমি মনে করি, একটা দেশের জাতীয় চেতনার যে বিষয় তা প্রতিটার প্রতিফলন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের থাকা উচিত। সেই লক্ষেই আমরা এ কাজগুলো করেছি।

  • ব্যাংকিং খাতে দিন দিন বাড়ছে খেলাপি ঋণ। আপনার ব্যাংকের খেলাপি ঋণ নিয়ে কি ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছেন?

মো. আতাউর রহমান : ক্লাসিফাইড লোন আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা ব্যাংকের জন্য বড় একটা হুমকি। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে কঠোরতম পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। আমাদের ব্যাংকের সবাই এ বিষয়ে সচেতন। বোর্ডেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে খেলাপি ঋণ আদায়ে অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় আমরা অনেক এগিয়ে আছি।

  • রূপালী ব্যাংকের গ্রাহক সেবার বিশেষত্ব কি?

মো. আতাউর রহমান প্রধান : ব্যাংকের কাজই হলো গ্রাহকদের সেবা দেয়া। আমানত সংগ্রহ করার পাশাপাশি ঋণের যোগান দেয়া। অতীতে আমাদের সকল সেবা ম্যানুয়ালি ছিল। ফলে মানুষের সেবা পেতে অনেক সময় লাগত। অন্যান্য ব্যাংকের তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে ছিলাম কিন্তু এখন গ্রাহক সেবার মান অনেক উন্নতি করেছি।

ব্যাংকে ৫৬৩ শাখা কোর ব্যাংকিং সিস্টেমের (সিবিএস) আওতায় আনা হয়েছে। ফলে সেবার মান অনেক বেড়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে গ্রাহকরা সেবা পাচ্ছেন। আমাদের ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা এই সেবা দিচ্ছেন, তাদের আরও বেশি প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলা হচ্ছে। এ ছাড়া কর্মকর্তাদের প্রযুক্তি জ্ঞান বাড়ানোর লক্ষ্যে নিয়মিত বিভিন্ন সভা-সেমিনার করা হচ্ছে।

  • ব্যাংক খাতের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

মো. আতাউর রহমান প্রধান : এ মুহূর্তে ব্যাংকিং খাতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো খেলাপি ঋণ। যে কোনো মূল্যে খেলাপি ঋণ আদায় বাড়াতে হবে। তবে ঋণ শতভাগ আদায় করা যাবে, এটা বলা যাবে না। ঋণ দিলে একটু চ্যালেঞ্জ থাকবে।

  • সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে আপনার ব্যাংক কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে?

মো. আতাউর রহমান প্রধান : সাইবার নিরাপত্তা এখন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকের সব শাখা অটোমেশন করার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা জনিত হুমকিও বাড়ছে। এসব হুমকি মোকবেলা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হচ্ছে।

সাইবার হুমকি নিরসনের জন্য ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলা হচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা বাড়াতে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে সহযোগিতা নেয়া হচ্ছে। এগুলো নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে আমরা করছি।

  • ব্যাংক কোন ধরনের গ্রাহককে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে?

মো. আতাউর রহমান প্রধান : আমানতকারী আমাদের গ্রাহক। যারা ঋণ নিচ্ছেন তারাও আমাদের গ্রাহক। তবে ঋণের ক্ষেত্রে আমরা এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছি- এসএমই খাতকে। বড় বড় শিল্প ঋণে না গিয়ে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মাঝে ঋণ দিচ্ছি। নতুন উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরিতে আমরা ঋণ দিতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। পাশাপাশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে আমাদের কৃষি খাত ও আমাদের চাষিরা।

  • ব্যাংক নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

মো. আতাউর রহমান প্রধান : আমাদের ৫ বছরের একটা পরিকল্পনা রয়েছে। সে লক্ষ্যেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা বলেছিলাম- রূপালী ব্যাংক ২০১৭ সালে ঘুরে দাঁড়াবে। গত বছর আমরা লোকসানি শাখা ও লোকসান কমিয়ে আনার পাশাপাশি ৫৩৭ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছি।

এ বছর আমাদের স্লোগান হলো- ২০১৮ সালে শীর্ষে যাবে রূপালী ব্যাংক। আমাদের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা এসএমইকে গুরুত্ব দিচ্ছি, সব শাখাই অটোমেশনের আওতায় নিয়ে এসেছি। খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য যে চেষ্টা ছিল আমাদের, তা করতে পেরেছি। নতুন করে ঋণের প্রবাহ বাড়ানো হয়েছে। গত বছর ১৪৪ শাখা লোকসানে ছিল। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩টি।

৮৭ কোটি টাকা লোকসান থেকে ৫৩৭ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে। আমরা গত বছর যেভাবে পরিকল্পনা নিয়েছি সেভাবেই কাজ করেছি। এখন বলতে পারি- আমরা একটা ইউটার্ন নিতে পেরেছি। আমরা আমাদের কিছু সূচকে শীর্ষে যেতে চাই।

গ্রাহককে সেবা দেয়ার মানের সন্তুষ্টি সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিতে চাই। আমাদের খেলাপি ঋণ কমাতে চাই। আমরা মানসম্পন্ন মুনাফা করতে চাই। সব ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন সেবা দেয়ার ব্রত নিয়ে এগিয়ে যেতে পারলে আমরা শীর্ষে পৌঁছবো।

  • রূপালী ব্যাংক শিওরক্যাশের ১ কোটি মায়ের হিসাব নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে …

মো. আতাউর রহমান প্রধান : ১ কোটি মায়ের হিসাব করার ফলে সরকারের পক্ষ থেকে আমরা প্রশংসা পেয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, রূপালী ব্যাংক আমার স্বপ্নের একটা অংশ পূরণ করেছে। এক্ষেত্রে সরকারের একটা লাভ হয়েছে।

এই হিসাব থাকার একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে বই ছাপানো হচ্ছে। ১ কোটি হিসাব করার ফলে একটা বিরাট ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে রূপালী ব্যাংক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কাজ করছে। আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে- ১ কোটি মায়ের মধ্যে ১০ লাখ হিসাবধারীকে ঋণ দিয়ে উদ্যোক্তা তৈরি করে সাবলম্বী করা।

  • বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

মো. আতাউর রহমান প্রধান : ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে সার্বিকভাবে বলতে গেলে আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক খুবই সচেতন। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেশের কার্যরত সব ব্যাংকের কার্যক্রম তদারকি করছে। আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বেড়েছে।

  • গুরুত্বপূর্ণ সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

মো. আতাউর রহমান প্রধান : আপনাকেও ধন্যবাদ, একই সঙ্গে রইল শুভ কামনা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here