সালতামামি : ২০১৪ কেমন ছিল আমাদের অর্থনীতি

0
1745
নানা সমস্যায় নড়বড়ে অবস্থানে দেশের অর্থনীতি। কারণ হরতাল-অবরোধ, পুঁজিবাজারের উত্থান-পতন, ব্যাংকিং খাতের সীমাহীন দুর্নীতি, বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহ ও এডিবি বাস্তবায়নে ধীরগতি তাকায় এমন অবস্থা। বিশেষ করে আলোচ্য সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক ডাকাতি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার ও বিনিয়োগ মন্দা অর্থনীতির ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থনীতির কয়েকটি সূচক ছাড়া সবগুলোই রয়েছে নিম্নমুখী। এমতাবস্থায় দ্রুততম সময়ে সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নিতে পারলে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, হরতাল-অবরোধের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের যাত্রা শুরু হয়েছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রায় টানা দুই মাসের হরতাল-অবরোধে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অর্থনীতির এ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো জোরালো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ মোটামুটি শান্ত থাকলেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আস্থার সংকট দূর করতে পারেনি সরকার। যদিও বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্তা-ব্যক্তিরা দেশে বিনিয়োগ না বাড়ার কারণে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বিনিয়োগ না বাড়াই হচ্ছে দেশের প্রধান সমস্যা।

বিনিয়োগ বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে বিনিয়োগ বোর্ডে নিবন্ধিত বিনিয়োগ সংখ্যা ছিল ১৪৬টি, গত অক্টোবরে তা নেমে ৭৫টিতে এসেছে। সেপ্টেম্বরে যেখানে স্থানীয় ১৬ হাজার ৭৬৪ জনের কর্মসংস্থান হয়েছিল, সেখানে অক্টোবরে তা ৭ হাজার ১৬৪ জনে নেমে এসেছে। এক মাসের ব্যবধানে স্থানীয় কর্মসংস্থান সাড়ে ৯ হাজার বা প্রায় ৫৭ শতাংশ কমেছে। এছাড়া বিদেশি কর্মসংস্থান ১ হাজার ৮২৯ জন থেকে সাড়ে ৭০০ জনে নেমে এসেছে।

বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে প্রায় প্রতিটি ব্যাংকের হাতেই অতিরিক্ত অর্থ জমছে। নতুন উদ্যোক্তা না পাওয়ায় এ অর্থ বিনিয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে কমেছে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ। চলতি পঞ্জিকা বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ৮৩ কোটি ডলার। গত বছর একই সময়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছিল ৯৯ কোটি ডলার। এ ছাড়া অন্য অর্থনৈতিক সূচকগুলোর মধ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। রফতানি আয় ও রেমিটেন্স প্রবাহ আগের বছরের তুলনায় সামান্য বাড়লেও এগুলোর প্রবৃদ্ধির হার সন্তোষজনক নয়। তবে রিজার্ভ এখনও যথেষ্ট রয়েছে।

পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে নভেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমে এলেও গড় মূল্যস্ফীতি এখনও ৭ শতাংশের বেশি। অন্যান্যের মধ্যে ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি ও পুঁজিবাজারের  ওঠানামা বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল-এর বৈঠকে অর্থনৈতিক সূচকগুলোর টালমাটাল অবস্থানের কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরের অধিকাংশ সময় প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও অক্টোবর (২০১৩) পর্যন্ত রফতানি প্রবৃদ্ধি ও রেমিটেন্স প্রবাহ ছিল সন্তোষজনক। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। তবে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি মাত্র ১ শতাংশ বেড়েছে।

দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা : দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক কারণেই দেশি, প্রবাসী ও বিদেশি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। আর তাই এসব উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা জানান, প্রবাসীরা বাংলাদেশের জন্য বিরাট সম্ভাবনার ক্ষেত্র। প্রতিবছর প্রচুর বাংলাদেশি বিদেশ যাচ্ছেন। তারা অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তবে অদক্ষ শ্রমিক, প্রশাসনিক দুর্বলতা ছাড়াও বাধা কম নয়। এসব বাধা দূর করতে পারলে জনশক্তি জনসম্পদে পরিণত হবে।

