শ্যামল রায়ঃ বর্তমান সময়ে বাজার ভাল থাকায় অনেকেই বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। কেউ বুঝে শুনে আসছে, আবার কেউ বা না বুঝেই বাজারে বিনিয়োগ করতে আসছে। এমতাবস্থায় বাজারের মতিঝিল পাড়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কিছু ভাবনা তুলে ধরা হল।

“ব্যাংকের শেয়ারের দাম বাড়লে  মার্কেট ভালো হয় আবার ব্যাংকের শেয়ারের দাম কমলে সূচক পড়ে যায়”। এই হল বর্তমান মার্কেটের অবস্থা। আমার মনে হয় সরকার ইচ্ছে করেই শেয়ারের দাম বাড়তে দিচ্ছে না। আবার যেই একটু সূচকের উর্দ্ধগতি হয় তখন কতজনই যে কতরকম বর্ণনা বিবৃতি দেওয়া শুরু করে মনে হয় এরা মার্কেটের  সব জানে। কিন্তু সূচক পড়লে তখন আর কারও মুখ দিয়ে কোন কথা বের হয় না। কথাগুলো বলছিলেন মতিঝিলের তামান্না সিকিউরিটিজের একজন সাধারন বিনিয়োগকারী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম।

ঠাট্টার ছলে একটা হালকা প্রশ্ন, “কেন ভাই সরকার তো বার বার বলছে বুঝে শুনে বিনিয়োগ করতে, তাহলে কি বুঝে বিনিয়োগ করছেন না?” তার উত্তর, “আরে ভাই এ বাজারে কতজন লোক বুঝে শুনে বিনিয়োগ করে। এ বাজার চলছে শুধু রিউমার এর  উপর। সকাল বেলা হাউজে ঢুকলেই একজন আরেকজনকে প্রশ্ন করে কোনটার নিউজ আছে?

মতিঝিল পাড়ার আর একজন বিনিয়োগকারী মোহাম্মদ আলী খান। একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। শেয়ার ব্যবসার সাথে জড়িত আছেন অনেক দিন। বর্তমান মার্কেটের অবস্থার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ভাই আমি লাভ চাই কম, কিন্তু রিস্ক ফ্রী থাকতে চাই। অর্থাৎ আমার পোর্টফোলিওতে লাভ কম হোক কিন্তু যেন লস না হয়। আমি সেই চেষ্টাই করি। আর সার্বিকভাবে বাজারের অবস্থা এখন অনেকটাই ভালো। কারণ আমার মনে হয় সরকারের কড়া নজরদারী আছে বাজারের উপর। এই দেখুন না সূচকের গতি কি হু হু করে বাড়ছিল কিন্তু সরকারের  কঠোর নজরদারীর কারনে মার্কেটে আস্তে আস্তে স্থীতবস্থায় ফিরে এসেছে। আমার মনে হয় এটাই হওয়া উচিত কারণ বাজার নিয়ে কারসাজি হতে দেয়া উচিৎ নয়।

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক সিকিউরিটিজের  একজন মহিলা বিনিয়োগকারী রোকেয়া বেগম, তার কাছে জানতে চাওয়া- একজন মহিলা বিনিয়োগকারী হিসেবে কোন ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়তে হয় কী কখনো? দেখুন ভাই- সমস্যা হলে ট্রেড করছি ক্যামনে। আমার তো মনে হয় এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা এখন কোন ব্রোকারেজ হাউজেই নাই। অন্যান্য পেশার মত শেয়ার বাজারে মহিলারা এখন নিরাপদে বিনিয়োগ করতে পারে। তবে আমিতো কোন বড় বিনিয়োগকারী নই। মোটে আট নয় লাখ টাকার বিনিয়োগ আমার। প্রতিদিনই ট্রেড করি লাভ লস হিসাব করে মাস শেষে চৌদ্দ-পনের হাজার টাকার মত প্রফিট করি। আমার নিজের হাত খরচের জন্য আমার স্বামীর নিকট হাত পাততে হয় না। তাছাড়া এতে আমার সংসারের কাজেরও কোন ক্ষতি হয় না। আর মার্কেটের অবস্থা বেশ ভালো।

