হলমার্ক কেলেঙ্কারি থেকে বাজার ধস, সবই ভুলভাবে ব্যাখ্যা

0
1152

ব্যক্তি খাতের সহযোগিতায় উন্নত অর্থনীতি গঠনের পথ প্রশস্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সালমান ফজলুর রহমান। একান্ত আলাপচারিতায়  ব্যবসার সামগ্রিক পরিবেশ এবং বিনিয়োগ ছাড়াও আর্থিক খাত, পুঁজিবাজারসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন।

তিনি মনে করেন হলমার্ক কেলেঙ্কারি থেকে শেয়ারবাজারে ধস—বাংলাদেশে সবকিছুকেই ভুলভাবে দেখা হয়েছে। দেশে কোনো কেলেঙ্কারি ধরা পড়লে সেগুলোকে ভুলভাবে হ্যান্ডল করা হয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- বদরুল আলম ও মাহফুজ উল্লাহ বাবু।

  • বিনিয়োগ পরিকল্পনার সময় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বিশ্ব ব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্সকে অনেক গুরুত্ব দেয়। এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক নিচের দিকে। অবস্থান উন্নত করতেসরকারের পদক্ষেপগুলো কাজে আসছে কি?

দায়িত্ব নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী প্রথমেই বললেন ইজ অব ডুয়িং বিজনেসের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে। আমার কাছে যে জিনিসটা খুব অবাক লাগল সেটা হলো আফগানিস্তান থেকে আমাদের র‌্যাংকিং খারাপ। আমি দেখলাম বাস্তবতার নিরিখে এটা সম্ভব না, কারণ আফগানিস্তানে কোনো সিস্টেমই নেই, সেই তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভালো। আমার আশঙ্কা হলো, নিশ্চয়ই স্কোরিংয়ের মেথডলজিতে কিছু একটা সমস্যা আছে। হয়তো ওরা যেভাবে স্কোরিং করে, আমরা সেটা বুঝতে পারছি না অথবা কোনো কমিউনিকেশন গ্যাপ রয়েছে। এরপর আমি আইএফসির কাছে বুঝতে চাইলাম।

দেখা গেল আমি যেটা ভেবেছিলাম সেটাই হচ্ছে। ওদের ব্যবস্থাটা হলো এমসিকিউর (মাল্টিপল চয়েজ কোয়েশ্চেন) মতো। এ পদ্ধতিতে প্রশ্নের উত্তর হিসেবে চারটি অপশন আছে, উত্তরদাতা সঠিক উত্তরটিতে টিক দিলে আপনি নম্বর পাবেন। এখন আপনি যদি চারটি উত্তরের একটিতেও টিক না দিয়ে পাশে একটি বড় রচনা লিখে দেন, তাতে আমাদের কোনো লাভ নেই। এটি ছিল র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকার মূল কারণ। হয়তো তারা চায় একটি জিনিস, হয়তো আমরা তার চেয়ে বেশিই করে রেখেছি। কিন্তু করতে হবে তাদের ছক অনুযায়ী।

সালমান ফজলুর রহমান

আমি দেখলাম, কাজ আমরা সব করে ফেলেছি। বিদ্যুতে স্কোর হচ্ছে সংযোগ ব্যবস্থার ওপর। আমরা হয়তো উৎপাদন করছি ৪০ হাজার মেগাওয়াটেরও উপরে, কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে গিয়ে যদি উদ্যোক্তার ভোগান্তি হয় তাহলে আপনি স্কোর পাবেন না। এ ধরনের বিষয়কে কাটিয়ে উঠে আমরা যে অবস্থায় এসেছি, আগামী অক্টোবরে এর ঘোষণা দেয়া হবে। আমি আশাবাদী, বর্তমান ১৭৬ থেকে আমরা ১২৫-এর মধ্যে চলে আসব।