তাদের মতে, দেশের মানুষ পরিশ্রমী, সৃজনশীল এখানে প্রচুর উদ্যোক্তা রয়েছে। এরা আগামীতে অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করবে। এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিণত হবে। তারা মনে করছেন, ইতোমধ্যে কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এদেশ ভারত, ভূটান ও নেপালের সঙ্গে সংযুক্ত।

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, বন্দর, সড়ক, রেলওয়ে ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। আর বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারলে বাংলাদেশ আগামী ২০২১ সালের মধ্যে সোনার বাংলাদেশে পরিণত হবে বলে তারা মন্তব্য করেন।

ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার : দেশের ব্যাংকিং খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার অলস উদ্বৃত্ত থাকার পরও বাড়ছে ব্যাংক ঋণের সুদহার। এতে উদ্যোক্তারা ঝুঁকছেন বিদেশি ঋণে। যা দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ ছাড়া ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে দেশীয় উদ্যোক্তারা নতুন করে বিনিয়োগে আসছেন না।

বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে ২৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্রদানযোগ্য তহবিল পড়ে রয়েছে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতা ও ঋণের উচ্চ সুদের কারণে দেশীয় উৎস থেকে ঋণগ্রহণে ব্যবসায়ীরা বরাবরই অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে কেবল ব্যবসা সম্প্রসারণ বা মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিই নয়, সস্তা সুদের ঋণ এনে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে থাকা চড়া সুদের ঋণ সুদাসলসহ এককালীন পরিশোধও করে দিচ্ছেন অনেকে। তবুও সুদের হার না কমিয়ে দেশের ব্যাংকগুলো বিদেশ থেকে নেয়া ঋণের জামিনদার হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশের ২০৩টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ৫৫৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার ঋণ নিয়েছে, টাকার অঙ্কে যা ৪৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বিদেশ থেকে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ও কারখানা সম্প্রসারণ করতে এসব ঋণ ব্যবহার করা হয়েছে। বিদেশের ব্যাংক থেকে ব্যবসায়ীদের নেয়া এ ঋণ দেশের মোট জিডিপির ১.৪৯ শতাংশ। এসব ঋণের গড় সুদের হার (লন্ডন আন্তঃব্যাংক সুদহার +৩) ৪.৫ শতাংশ। আর বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদের হার ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ। এ ছাড়া আর্থিক সক্ষমতার অভাবের কারণে স্থানীয় ব্যাংকগুলো বড় বড় প্রকল্পে ঋণ দিতে পারে না। এ দুটি কারণেই দেশি ব্যবসায়ীরা বিদেশি ব্যাংকনির্ভর হয়ে পড়ছেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহার সহনীয় হলে ব্যবসায়ীদের বিদেশি ব্যাংকের কাছে ধারস্ত হতে হতো না। কারণ, বিদেশি উৎস থেকে নেয়া এ ঋণের ঝুঁকিও কম নয়। মূলত ঋণ পরিশোধকালে টাকার তুলনায় ডলারের মান শক্তিশালী হলে তখন ঋণগ্রহীতার ব্যয় বেড়ে যাবে। অর্থাৎ, বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নেয়া হলেও ডলারের মূল্যমানে তা টাকায় রূপান্তর করেন ব্যবসায়ীরা। ঋণ পরিশোধের সময় টাকার তুলনায় ডলারের দাম বেড়ে গেলে তখন ডলারের হিসাবে বেশি অর্থ পরিশোধ করতে না হলেও টাকার অঙ্কে তা বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশের ব্যাংক আর বিদেশি উৎসের সুদের হারে ‘আকাশ-পাতাল’ ফারাক থাকার কারণে বিদেশের দিকেই ঝুঁকছেন ব্যবসায়ীরা।

