১০ টাকার শেয়ার কিনছেন ৩৬ টাকায় ! ভেবেছেন কি?

0
4891

মোহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান : ১০ টাকার শেয়ার কিনছেন ৩৬ টাকায়, ভেবেছেন কি ? প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায় সোমবার থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (কেপিপিএল) শেয়ার লেনদেন শুরু হয়েছে । বেলা ১২.৩৭ মিনিটে কোম্পানিটির দর ছিল ৩৬ টাকা। বাজারে কোম্পানিটি মোট ৪ কোটি শেয়ার ছেড়ে ৪০ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। সংগৃহীত অর্থ দিয়ে খুলনা প্রিন্টিংয়ের চলতি মূলধন বৃদ্ধি, ব্যাংকের মেয়াদী ঋণ পরিশোধ এবং আইপিও বাবদ খরচ করবে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।

Screenshot_9

লেনদেন শুরু হওয়া মাত্র, ১০ টাকার শেয়ার কেন ৩৬ টাকা, বিনিয়োগকারীরা স্টক বাংলাদেশ- এর অফিসে ফোন করে এর কারন জানতে চাচ্ছেন। তাই বিনিয়োগকারীদের কথা বিবেচনা করে খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের কিছু তথ্য তুলে ধরা হল । এসব তথ্য কোম্পানির প্রসপেক্টাস হতে সংগ্রহীত। তথ্য হতে আপনিই বিবেচনা করে নিন কেন ১০ টাকার শেয়ার কিনছেন ৩৬ টাকায় ।

লেনদেন শুরুর আগে খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের আইপিও পরবর্তী  ইপিএস হয়েছে ৬৪ পয়সা। কোম্পানির আইপিও পরবর্তী  ৬ কোটি ৬৪ লাখ শেয়ার হিসাবে তৃতীয় প্রান্তিকের এ ইপিএস হয়েছে। কোম্পানির তৃতীয় প্রান্তিকের (জানুয়ারি, ১৪-মার্চ, ১৪) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদেনে এ তথ্য বেরিয়ে আছে।ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, আলোচিত বছরে কোম্পানিটির কর পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা। শেয়ার প্রতিআয় বা ইপিএস করেছে ১ টাকা ৬১ পয়সা। যা আগের বছর একই সময়ে মুনাফা ছিল ২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা এবং ইপিএস ছিল ১ টাকা ৫ পয়সা।উল্লেখ্য, এই ইপিএস কোম্পানির আইপিও পূর্ববর্তী ২ কোটি ৬৪ লাখ শেয়ারের গড় ভারিত্ব হিসাবের উপর করা হয়েছে।

এদিকে নয় মাসে (জুলাই,১৩-মার্চ,১৪) পর্যন্ত কোম্পানিটির মুনাফা হয়েছে ৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আর ইপিএস ২ টাকা ৪৬ পয়সা। যা আগের বছর একই সময় ছিল ৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা। আর ইপিএস ছিল ১ টাকা ৯ পয়সা।আর এই ইপিএস কোম্পানির আইপিও পূর্ববর্তী ২ কোটি ৬৪ লাখ শেয়ারের গড় ভারিত্ব হিসাবের উপর করা হয়েছে। কোম্পানির আইপিও পরবর্তী ৬ কোটি ৬৪ লাখ শেয়ার হিসাব করলে ৯ মাসে কোম্পানির ইপিএস দাঁড়ায় ৯৮ পয়সা।

 

 

EPS

খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং কোম্পানি লিমিটেড (কেপিপিএল) ব্যবসায়িকভাবে গত দুই বছর ধরে নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। কোম্পানিটিতে শ্রমিক ফান্ড গঠন করা হলেও অর্থের হদিস পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া এ কোম্পানির পরিচালনগত অর্থের নগদ প্রবাহ নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। কেপিপিএল ২০১১-১২ অর্থবছরে নিট মুনাফা করে ১০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বা প্রতি শেয়ারে আয় করে ৪.১১ টাকা। আর ২০১২-১৩ অর্থবছরে নিট মুনাফা হয়েছে ৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ও প্রতি শেয়ারে আয় হয়েছে ২.৮২ টাকা। এর আগে ২০১০-১১ অর্থবছরে কোম্পানিটি নিট মুনাফা করে ১৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা বা প্রতি শেয়ারে আয় করে ১২.০৭ টাকা। পণ্য বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ায় সর্বশেষ অর্থবছরে মুনাফা কমেছে বলে জানা গেছে।