র‌্যাংকিংয়ে অগ্রসর হওয়ার জন্য কাজগুলো করতে হয় প্রতি বছর এপ্রিলের মধ্যে। আগামী বাজেট শেষ হয়ে গেলে আমরা আবার কাজ ধরব। আগামী বছর এপ্রিলের মধ্যে যে কাজগুলো করতে হবে, সেখানে কিছু আইনের বিষয় আছে। ওই আইনগুলো সংশোধন করে আমি লক্ষ্য নিয়েছি আগামী বছর র্যাংকিংয়ে দুই অংকের মধ্যে চলে আসার। অর্থাৎ ১০০-এর নিচে চলে আসতে চাই। আমি স্টাডি করে দেখেছি, তাদের যে সিস্টেমটা, সেটা খুব একটা কঠিন না। আর তারা যা চাচ্ছে আমরা তার থেকেও বেশি রিফর্ম করে বসে আছি।

  • ওয়ান স্টপ সার্ভিসের বিষয়গুলো কি ইজ অব ডুয়িং বিজনেসের সঙ্গে সম্পৃক্ত?

ওয়ান স্টপ সার্ভিসের বিষয়েও অনেক কাজ হচ্ছে, আমি দায়িত্ব নেয়ার পর দেখলাম, বিডা তার ওয়ান স্টপ সার্ভিসের জন্য একটা প্লাটফরম তৈরি করছে, বেজা একটা করছে, বেপজা একটা করছে। সবাই নিজেরটা করছে। আমার কথা হচ্ছে, তাহলে তো ওয়ান স্টপ সার্ভিস হচ্ছে না। আমার কথা হলো ওয়ান স্টপ সার্ভিস শুরু হচ্ছে বিডাতে। এই সেবা বিডা থেকে শুরু হয়ে সিমলেসলি কানেকটেড থাকতে হবে। বিনিয়োগকারী হিসেবে আমি যখন বিডার ওয়েবসাইটে যাব আমার কাছে বেপজা, বেজা সবার অপশন চলে আসবে।

কেন আমি কোথায় যাব আর কোথায় যাব না, সেই বিষয়গুলোও স্বচ্ছ ও পরিষ্কারভাবে থাকতে হবে। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারব, আমি কোথায় যাব। আমি যদি সিদ্ধান্ত নিই যে আমি বেজাতে যাব তখন বেজাতে ক্লিক করলেই বেজার ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু হয়ে যাবে। এ বিষয়গুলো এখন ইন্টিগ্রেটেড করা হচ্ছে। কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনও অনেক সহজ করার কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় কাগজগুলো অনলাইনে স্ক্যান করে আপলোড করার পর ভিসা বা অন্যান্য কার্ডে পেমেন্ট করে দিলে তখন ২ ঘণ্টার মধ্যে রেজিস্ট্রেশন দেয়া সম্ভব হবে। এটা পর্যায়ক্রমে ২ মিনিটে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।

  • বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডাপরিসংখ্যানে দেখা যায়চলতি বছরের প্রথমপ্রান্তিকে স্থানীয় বা দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে, দেশীয় বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ আগ্রহ কমে যাওয়ার কারণ কী?

বেসরকারি খাতে দেশীয় বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে। আমি মনে করি, এর মূল কারণ আর্থিক ব্যবস্থার গুরুতর কিছু কাঠামোগত সমস্যা। গত ১০ বছরে বেসরকারি খাতে যা বিনিয়োগ হয়েছে, এর বেশির ভাগই অর্থায়ন করেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকও করেছে, কিন্তু বেশি না। গোটা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ৮০ শতাংশ ঋণ ও অগ্রিম এসেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে। ২০ শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে।

এখানে কাঠামোগত ত্রুটি হলো বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে মূলত থাকে স্বল্পমেয়াদি আমানত। এ স্বল্পমেয়াদি আমানত নিয়ে তো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করার কথা না। কিন্তু হচ্ছে, এটি একটি বড় অসামঞ্জস্য। খেলাপির সমস্যা, এডি রেশিওর সমস্যা সবই হচ্ছে এ কাঠামোগত ত্রুটির কারণে। স্বল্পমেয়াদি তহবিল দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ব্যবহার করার কারণে।