তারা আরো বলেন, স্বল্প সুদের বিদেশি ঋণ থেকে ফিরিয়ে আনতে হলে দেশীয় ব্যাংকগুলোকে নিজেদের ‘সুদ-মুনাফায়’ বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। ঋণের সুদের হার কমিয়ে নামিয়ে আনতে হবে এক অঙ্কের ঘরে। তা না হলে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। তারা জানান, আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোর যে পরিমাণ ঋণ দেয়ার সুযোগ রয়েছে, সেটার সদ্ব্যবহার করতে হবে সবার আগে। দেশে ছোট ছোট অনেক ব্যবসায়ী রয়েছেন, যাদের পুঁজি কম। তাদের সহযোগিতা করতে হবে। এজন্য কীভাবে ঋণের সুদের হার একটু নমনীয় করা যায় তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। ব্যাংকগুলো চাইলে অনেকভাবে ঋণের সুদের হার কমাতে পারে। খেলাপি ঋণ সুদের হার বাড়ার একটি কারণ। এ ছাড়া শাখার সাজসজ্জায় উচ্চহারে ব্যয় করে ব্যাংক। এগুলো কমাতে পারলে অনায়াসে সুদের হার ১০ থেকে ১১ শতাংশে নেমে আসবে।

রফতানি আয় : চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ২৭৩ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। এর বিপরীতে রফতানি আয় হয়েছে ১ হাজার ২০৭ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি আয়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৯৬ কোটি ডলার।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মোট রফতানি করা হয়েছিল ২৫৯ কোটি ২ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য। কিন্তু কোনো কারণ না থাকার পরও এ বছর সেপ্টেম্বর মাসে রফতানি আয় ২৪ কোটি ৬৩ লাখ মার্কিন ডলার কমিয়ে লক্ষ্যমাত্রা ২৩৪ কোটি ৩৯ লাখ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়। আর সেই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রফতানি আয় ২০ কোটি ৮৯ লাখ মার্কিন ডলার বা ৮.৯১ শতাংশ বেড়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের জন্য রফতানি আয় ৮০০ কোটি ৪৫ লাখ ডলার নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এ তিন মাসে মোট ৭৬৯ কোটি ৫১ লাখ ডলার রফতানি আয় হয়েছে। অর্থাৎ কমেছে ৩.৮৭ শতাংশ।

গত তিন মাসে বাংলাদেশি ওভেন পোশাকের রফতানি আয় কমেছে ১০.১৮ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩২৯ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। কিন্তু ২৯৬ কোটি ২৭ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করা গেছে। একইভাবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানিও কমেছে। এর পরিমাণ ৮.৩৩ শতাংশ। এ পণ্য রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৩ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। কিন্তু রফতানি করা গেছে ৩০ কোটি ৮৮ লাখ ডলারের পণ্য। অন্যদিকে আলোচ্য সময়ে নিটওয়ার পোশাকের রফতানি বেড়েছে ২.৬৪ শতাংশ। এ পণ্য রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩১৮ কোটি ৬২ লাখ ডলার। আর আয় হয়েছে ৩২৭ কোটি ৪ লাখ ডলার। একইভাবে, হিমায়িত খাদ্যের রফতানি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এক কোটি ৪৫ লাখ ডলার বেড়েছে। শতকরা হিসাবে যা ৮.২৫ শতাংশ। আর কৃষি পণ্যের রফতানি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪.৬০ শতাংশ বেড়েছে।

রেমিটেন্স প্রবাহ : গত বছরের তুলনায় তেমন একটা বাড়েনি। চলতি পঞ্জিকা বছরের ১১ মাসে (নভেম্বর পর্যন্ত) দেশে রেমিটেন্স এসেছে ১ হাজার ৩৬৫ কোটি ডলার। গত বছর একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৬২ কোটি ডলার। এছাড়া মাসওয়ারি হিসেবে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে রেমিটেন্স প্রবাহ কমেছে।