 

সর্বশেষ অর্থবছরে এ কোম্পানির পরিচালনগত অর্থের নগদ প্রবাহ বা নেট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। পরিচালনগত নগদ প্রবাহ শেষে কোম্পানিটির হাতে এসেছে ১ কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে এ কোম্পানির নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার ক্ষমতা নেই বললেই চলে। কারণ, প্রতি শেয়ারে ০.৩৮ টাকা নগদ প্রবাহ দিয়ে কোম্পানির দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা তুনলামূলক কঠিন।এদিকে, প্রতি শেয়ারে কেপিপিএলের সম্পদ ২৪.২৬ টাকা থাকলেও প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের পর তা ১৫.৭৬ টাকায় নেমে আসবে। এতে উদ্যোক্তা পরিচালকদের ২২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বা প্রতি শেয়ারে ৮.৫৯ টাকা করে লোকসান হবে।অপরদিকে, আইপিওতে ১০ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতি শেয়ারে ৫.৬৭ টাকা করে লাভবান হবেন বিনিয়োগকারীরা।

NAV

কোম্পানির মূলধন ২৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা হলেও শেয়ারহোল্ডারদের মোট ইক্যুইটির পরিমাণ (রিভ্যালুয়েশন সারপ্লাস) ৬৪ কোটি টাকা। ব্যবসায় ৬৪ কোটি টাকা ব্যবহার করা হলেও ইপিএস গণনা করা হয় পরিশোধিত মূলধন দিয়ে। এক্ষেত্রে ৬৪ কোটি টাকা ব্যবহার করে ২০১২-১৩ সালে ইপিএস হয়েছে ২.৮ টাকা বা ২৮ শতাংশ। কিন্তু ৬৪ কোটি টাকা ব্যবহারে ফেরতের হার (রিটার্ন অন ইক্যুইটি) হয়েছে ১১.৬২ শতাংশ।

কোম্পানিটি ২০১০-১১ অর্থবছরে জমি, ভবন ও প্লান্ট এবং যন্ত্রপাতি পুনর্মূল্যায়িত করে। যেখানে ৩১ লাখ ২১ হাজার টাকার জমির দাম দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা বা ১৪১৪ শতাংশ ও ৯৮ লাখ ৮৯ হাজার টাকার ভবনের দাম দেখানো হয়েছে ১৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা বা ১৪৩৪ শতাংশ। জমির চেয়ে ভবনের দাম বাড়ার বিষয়টি এ কোম্পানির বেলায় ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা গেছে। এ ছাড়া কোম্পানিটির ৭ কোটি ১৯ লাখ টাকার প্লান্ট অ্যান্ড মেশিনারি বেড়েছে।

 

২০০৬ সালে আইন হলেও কোম্পানিটি শ্রমিকদের জন্য ২০১২ সাল থেকে ফান্ড গঠন করে। কিন্তু ফান্ড কিভাবে ব্যবহার হয় ও কোথায় আছে সে সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি প্রসপেক্টাসে।

Screenshot_4

বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্টান্ডার্ড (বিএএস)-১ এর প্যারা ৩৮ অনুযায়ী, আর্থিক প্রতিবেদনে সর্বশেষ অর্থবছরের সাথে তুলনা করার জন্য বিগত বছরের অবস্থা তুলে ধরার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু খুলনা প্রিন্টিং কর্তৃপক্ষ স্থায়ী সম্পদে ২০১২ সালের কোনো তথ্য প্রকাশ না করে বিএএস পরিপালনে ব্যর্থ হয়েছে।কোম্পানি কর্তৃপক্ষ প্রসপেক্টাসে উল্লেখ করেছে, উত্তোলিত অর্থের ৩০ কোটি টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা হবে। কিন্তু ২০১২-১৩ অর্থবছর শেষে কোম্পানিটির ঋণের পরিমাণ আছে তার চেয়ে কম অর্থাৎ ২৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