ব্যাংক যখন কোনো শিল্পের প্রকল্পে অর্থায়ন করে, তখন শুরুতে উদ্যোক্তাকে ১২ বছর সময় দেয়া দরকার। বাণিজ্যিক ব্যাংক তো এত দীর্ঘ সময় দিতে পারে না। কারণ তার তো ট্রেডিং ফান্ড। সে তিন বা পাঁচ বছরের বেশি দিতে চায় না।

যখন তাকে পাঁচ বছরের মধ্যে সুদাসলে সব টাকা পরিশোধ করতে বলা হচ্ছে, তখন ব্যাংকও জেনে-বুঝেই ঋণ দিচ্ছে যে প্রকল্পটি চাপে থাকতে পারে, এ ঋণটি আগামীতে অনাদায়ী হয়ে যেতে পারে। এটিই সেই কাঠামোগত ত্রুটি। এদিকে শিল্পোদ্যোক্তার তো এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কারণ শিল্প ঋণ সংস্থা ছিল আর শিল্প ব্যাংক ছিল, দুটোই ব্যর্থ হলো। ব্যর্থ হওয়ায় দুটো প্রতিষ্ঠানকে এক করা হলো। এক করে আবার এটিকে এমপাওয়ার করা হলো না, যেটা করার প্রয়োজন ছিল।

দীর্ঘমেয়াদি অর্থসংস্থানের আরেকটা উৎস হলো ক্যাপিটাল মার্কেট। এ উৎসটি আমাদের এখানে পুরোপুরি নন-এক্সিসট্যান্ট। ওখান থেকে কোনো নতুন ইন্ডাস্ট্রি ক্যাপিটাল ড্র করতে পারছে না। আমাদের একটি কার্যকর বন্ড মার্কেট নেই। এ কাঠামোগত ঘাটতিতে ফাইনালি ব্যাংকিং সিস্টেমের ওপর চাপ এল। সেন্ট্রাল ব্যাংক ব্যাংকিং সেক্টরকে ধরল। নীতিনির্ধারক হিসেবে তাকে তার কাজ করতেই হবে। এডি রেশিওগুলো যখন নব্বইয়ের উপরে চলে যায়, তাহলে ব্যাংক একটা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে না? এখন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কাছে বিনিয়োগের প্রস্তাবগুলো আসছে, এডি রেশিও বেশি থাকায় তারা সেগুলো গ্রহণ করতে পারছে না। এ কারণেই বিনিয়োগ প্রস্তাবটা কমে গেছে। এটা আমাদের সিরিয়াসলি অ্যাড্রেস করতে হবে।

  • মানি মার্কেটের চাপটা কত দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে?

বাজেটটা হয়ে যাক, আমরা সবাই এখন বাজেট নিয়ে ব্যস্ত আছি। বাজেটের পরে দেখব হাউ টু সলভ দিস ইস্যু। আসলে মানি মার্কেট নিয়ে আমি অতটা উদ্বিগ্ন নই। আমার উদ্বেগ অনেক বেশি কাঠামোগত ত্রুটি নিয়ে। এ ত্রুটির একটি সমাধান আমাদের দিতেই হবে। এটা নিয়ে চিন্তা হচ্ছে, বন্ড মার্কেট নিয়ে চিন্তা হচ্ছে।

