১২টি ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতি সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা

0
288

সিনিয়র রিপোর্টার : খেলাপি ঋণ বাড়ায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে সরকারি-বেসরকারি ১২ ব্যাংক। চলতি বছরের মার্চ শেষে এ ব্যাংকগুলোর সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। অথচ তিন মাস আগেও ডিসেম্বর শেষে সঞ্চিতি ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ৯।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের অশ্রেণীকৃত এবং নিয়মিত ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ থেকে ৫ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হয়। ব্যাংকগুলোকে নিম্নমান বা সাব-স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে ২০, ডাউটফুল বা সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ এবং মন্দ বা খারাপ ঋণের বিপরীতে শতভাগ সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিংয়ের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত চার বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। ১ হাজার ৬২ কোটি টাকা ঘাটতিতে পড়েছে বেসরকারি আট ব্যাংক।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সঞ্চিতি ঘাটতিতে পড়েছে সোনালী ব্যাংক। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকটির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা। এরপর সবচেয়ে বেশি সঞ্চিতি ঘাটতিতে রয়েছে বেসিক ব্যাংক, যার পরিমাণ ৩ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। এছাড়া রূপালী ব্যাংক ১ হাজার ২৬৮ কোটি ও অগ্রণী ব্যাংক ১ হাজার ৯ কোটি টাকা সঞ্চিতি ঘাটতিতে রয়েছে।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সঞ্চিতি ঘাটতিতে পড়েছে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকটির এ ঘাটতির পরিমাণ ২৩৬ কোটি টাকা। একই সময়ে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৯৯ কোটি ও এবি ব্যাংকের ১৫৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।

প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি সংরক্ষণে ব্যর্থতা প্রসঙ্গে এবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান চৌধুরী বলেন, প্রভিশন ঘাটতি পূরণে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চার বছরের সময় পেয়েছি। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাংকের সব প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারব। খেলাপি ঋণ আদায়ে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। ছোটখাটো দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে এবি ব্যাংক পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

বেসরকারি অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে মার্চ শেষে ন্যাশনাল ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৪০ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১১৯ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্টের ১১৪ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৬৭ কোটি ও আইএফআইসি ব্যাংকের ২৯ কোটি টাকা।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম রিয়াজুল করিম বলেন, আমাদের ব্যাংকের সব প্রভিশন সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তিন বছরের সময় দিয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যেই আমরা প্রভিশন ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারব। আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা মামলাভুক্ত ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রভিশনিং করতে বলেছে। এটি করতে গিয়েই আমাদের কিছুটা ঘাটতিতে পড়তে হয়েছে।

বিতরণকৃত ঋণের বড় অংশ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় সঞ্চিতি ঘাটতিতে পড়েছে ব্যাংকগুলো। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই ৬ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের। মার্চ শেষে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। বিতরণকৃত ঋণের ২৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের।

নতুন করে খেলাপি হওয়া ঋণের মধ্যে জনতা ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। মার্চ শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৭০২ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে— সোনালীর ১৪ হাজার ৩০৫ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৮ হাজার ৫৯৪ কোটি, অগ্রণীর ৫ হাজার ৬৭৬ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ৬০২ কোটি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল) ৮০৪ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ শেষে বেসরকারি ৪০টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। এসব ব্যাংকের মধ্যে ১৬টির খেলাপি ঋণের হার ৬ শতাংশের উপরে চলে গেছে। এ ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮০ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের।

এছাড়া বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ২৩ শতাংশ, ফারমার্স ব্যাংকের ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ, পূবালী ব্যাংকের ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ ঋণই এখন খেলাপি। ৮ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে উত্তরা ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকের।

এছাড়া ৬ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে দ্য সিটি, এবি, এক্সিম, ঢাকা, ন্যাশনাল, এনসিসি, সোস্যাল ইসলামী (এসআইবিএল) ও সাউথইস্ট ব্যাংকের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here