রাজস্ব আহরণ : গত তিন অর্থবছর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলেও এবার অনেকটাই আশাবাদী ছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেই হোঁচট খেয়েছে এনবিআর। আর এ নিয়ে চিন্তিত সরকার।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়াতে হলে আদায়কৃত টাকা সঠিক খাতে ব্যয় করা জরুরি। সাধারণ মানুষের কল্যাণে প্রকল্প প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এজন্য সাধারণ করদাতাদের মতামত নেয়া যেতে পারে। তারা জানান, জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে কর পরিশোধ করেন, তা পূরণ হচ্ছে না। মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান শিক্ষা, চিকিৎসা। এর মধ্যে বাসস্থান শিক্ষা, চিকিৎসা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই করের টাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ তিনটি খাতকে প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন। এসব খাতের উন্নয়ন হলে শতভাগ মানুষ উপকৃত হবে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় নিয়েই করের টাকা বরাদ্দ দিতে হবে।

তারা আরো বলেন, ট্যাক্স আদায়ের পর তা ব্যয়ের হিসাব জনগণের কাছে দেয়া উচিত সরকারের। টাকা দেবে জনগণ আর সেটা কোথায় ব্যয় করা হবে জানবে না এটা হতে পারে না। করের টাকা ব্যবহারের খাত জানানো হলে আরো বেশি কর আদায় করা যাবে। এজন্য বাজেটের আগে জনগণের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করা উচিত। তারা আরো বলেন, জনগণের সুবিধা-অসুবিধা না দেখলে কর দেবে কেন। ট্যাক্স আদায় ও ফাঁকিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনগত অনেক ফাঁক রয়েছে। এসব দূর করতে আইনগুলো পার্লামেন্টে উত্থাপন করতে হবে। কর আদায়ের টাকা দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে উন্নয়ন করতে হবে। এ জন্য রাজস্ব বোর্ড কর্তৃপক্ষকে অনিয়ম, অনীহা ও দুর্নীতি দূর করতে হবে।

এর আগে এক সভায় বাংলাদেশ পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনুসর বলেন, ধনীরা বেশি সম্পদের জন্য কর দেয় কম। সম্পদের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কর নির্ধারণ করা হলে এতে উৎসাহ বাড়বে। আর করের টাকার সঠিক ব্যবহার হলে ক্রমেই করদাতার সংখ্যা বাড়বে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন : গত বছর (২০১৩) জুন থেকে হরতাল-অবরোধসহ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়ন নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়েছিল। কিন্তু চলতি অর্থবছর এ ধরনের কোনো সমস্যা না থাকলেও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় কম হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এডিপি বাস্তবায়নের হার গত চার বছরের একই সময়ের তুলনায় সর্বনিম্ন। ছয়টির অধিক মন্ত্রণালয় এক টাকাও ব্যয় করতে পারেনি। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদের আলোচনা হয়। সব মন্ত্রণালয়কে এডিপি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে।

মূলত, অবকাঠামো উন্নয়নে চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাড়ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার। নানামুখী সমস্যায় কোনো বছরই এডিপির শতভাগ বাস্তবায়ন হয় না। এডিপি বাস্তবায়নে বড় বাধা অর্থসংকট। এমন প্রেক্ষাপটে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জন্য ৮৬ হাজার কোটি টাকার এডিপি নেয়া হয়েছে। আর এ বিশাল অঙ্কের এডিপি বাস্তবায়নে অর্থের জোগান দেয়া সম্ভব হবে না- বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। ব্যয় মেটাতে সরকারকে ঋণ করতে হচ্ছে। এ ঋণের প্রায় ৯১ শতাংশই আসছে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে। ফলে সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বাড়ছে। আবার প্রত্যাশিত হারে বিদেশি সহায়তাও আসছে না। এ অবস্থায় পরবর্তী এডিপি বাস্তবায়নে অর্থের জোগান দেয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে তারা জানান। তারা বলেন, ৮৬ হাজার কোটি টাকার এডিপি বাস্তবায়নের সামর্থ্য সরকারের নেই। এতো টাকা জোগাড় করাও সম্ভব হবে না।