কীভাবে বড় বন্ড মার্কেট সৃষ্টি করা যায়, সেই বিষয়ে আমরা চিন্তা করছি। তারপর আর একটা প্রস্তাব দেব অর্থমন্ত্রীকে বিডিবিএলকে শক্তিশালী করার বিষয়ে। অথবা বিডিবিএলের মতো অন্য কোনো সংস্থা করা যায় কিনা, সে বিষয়ে আলোচনা করব। ইডকল আছে, বিআইএফএল এগুলো সব অবকাঠামো অর্থায়ন করছে। অবকাঠামোর বাইরেও আমাদের বিনিয়োগ দরকার। সেটার জন্য আমি চিন্তা করছি কোন কোন পদক্ষেপ নিয়ে কী কী করা যায়।

  • স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের উৎস হওয়ার মতো ভূমিকায় পুঁজিবাজারকে দেখা যায়নি।আপনি যে ত্রুটির বিষয়গুলো বললেন সেখানে পুঁজিবাজারও কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। কারণ কী?

আপনি যদি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পুঁজিবাজারের বিবর্তনগুলো দেখেন, করাচি, মুম্বাই, কোরিয়া বা হংকং স্টক এক্সচেঞ্জ দেখেন, তাহলে দেখতে পাবেন প্রথম যখন স্টক এক্সচেঞ্জ শুরু হয় তখন সাংঘাতিক একটা ভলাটিলিটি থাকে, প্রয়োজনীয় অনেক ধরনের রুলস-রেগুলেশন থাকে না। এটা ইভলভ করে। ভলাটিলিটি মোকাবেলা করে এক পর্যায়ে বাজারটা পরিণত হয়।

পরিপক্বতার ইঙ্গিত পাওয়া যায় তখনই যখন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারে প্রাধান্য বিস্তার করে। পরিণত বাজারগুলোয় দেখবেন, ৮০ শতাংশ লেনদেন হয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে। ২০ শতাংশ হয় ব্যক্তিশ্রেণীর বিনিয়োগকারীর মাধ্যমে। আমাদের দেশে হয় উল্টা, ৯০ শতাংশ রিটেইল ইনভেস্টরদের, আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর মাত্র ১০ শতাংশ। এই যে ১০ শতাংশ সেটিও আবার আইসিবি-কেন্দ্রিক। প্রাতিষ্ঠানিক কেনাবেচার ৯০ শতাংশের নেপথ্যে আইসিবি।

  • আমরা এখনো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সৃষ্টি করতে পারিনি। আমি মনে করি এটিই শেয়ারবাজারের মৌলিক ত্রুটি। এটি কেন হয়েছে?

১৯৯৬ সালে যখন শেয়ারবাজারে ধস নামল, তারপর অনেক সংস্কার হয়। এসইসি পুনর্গঠন থেকে শুরু করে অনেক কিছু। কিন্তু সরকারের ওপর যে দোষারোপ করা হয়, এরপর থেকে সরকারগুলো মনে করে এ বাজার বাড়ারও দরকার নেই, কমারও দরকার নেই। যেখানে আছে সেখানেই থাকুক। আমরা সেখানে এটা-সেটা করতে যাব না। গণমাধ্যম এক্ষেত্রে একটি ক্ষতিকর ভূমিকা পালন করেছে। আমি কথাটি কেন বলছি, বাজার বাড়ল বা কমল মানেই কিন্তু কেলেঙ্কারি নয়। সংবাদ প্রতিবেদনে বাজারের উত্থান-পতনকে সেভাবেই চিত্রিত করা হয়। বাজার বাড়বে বাজার কমবে—এটিই এর স্বাভাবিক ধর্ম। গণমাধ্যমের কাছ থেকে আরো পরিণত ও গঠনমূলক ভূমিকা আশা করি।

হলমার্কের কথাই ধরুন। হলমার্ক ব্যাংক থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। তত্কালীন অর্থমন্ত্রী নিজ স্টাইলে বলেছিলেন, ৪ হাজার কোটি টাকা কিছুই না। তিনি বোঝাচ্ছিলেন, এটি ব্যাংকিং সিস্টেমের সার্বিক কলেবরে কোনো বড় অংক নয়, যা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে। গণমাধ্যমে তার প্রচুর সমালোচনা হলো। আমিও তার সঙ্গে একমত ছিলাম, সার্বিক প্রেক্ষাপটে এটি কোনো বড় অংক নয়।

