সোনালী ব্যাংকের ৫ বছরে ৫ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা ঋণ অনাদায়ী

0
145

স্টাফ রিপোর্টার : ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৫ হাজার ৫৮২ কোটি টাকার বেশি ঋণ অবলোপন করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। একই সময়ে আদায় হয়েছে ৫৩৩ কোটি টাকার কিছু বেশি। সেই হিসাবে গত পাঁচ বছরে অবলোপনকৃত ঋণের মাত্র ৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ আদায় করতে পেরেছে সোনালী ব্যাংক, বাকি ৯০ শতাংশই থেকে গেছে অনাদায়ী।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব-সম্পর্কিত কমিটি সোনালী ব্যাংকের বিগত পাঁচ বছরের রাইট অফ ও রাইট অফ ব্যাংকের তথ্য জানতে চাইলে এসব তথ্য জানায় ব্যাংকটি।

অনুমিত হিসাব-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে সোনালী ব্যাংক যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে দেখা গেছে, ২০১২ সালে ব্যাংকটি ৪২২ কোটি টাকার কিছু বেশি ঋণ অবলোপন করে। আর একই বছরের অবলোপন থেকে আদায় দেখানো হয়েছে ১৩২ কোটি টাকার কিছু বেশি। ২০১৩ সালে ব্যাংকটি অবলোপন করে ২ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা, আর আদায় করতে পারে ৮৫ কোটি টাকার কিছু বেশি।

২০১৪ সালে সবচেয়ে বেশি ঋণ অবলোপন করে সোনালী ব্যাংক। সে বছর ব্যাংকটি ২ হাজার ৮০৩ কোটি টাকার কিছু বেশি ঋণ অবলোপন করে এবং ৯৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা আদায় করতে সমর্থ হয়। পরের বছর ব্যাংকটি অবলোপন করে ৩৪ কোটি ও আদায় করে ১৩৯ কোটি টাকা। আর ২০১৬ সালে ১ কোটি টাকা অবলোপন এবং ৮০ কোটি টাকা আদায় করে ব্যাংকটি।

সোনালী ব্যাংকের প্রতিবেদনে গত পাঁচ বছরে যেসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ অবলোপন করা হয়েছে, তার একটি তালিকাও দেয়া হয়েছে। তাতে দেখা যায়, ২০১২ সালে ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের ঋণ অবলোপন করেছে সোনালী ব্যাংক। এর বাইরে ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখার ৬৬টি পল্লী ঋণ হিসাবের ১২ লাখ টাকা অবলোপন করা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ অবলোপন করা হয়েছে, তাদের সবার বিরুদ্ধেই অর্থ উদ্ধারে মামলা করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

২০১২ সালে সোনালী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখার গ্রাহক সুমিস সোয়েটার্স লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানের সর্বাধিক ৭৬ কোটি ১০ লাখ টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে।

২০১৩ সালে ২১৬টি প্রতিষ্ঠানের ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করে সোনালী ব্যাংক। এর বাইরে বিভিন্ন শাখার ৪ হাজার ৪৪৭টি পল্লী ঋণ হিসাবের ৮ কোটি টাকা ও ৯৭৯টি মাইক্রো ক্রেডিট হিসাবের ঋণ অবলোপন করা হয়।

২০১৪ সালে ব্যাংকটির মোট অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। ওই বছর ২৫৬টি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ব্যাংকের বিভিন্ন শাখার পল্লী ঋণ হিসাব ও মাইক্রো ক্রেডিট হিসাবের অর্থ অবলোপন করা হয়। সে বছর বিভিন্ন শাখার ৪২ হাজার ৪৯১টি পল্লী ঋণ হিসাবের অর্থ অবলোপন করা হয়, যাতে জড়িত অর্থের পরিমাণ ছিল ৬৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঋণ জালিয়াতির ঘটনার শেষ এখনো টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছে সোনালী ব্যাংক। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে হল-মার্ক গ্রুপসংশ্লিষ্ট ১০টি প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ২২৯ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়। এর বিপরীতে ৮ হাজার ১০৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ জমি সোনালী ব্যাংকের অনুকূলে দেখান হয়; সোনালী ব্যাংকের মূল্যায়নে যার দাম ধরা হয়েছে ৮১৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়েদ উল্লাহ্ আল মাসুদ বলেন, সোনালী ব্যাংকের ক্রান্তিলগ্নে গত বছরের আগস্টে আমি যোগদান করেছি। ব্যাংকে বর্তমানে আমানত আছে ১ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকটির দৃশ্যমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা।

তিনি বলেন, ৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। আরো ২ হাজার কোটি টাকা আটকে আছে পুনঃতফসিলের রিটে। সব মিলিয়ে বিতরণকৃত ৩৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ১৯ হাজার কোটি টাকাই খেলাপি, যা ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের ৫০ শতাংশেরও বেশি। তাই যে করেই হোক, খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে হবে।

তিনি আরো বলেন, কিছু দুষ্ট ঋণগ্রহীতার কাছে ব্যাংকের টাকা আটকে আছে। এটা বাদ দিলে মোটের ওপর কিন্তু ঋণখেলাপি খুব বেশি নয়। মূল সমস্যা হচ্ছে, বড় শাখায় বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছে ঋণগুলো আটকে আছে। ঋণ আদায়ে নানা রকম পদ্ধতি আছে— সুদ মওকুফ পদ্ধতি, পুনঃতফসিল পদ্ধতি ও মামলা। যখন ক্ষুদ্র গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, তখন সফলতা আসে।

এছাড়া টাকা আদায়ের হারও ভালো। কিন্তু যখন বড় ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে টাকা আদায় করতে যাওয়া হয়, তখন খুবই অসহায় হয়ে যাই। তারা রিটের আশ্রয় নেন। ফলে রিটের চাপ থেকে বের হতে পারি না। খেলাপি ঋণ থেকে বের হতে হলে রাষ্ট্রীয়ভাবেই কাজ করতে হবে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

এদিকে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা (সাবেক শেরাটন) হোটেল শাখার ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ১৪ জন ব্যাংক কর্মকর্তার মধ্যে ১২ জনের সম্পত্তি হল-মার্ক ঋণ জালিয়াতির মামলায় অ্যাটাচমেন্টের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here