কারণ ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে মন্দা বিরাজ করায় আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায় খুব বেশি বাড়বে না। আবার সরকারির অনুন্নয়ন ব্যয়ও কমানোর সুযোগ নেই। আর এসব কারণেই অর্থ সংকটের পুরো প্রভাব উন্নয়ন খাতে পড়বে। তারা আরো বলেন, শতভাগ এডিপি বাস্তবায়ন করতে হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ করতে হবে। বিদেশি সহায়তার উৎস সঙ্কুচিত হয়ে আসায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এ ঋণ নিতে হবে। ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে সরকারের সুদের ব্যয় বেড়ে যায়। আবার বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বন্ধ হয়ে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তারা মনে করছেন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৯ শতাংশ। যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ১১ শতাংশ। আর তাই সম্প্রতি এডিপি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেয়ার নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পণ্য ও সেবা সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রিতা পরিহার করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বিভাগগুলোর সচিবদের অর্থবছরের শুরুতেই ক্রয় পরিকল্পনা নিতে হবে। সে অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস : দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিভিন্ন সময়ে উচ্চকণ্ঠ হলেও বাজেটে বেধে দেয়া অর্থনৈতিক সূচকগুলো অর্জন সম্ভব নাও হতে পারে বলে মনে করছেন দাতারা (বিশ্বব্যাংক ও এডিবি)। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক ডেভেলপমেন্ট আপডেটে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আগামী দিনের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এ কারণে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে ধস ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো নেতিবাচক পরিস্থিতিতে পড়তে পারে অর্থনীতি। রাজনৈতিক পরিস্থিতির এ অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে প্রভাব ফেললে অর্থনীতি ফের নেতিবাচক ধারায় চলে যেতে পারে।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা থাকলেও অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে। দেশের অর্থনীতি যে হারে আগানোর কথা সে হারে এগুচ্ছে না। চলতি অর্থবছরে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে তবে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, বিনিয়োগ প্রত্যাশিত না হওয়া, এডিপি বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হওয়ায় চলতি ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬.২ শতাংশ হবে।

বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৬.২০ শতাংশ। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি হবে ৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। ওই সময়ে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইউহানেস জাট বলেন, বাংলাদেশের অবকাঠামোগত দুর্বলতা এখনো রয়েছে। এ খাতে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন। এজন্য বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.২০ শতাংশ হওয়ার কারণ হচ্ছে- সরকারিভাবে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রেমিটেন্স বৃদ্ধি ও বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমা। ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে।

খাতভিত্তিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হবে ২ শতাংশ, শিল্প খাতে ৯.৫০ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৬.১০ শতাংশ। ব্যয়ের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ভোগ বেড়ে ৪.৯ শতাংশে দাঁড়াবে। বিনিয়োগ হবে ৬.৫০ শতাংশ, রফতানি ৬ শতাংশ ও আমদানি ২ শতাংশ হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে মূল্যস্ফীতি হবে ৭ শতাংশ, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি সঠিক পথেই আছে। প্রথম তিন মাসে রেমিটেন্স খাতে ২১.৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, এটি সন্তোষজনক। রোজা ও কোরবানির ঈদের কারণে অভ্যন্তরীণ খুচরা ব্যয় বেড়েছে। ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দুই ঈদে মানুষ ব্যয় করেছে। বন্যা হওয়ার পরও শস্য উৎপাদন ভালো। জুলাই-আগস্ট মাস পর্যন্ত এনবিআরের ১৫ শতাংশ রাজস্ব আদায় ভালো লক্ষণ। এছাড়া, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১১.৪০ শতাংশ হওয়াটা দুর্বলতার লক্ষণ বলে মনে করছে সংস্থাটি। এ কারণে রফতানি প্রবৃদ্ধি প্রথম তিন মাসে কমেছে। বেড়েছে ব্যালেন্স অব পেমেন্ট। এ জন্য এডিপি বাস্তবায়ন হারও কম।

২০১৫ সালে সার্বিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ব্যাংক ঋণের বেশি মাত্রার সুদের হার ও লক্ষমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আবার ফিরে আসলে বিনিয়োগ কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। পোশাক খাতের ঝুঁকি ও মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বাড়ানোকে বিশ্বব্যাংক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here