সালমান ফজলুর রহমান

আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, হলমার্ক যে উপায়েই ব্যাংক থেকে টাকা নিক, সে সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে বিশ্বমানের একটি কারখানা করেছিল। তার ছিল বিশ্বসেরা গ্রাহকও। আমি বলেছিলাম, তার ব্যবসাটি অব্যাহত রাখার সুযোগ দিতে হবে। কোনো সংবাদকর্মী এ লাইনে একটি কথাও বলেননি। বরং গণমাধ্যমে সমালোচনা এমন মাত্রায় পৌঁছে যে কেউই আর সেখানে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে এগিয়ে আসেননি। বাংলাদেশে হলমার্ক থেকে শুরু করে শেয়ারবাজারে ধস—সবকিছুকেই ভুলভাবে দেখা হয়েছে। এখানে একটি কেলেঙ্কারি ধরা পড়লে সেটিকে গঠনমূলকভাবে হ্যান্ডল করার সুযোগ হয় না।

ভারতে এখন জেট এয়ারওয়েজের ফেইলিওর নিয়ে কী হচ্ছে দেখুন—তাদের বেইল আউট দেয়ার পক্ষে-বিপক্ষে সংবাদমাধ্যমে লেখা হচ্ছে। সেখানকার সরকার অবশ্য বেইল আউট দেয়নি। আমাদের এখানে এমন বিষয়গুলোতে গণমাধ্যমে দ্বিতীয় কোনো মত দেখি না। এখন পাকিস্তানে শেয়ারবাজার পড়ছে। সেখানকার গণমাধ্যমে কেউ বলছেন না যে এটি কেলেঙ্কারি। কারণ হিসেবে সেখানে আইএমএফের বেইল আউট, রুপির বিনিময় হার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বেইল আউটের জন্য কী কী করতে হবে সেগুলো নিয়ে লেখা হচ্ছে। আমাদের এখানে শেয়ারবাজারে ধস নামলেই বলা হয়, এটি কেলেঙ্কারির ফল। কে করেছে? তাকে ধরো।

বাজারে দরপতন হলে গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে আপনাদের বলতে হবে যে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নিজেই তার লোকসানের জন্য দায়ী। তিনি যেকোনো দামে কিনতেও পারেন, বেচতেও পারেন। গুজবে কান দিয়ে বেশি দামে শেয়ার কিনে মুনাফা করলে কোনো সমস্যা নেই। আর লোকসান হলেই সরকার দায়ী, নীতিনির্ধারকরা দায়ী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা দায়ী—এমন অ্যাটিচুড নিয়ে শেয়ারবাজারকে এগিয়ে নেয়া যাবে না।

  • পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ নিয়ে বলছিলেন

যা-ই হোক, সারা পৃথিবীতেই শেয়ারবাজারে কোনো সমস্যা মনে করলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করে। এজন্য বন্ড মার্কেট দরকার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রচুর মিউচুয়াল ফান্ড দরকার। আমাদের মিউচুয়াল ফান্ড সেক্টর তো রীতিমতো কৌতুক। মিউচুয়াল ফান্ড খাতে বড় সংস্কার দরকার। আর দরকার বন্ড মার্কেট। দ্রুতই আমরা বন্ড মার্কেট গড়ে তুলব। আমাদের এখানে আইসিবির মতো আরো অনেকগুলো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী গড়ে তোলারও ব্যবস্থা নিতে হবে।

  • শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ নিয়ে অনেক আলোচনাসমালোচনা হয়।আপনি কী মনে করেন?

