সিডিবিএলের সেবা মাশুল কমছে

0
979

স্টাফ রিপোর্টার : স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সিকিউরিটিজ লেনদেনের ওপর সেন্ট্রাল ডিপজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) সেবা মাশুল কমাতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

পাশাপাশি বিও (বেনিফিসিয়ারি ওনার্স) হিসাব রক্ষণাবেক্ষণে বার্ষিক ফি ৫০ টাকা কমানোরও প্রস্তাব রয়েছে সংশোধনীতে। তবে সিডিবিএলের সেবা মাশুল পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রীতি অনুসরণ না করে বাজারমূল্যের ভিত্তিতেই অধিকাংশ ফি নির্ধারণের বিষয়টি বহাল থাকছে।

সম্প্রতি বিএসইসির কমিশন সভায় বিও হিসাব রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য ফি কমাতে ডিপজিটরি (ব্যবহারিক) প্রবিধানমালা, ২০০৩-এর শিডিউল ৪ খসড়া সংশোধনী অনুমোদন করেছে। সংশোধনীতে নতুন ইন্সট্রুমেন্ট সংযোজনসহ ফি পুনর্বিন্যস্ত করা হয়েছে। জনমত জরিপ শেষে সংশোধনীটি চূড়ান্ত করা হবে। এর আগে গত বছরের ১ জুলাই সিডিবিএলের পরিচালনা পর্ষদ সেবা মাশুলের হার কমায়। এক বছরের ব্যবধানে সিডিবিএলের সেবা মাশুলের হার প্রায় ১৭ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

শেয়ার লেনদেন নিষ্পত্তি ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান সিডিবিএল গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত সেবা মাশুল নিচ্ছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে ব্রোকারেজ হাউজগুলো। এছাড়া শেয়ারের বাজারমূল্যের পরিবর্তে শেয়ার সংখ্যার ভিত্তিতে সেবা মাশুল নির্ধারণেরও দাবি জানায় স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো।

সিডিবিএলের পর্ষদ ব্রোকারেজ হাউজগুলোর এ দাবি বিবেচনা না করলেও ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে সেবা মাশুলের হার কিছুটা কমায়। এতে শেয়ার লেনদেনে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর ব্যয় কিছুটা কমলেও তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনো বেশি বলে অভিযোগ রয়ে যায়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে ডিপোজিটরি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সেবা মাশুল নির্ধারণ করে থাকে লেনদেন বা সিকিউরিটিজ সংখ্যার ভিত্তিতে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রীতির বাইরে গিয়ে সিডিবিএল ডিপোজিটরি হিসাবে শেয়ারের বণ্টন, লেনদেন নিষ্পত্তি ও স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটিজের বাজার মূল্যের ওপর ফি নির্ধারণ করছে।

এমনকি শেয়ার ডিমেট, রিমেট, করপোরেট অ্যাকশন ও নতুন আইপিওর (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) ফি নেয়ার ক্ষেত্রেও বাজারমূল্যই হিসাব করছে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে একই ধরনের সেবার ক্ষেত্রে শেয়ার অথবা লেনদেন সংখ্যার ভিত্তিতে মাশুল নেয়া হয়।

বর্তমানে বিও হিসাব রক্ষণাবেক্ষণে সিডিবিএল বার্ষিক ৫০০ টাকা ফি হিসেবে নেয়। খসড়া সংশোধনীতে ৫০ টাকা কমিয়ে ৪৫০ টাকায় নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিটি বিও হিসাবের ফি থেকে সরকার ২০০ টাকা, সিডিবিএল ১০০ টাকা, সংশ্লিষ্ট ডিপি ১০০ টাকা ও বিএসইসি ৫০ টাকা পাবে। আগে বিও হিসাবের বার্ষিক ফি থেকে সিডিবিএল ১৫০ টাকা পেত।

বর্তমানে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর জন্য শেয়ারের ক্রয় ও বিক্রয় মূল্যের ওপর প্রতি ১ লাখ টাকায় ১৫ টাকা সেবা মাশুল নেয় সিডিবিএল। জানা গেছে, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সেবা মাশুলের এ হার সাড়ে ১২ টাকায় নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। ন্যূনতম ফি প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। সেকেন্ডারি বাজারে ইটিএফ ইউনিট লেনদেনে ও ওপেন এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিট ক্রয়ের ক্ষেত্রে একই হারে ফি গুনতে হবে।