বেশ কিছু দিন ধরে মার্কেটের  অবস্থা মোটামুটি ভালই যাচ্ছে। তবে একটা ট্রেন্ড লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মার্কেট পরপর তিন চার কর্মদিবস আপ ট্রেন্ডে থাকলে পরের সপ্তাহেই আবার ডাউন ট্রেন্ডে চলে যায়। তবে এটা আমাদের মত ক্ষুদ্র বিনিয়োগ কারিদের জন্য বেশ সুখবর। কারণ এতে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতির সম্ভাবনা কম থাকে।

মতিঝিলে একটা ব্রোকারেজ হাউজের সাধারণ বিনিয়োগকারী আব্দুল লতিফ মিয়া বলছিলেন শেয়ার মার্কেটের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে। অনেকেই যে কানাঘুষা করছে মার্কেটের অবস্থা তেমন ভালো নয়। ৯৬/২০১০ সালের  মত আরও একটি  পতনের জন্য অপেক্ষা করছে শেয়ার বাজার।  তাকে প্রশ্ন করতেই- তার ত্বরিত উত্তর, “এটা কোনভাবেই সম্ভব নয়, কারণ বিনিয়োগকারীরা এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা যে যার অবস্থান থেকে সাধ্যমত বুঝেশুনে বিনিয়োগ করছেন। কাজেই ৯৬/২০১০ আর কখনও ফিরে আসা সম্ভব নয়। তবে মার্কেটের ধর্মই হচ্ছে উঠানামা করা।

এক শ্রেনীর বিনিয়োগকারী আছেন যারা একটু উর্দ্ধগতী দেখলেই হু হু করে বাই করতে থাকে। আবার নিম্নগতি দেখলেই হা-হুতাশ করে সেল করতে থাকে। তখন তারাই আবার বলতে থেকে এই বুঝি বাজারে বড় পতন আসলো। তারা আসলে বুঝতে চায়না সরকারের শেয়ার মার্কেটের উপর সার্ভিলেন্স টিমের কড়া নজরদারী আছে। এছাড়া বর্তমান গভর্নর মহোদয় এবং অর্থমন্ত্রীও শেয়ার বাজার নিয়ে অনেক সচেতন। কারণ মার্কেটের ক্ষতি হলে আলটিমেটলি তার  দায় সরকারের উপরেই  বর্তাবে। কাজেই সরকার ইচ্ছে করেই কখনোই এই দায় নিজের উপর নিতে চাইবে না।

ব্যাংকে সুদের হার অনেক কমে গেছে। এফডি আর করে এখন আর পোষায় না। তাই মানুষ এখন শেয়ার বাজারের দিকেই বেশি ঝুকছে। স্বাভাবিকভাবেই বাজারে এখন অনেক বিনিয়োগকারীর আবির্ভাব ঘটেছে। তাই লেনদেনের পরিমানও বেড়েছে। বলছিলেন সাধারন বিনিয়োগকারী- আব্দুল হান্নান মিয়া।

এক হাজার বারোশত কোটি টাকার  লেনদেন এখন স্বাভাবিক হিসাবেই ধরে নিতে হবে। আর আমাদের বাজারে যে পরিমান টাকা ঢুকেছে তাতে আড়াই তিন হাজার  কোটি টাকার লেনদেন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাছাড়া সরকারের উচিৎ শেয়ার বাজারে আরও ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। এতে মার্কেটের ষ্ট্রেন্থ আরও অনেক শক্তিশালী হবে।

তাছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠান বা মালিকরা বিনিয়োগের শর্তগুলো মানছে না কিংবা ইপিএস, ন্যাভ ইচ্ছেমত বাড়িয়ে কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের ঠকাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানকে ব্লাকলিষ্ট ঘোষনা করা। তাহলে ঠগবাজ কোম্পানিগুলো থেকে বিনিয়োগকারীরা এমনিতেই মুখ ফিরিয়ে নেবে। কারণ বিনিয়োগকারীরা এখন অনেক সচেতন। তবে এখনও দেখা যাচ্ছে কোম্পানি নেই কিন্তু সেই কোম্পানির শেয়ার বাজারে অনেক উচ্চমূল্যে ভালো ভল্যুউমে বাই সেল  হচ্ছে।

কোম্পানি নেই অথচ মার্কেটে সেই কোম্পানির শেয়ার ট্রেড হয় কেমনে? এটা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনকেই শক্তহাতে সামলাতে হবে। কারন বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফেরানোর দায়ীত্ব অবশ্যই বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনের।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here