আমানতকারীর সম্পদ থেকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাজ নয়। এজন্য তারা নিজের মুনাফা থেকে বিনিয়োগ ব্যাংক গড়তে পারে। ব্যাংকিং রেগুলেটর হিসেবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নিজের পোর্টফোলিও থেকে শেয়ার বেচার চাপ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সঠিক কাজই করেছে। এতে হয়তো শেয়ারবাজারে বিক্রয়চাপ বেড়ে গিয়েছিল।

আবার এটি না হলে ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি আরো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। ২০১০ সালের ধসের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল অতি মুনাফার লোভে শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব পোর্টফোলিওর বিনিয়োগ। কিছু ব্যাংক সে সময় মূল ব্যবসার চেয়ে বেশি লাভ করছিল স্পেকুলেটিভ বিনিয়োগ থেকে। অথচ এ বিষয়টির তেমন সমালোচনা হয়নি।

  • খেলাপি ঋণ ক্রমেই বাড়ছে। আপনার পর্যবেক্ষণ জানতে চাই।

খেলাপি ঋণ বলা হচ্ছে ৯৩ হাজার কোটি টাকা। এখানে গিয়ে দেখবেন ৪০ হাজার কোটিই সাসপেন্স অ্যাকাউন্টের সুদ। বাকিটা পুরোটা আবার প্রিন্সিপাল নয়। প্রিন্সিপাল ১০ হাজার কোটি টাকা হবে। বাকিটা চক্রবৃদ্ধি হারে যোগ হতে থাকা সুদ, তার ওপর আবার সুদ। সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে যোগ করতে থাকা সুদের অংকটি তো আর ব্যাংকের আয়ের সঙ্গে যোগ হয়নি। সেটি ব্যাংক এমনিতেই মওকুফ করে দিতে পারে।

গ্রস খেলাপি ৯৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে দেখবেন সঞ্চিতি রাখা আছে ৪০ হাজার কোটি টাকার। অর্থাৎ আমানতকারীদের সুরক্ষিত রাখতে ব্যাংক তার মালিকদের মুনাফা থেকে এ ৪০ হাজার কোটি টাকা সঞ্চিতি রেখেছে। আমি বলব ব্যাংকিং খাতের নিট খেলাপি ঋণ ১২ হাজার কোটি টাকা, যেটির বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণ করা নেই। নিট খেলাপির হারে আমরা অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক ভালো আছি। বাংলাদেশে এটি ২ দশমিক ৬ শতাংশ, ভারতেই এ হার ৪ শতাংশের মতো।

আমি বলছি না, ৯৩ হাজার কোটির ফিগারটি যথার্থ নয়। খেলাপির হার দুই অংকের ঘরে, এগুলো সঠিক নয়। আমি শুধু বলছি, খেলাপি ঋণের সমস্যাটিকে যত বড় করে দেখা হচ্ছে, সেটি তত বড় সমস্যা নয়। তবে পুনঃতফসিলীকরণ ঠিকমতো না হলে ব্যাংকিং খাতে এবং অর্থনীতিতে সমস্যা হবে।

  • আসছে বাজেটে ভ্যাট আরোপ নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ রয়েছে, আপনি সরকার  ব্যবসায়ীমহলদুপক্ষের বাস্তবতাই বোঝেন

ভালো কথা হলো, এনবিআরের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের একটি সমঝোতা কিন্তু হয়েছে। নতুন বিষয় তো। ভালো-মন্দ সবাই বুঝতেও পারছেন না। আমি নিজেও কিছু বিষয় নিয়ে দ্বিধায় রয়েছি।

ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের জন্য রিবেটসহ শুধু ভ্যালু অ্যাডিশনের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দেয়াই ভালো হবে নাকি ফ্লাট রেটে ৫ শতাংশ বা সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট দেয়া ভালো হবে। অনেক ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে যাদের ১৫ শতাংশ হারে শুধু নিজের মূল্যসংযোজনের ওপর কার্যত ১, ২ বা ৩ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ করলেই হবে। তাকে যদি ফ্লাট রেটে ৫ শতাংশও দিতে হয়, তার ভ্যাট বেড়ে যাবে। আবার সেবা খাত রিবেট পদ্ধতিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেয়ার বদলে ফ্লাট রেটে ৫ শতাংশ ভ্যাট দিলে বেশি খুশি হবে।