অন্যদিকে খুলনা প্রিন্টিং ২০১১-১২ বিগত অর্থবছরে ১৪০% লভ্যাংশ দিয়েছিল। এছাড়া অন্যকোন  অর্থবছরে লভ্যাংশ প্রদান করেনি।

Screenshot_8

কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সুফিয়া খাতুন ও চেয়ারম্যান এসএম আমজাদ হোসেনসহ পরিচালনা পর্ষদে আরও ৫ জন রয়েছেন। যেখানে এমডি ও চেয়ারম্যান ছাড়া বাকি ৫ জনই মনোনীত পরিচালক। অর্থাৎ খুলনা প্রিন্টিংয়ের নিজস্ব পরিচালক মাত্র ২ জন।জীবন বৃত্তান্ত থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, খুলনা প্রিন্টিংয়ের এমডি বিএ পাস। কোম্পানির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করলেও তার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা নেই। তবে চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেনের অভিজ্ঞতার ঝুলি তুলনামূলক ভারি। গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে কেপিপিএলের এমডি ২০১২-১৩ অর্থবছরে সম্মানি নিয়েছেন ৬ লাখ টাকা। আর চেয়ারম্যান নিয়েছেন ১২ লাখ টাকা। যদিও তারা স্বামী-স্ত্রী।

Share

টার্নওভার কমে যাওয়ার কারণে মুনাফা কমেছে বলে জানিয়েছেন খুলনা প্রিন্টিংয়ের পরামর্শক এমডি দ্বীন ইসলাম মিয়া। তবে চলতি অর্থবছরে টার্নওভার ভালো অবস্থানে রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। আর বাকিতে বিক্রির পরিমাণ বাড়ার কারণে নগদ প্রবাহ নিম্নমুখী বলে জানিয়েছেন তিনি।ঋণ ৩০ কোটির কম থাকলেও এর সুদ বকেয়া থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন দ্বীন ইসলাম মিয়া। যা নিয়ে ৩০ কোটি হতে পারে। এ ছাড়া ঋণের পরিমাণ ৩০ কোটির থেকে কম বা বেশি হতে পারে। তবে কম হলে বাকি টাকা থেকে যাবে বলে জানান তিনি। আর পরিচালকদের সম্মানির বিষয়টি বোর্ডের সিদ্ধান্ত বলে জানান তিনি।

শ্রমিক ফান্ডের টাকার সঠিক তথ্য দিতে পারেননি দ্বীন ইসলাম মিয়া। ফান্ডের টাকা বিরতণ করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। দেওয়া হলেও হিসাবে নেই কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিবেদন কাছে না থাকায় জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।খুলনার জমির দাম কম ও ভবন অনেক পুরোনো হওয়ার কারণে উভয়ের মূল্য প্রায় সমান হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন দ্বীন ইসলাম মিয়া। তার মতে, কোম্পানির ভবন অনেক আগের এবং ওই সময় ব্যয় কম হয়েছিল। যার কারণে পুনর্মূল্যায়নের সময় অনেকাংশে দর বেড়েছে।

এছাড়াও কোম্পানিটির তথ্য অনুযায়ী ফাইনাশীয়াল রেশিওগুলো নিম্নরূপ

Screenshot_7

উল্লেখ্য, পূর্বের আইপিও বাজার বিশ্লেষনে দেখা যায়, বিগত সকল আইপিও বাজারে আসার সাথে সাথে ব্যাপক আলোড়ন তুলছে বাজর দরের দিক দিয়ে। তবে বর্তমানে বাজারের প্রবনতা বিনিয়োকারীদের কে ভাবাচ্ছে। তাই ভেবেচিন্তে বিনিয়োগ করুন।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here