এক্ষেত্রে ফান্ডের নিট সম্পদমূল্যের ভিত্তিতে ফি নির্ধারণ হবে। এছাড়া প্রতি লেনদেনে করপোরেট বন্ড/ডিবেঞ্চার ও অন্যান্য ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজ ২৫ টাকা ও সরকারি সিকিউরিটিজের ১০ টাকা ফি নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। স্মল ক্যাপ প্লাটফর্মে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের বাজারমূল্যের ভিত্তিতে প্রতি লাখে ৩ টাকা ফি হবে। যদিও মার্কেট মেকার কর্তৃক লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো ফি নেয়া হবে না।

এছাড়া খসড়া সংশোধনীতে একটি বিও হিসাব থেকে অন্য বিও হিসাবে শেয়ার স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ফি উঠিয়ে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ডিপজিটরির বিও হিসাব থেকে সিকিউরিটি ডেবিট/ক্রেডিট হলে তাত্ক্ষণিকভাবে হিসাবধারীকে এসএমএস বার্তা পাঠাবে সিডিবিএল, যা ফিমুক্ত থাকবে।

বর্তমানে কাগুজে শেয়ার বা ক্লোজ এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিট ইলেকট্রনিকে রূপান্তরের (ডিমেট) ক্ষেত্রে বাজারমূল্যের ওপর প্রতি ১ লাখ টাকায় ১৫ টাকা হারে চার্জ নিচ্ছে সিডিবিএল। বিএসইসির সংশোধনীতে এ হার বহাল থাকলেও তা সিকিউরিটির অভিহিত মূল্যের ভিত্তিতে ফি নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন চার্জ বহাল থাকছে। আর ডিমেট থেকে কাগুজে শেয়ারে রূপান্তর (রিমেট) ফি প্রতি শেয়ারে ১০ পয়সা হারে অথবা সর্বনিম্ন ১০০ টাকা বহাল থাকছে। অবশ্য শেয়ার ডিমেটের জন্য ভারতের ডিপজিটরি প্রতিষ্ঠান কোনো চার্জ নেয় না।

সংশোধনীতে ইটিএফ (এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড), ওপেন এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড, করপোরেট বন্ড/ডিবেঞ্চার ও অন্যান্য ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজের ডিমেট করার ক্ষেত্রে প্রতি লাখে সাড়ে ৭ টাকা হারে সিডিবিএলের ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। স্মল ক্যাপ প্লাটফর্মে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে এ হার ৩ টাকা। এসব ফি অভিহিত মূল্যের ভিত্তিতে নেয়া হবে।

ইস্যুকৃত যোগ্য সিকিউরিটির অভিহিত মূল্যের ওপর বার্ষিক ফি বর্তমান হার বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ২০ কোটি টাকার বেশি ওপেন এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড ও ইটিএফ ফান্ডের জন্য বার্ষিক ফি ৪০ হাজার টাকা বার্ষিক ফির প্রস্তাব করা হয়েছে। স্মল ক্যাপ প্লাটফর্মে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত বার্ষিক ফি ৫ হাজার টাকা, ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা ও ২০ কোটির ঊর্ধ্বে হলে ২০ হাজার টাকা বার্ষিক ফি দিতে হবে। আর সরকারি সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে বার্ষিক ফি ৫ হাজার টাকা। নতুন ইস্যু বা আইপিওতে পূর্বের হারই বহাল রাখা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে ইলেকট্রনিক শেয়ার বিতরণ, লেনদেন-পরবর্তী মালিকানা স্থানান্তর ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২০০০ সালের ২০ আগস্ট স্টক এক্সচেঞ্জ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দেশের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সিডিবিএল গঠন করা হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে অধিকাংশ তালিকাভুক্ত কোম্পানি ইলেকট্রনিক শেয়ারে রূপান্তর না হওয়ায় সিডিবিএলের আয় নিয়ে সংশয় ছিল।

প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে বিশ্বব্যাপী প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে শেয়ার সংখ্যার পরিবর্তে শেয়ারের বাজারমূল্যের ভিত্তিতে এর সেবা মাশুল নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। গত ১৫ বছরে বাজারের আকার ও প্রকৃতিতে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। সিডিবিএলের আর্থিক ভিত্তিও অনেক শক্তিশালী হয়েছে। এ সময়ে শেয়ারহোল্ডারদের সর্বোচ্চ ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here