  • বাংলাদেশে আয়বৈষম্য নিয়ে অনেক কথা হয়, অর্থনীতির আকার অনেক বড় হচ্ছেএর মধ্যে কীভাবে আরো শক্তিশালী মধ্যবিত্ত তৈরিকরা যায়কারণ অনেকেই বলেনবাংলাদেশে শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠছে না। বেসরকারি খাতের একজন নেতা হিসেবেআপনার মত কী?

এখানে শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠছে না—এমন কথার সঙ্গে আমি একদমই একমত না। এ মতবাদ উদ্দেশ্যমূলক। যারা এটি করছে তারা মানতে চাইছে না যে বাংলাদেশ ভালো করছে। একটি শ্রেণী আছে যারা হিংসায় মরে যাচ্ছে। আমরা ভালো করছি, এটা তারা সহ্য করতে পারছে না। বৈশ্বিক ও স্থানীয় দুই ক্ষেত্রেই এই শ্রেণী আছে।

আমি আমার নির্বাচনের সময় আমার আসনে ইউনিয়ন পর্যায়ের ভোটকেন্দ্রগুলোয় যখন যাই, তখন দেখতে পাই আমার ইউনিয়নে ছোট বাজারে পেট শপ (পোষ্য প্রাণীর দোকান)। সে খরগোশ বিক্রি করছে, টিয়া পাখি বিক্রি করছে, অ্যাকুয়ারিয়ামে মাছ বিক্রি করছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে পেট শপের মানেটা কী? একটি পেট কেনা মানে এটি পরিবারের একটি অতিরিক্ত সদস্য। একে খাওয়াতে হবে। এর চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। এখন গ্রামে কেউ বিয়ে করতে চাইলে দেখবেন, সেখানেও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি আছে।

সালমান ফজলুর রহমান

সে বর ও কনে দুপক্ষের জন্যই ওয়ান স্টপ সার্ভিস অফার করছে। আপনি অবাক হবেন- সেখানে জিম (ব্যায়ামাগার) আছে এবং নারী ও পুরুষের জন্য ভিন্ন জিম। বিউটি পার্লার তো আছেই, আবার ইউনিয়নের বাজারে চাইনিজ রেস্টুরেন্ট আছে। আমার উপজেলায় রাতের বেলা গেলে বাজারের চাকচিক্য দেখে মনে হবে আপনি ঢাকার ভেতরে কোনো শপিং মলে আছেন। এগুলো কি এমনি এমনি হচ্ছে? শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণী না হলে এটা হতো? বিদ্যুৎ যাওয়ার কারণে মানুষ এখন ফ্রিজ, ওভেন, ওয়াশিং মেশিন কিনছে। রাইস কুকার তো কমন।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলে বৈষম্য কিছুটা বাড়তেই পারে। ধনীরা দ্রুত ধনী হয়। সেটা এড়ানো যাবে না। দেখতে হবে, দরিদ্ররা দারিদ্র্য কাটিয়ে উঠতে পারছেন কিনা। যারা একেবারেই হতদরিদ্র তাদের জন্য আছে সোস্যাল সেফটি নেট। এটাও সব সময়ের জন্য দেয়া যাবে না। সোস্যাল সেফটি নেটের নকশাই করা হচ্ছে দরিদ্রদের এর গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করার জন্য।

আগে ঢাকায় ৫০ শতাংশ মানুষ দেখা যেত খালি পায়ে চলাফেরা করতে, এখন একজন মানুষ দেখতে পাবেন না যারা খালি পায়ে চলাফেরা করছে। এ বিষয়ে আমি আরো বিতর্ক করতে রাজি আছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here