রাহেল আহমেদ শানু : ব্যাংকিং খাতে আদায় অনিশ্চিত খেলাপি বা মন্দ মানের ঋণ বেড়েই চলেছে। গত ছয় মাসে এ ধরনের ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে বেড়েছে খেলাপির বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ।

চলতি বছরের জুন শেষে প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে সরকারি-বেসরকারি ১৩টি ব্যাংক। এই তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে ইসলামী ব্যাংক। জুন শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। মূলত খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণেই প্রভিশন ঘাটতি বাড়ছে বলে মনে করছেন আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আদায় অনিশ্চিত খেলাপি বা মন্দ মানের ঋণের পরিমাণ ৭৪ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা যা ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৬৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে এই ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের মন্দ মানের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা। বেসরকারি ৪০ ব্যাংকের এই ঋণের পরিমাণ ৩১ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। বিদেশি ৯ ব্যাংকের ১ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। আর সরকারি বিশেষায়িত ২ ব্যাংকের ৪ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। মাত্রাতিরিক্ত এই মন্দ মানের ঋণের প্রভাবে প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে ১৩টি ব্যাংক।

চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি-বেসরকারি ১৩ বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিকে ৯টি ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছিল। এরপর চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে ১২টিতে উন্নীত হয়। সর্বশেষ জুনে আরো বেড়ে ১৩টি ব্যাংকে উন্নীত হয়েছে। খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণেই প্রভিশন ঘাটতি বাড়ছে বলে মনে করছেন আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রভিশন ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না। এতে ওই ব্যাংকের শেয়ারে নিরুৎসাহিত হন বিনিয়োগকারিরা। এ ছাড়া যেসব ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়, তাদের মূলধন ঘাটতিতে পড়ার আশঙ্কাও থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, গত কয়েক বছর ধরে সরকারি লোকের দাপটে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে বেশকিছু ঋণ দেয়া হয়েছিল। যা পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণ ঢেকে রাখা হয়েছিল। এ ধরনের মন্দ ঋণ এখন খেলাপি হয়ে বেরিয়ে আসছে। একইভাবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোয়ও কিছু দুষ্ট লোক রয়েছে। তাদের দাপটে যেসব ঋণ দেয়া হয়েছিল, তা এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ফলে বাড়ছে প্রভিশন ঘাটতি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে দুরবস্থা চলছে। যেভাবে খেলাপি ঋণ বাড়ছে, তাতে উদ্বেগ প্রকাশ ছাড়া আর কিছু বলার নেই। খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রভিশন ঘাটতি বাড়বে। আবার ঋণ অবলোপনের পরিমাণও বাড়ছে। ফলে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েই চলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, জুন শেষে ১৩ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। মার্চে ১২ ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। ৩ মাসের ব্যবধানে ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে ৩৭৫ কোটি টাকা। মার্চের ১২টি ব্যাংক ছাড়াও নতুন করে একটি ইসলামী ব্যাংক প্রায় ১৬০ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতিতে যুক্ত হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ বেশি থাকলে প্রভিশন ঘাটতি বাড়ে। এ ছাড়া ব্যাংকের লেজার বুক পরিষ্কার করতে হলেও প্রভিশন ঘাটতিতে পড়ে ব্যাংক।

তথ্যমতে, ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রভিশন ঘাটতিতে আলোচিত বেসিক ব্যাংকের অবস্থান প্রথম সারিতে। এ ছাড়া রূপালী ব্যাংকের ঘাটতি রয়েছে ১ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত আরো দুটি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি যথাক্রমে ৩ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা ও ৮৯০ কোটি টাকা। এবি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১৪৭ কোটি টাকা।

আর বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৪২২ কোটি, ইসলামী ব্যাংক ১৬০ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকের প্রায় ২১ কোটি এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১০৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ৪৭৮ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩২৮ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঘাটতি ১১৬ কোটি টাকা এবং স্টান্ডার্ড ব্যাংকের ঘাটতি কিছুটা কমে ৪৬ কোটি টাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here