সরকার ও কোম্পানির তথ্য, কে মিথ্যা বলছে?

0
1404

চিংড়ি ও হিমায়িত মাছ রপ্তানীতে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। সরকারের সাফল্যের ঘোষণায় বর্হিবিশ্বে আরো এগিয়ে যাওয়ার নতুন সম্ভাবনার তৈরি হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, বাংলাদেশ আরো অনেক দূর এগিয়ে যাবে। যেহেতু ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই থেকে মে) হিমায়িত ও জীবিত মাছ রপ্তানিতে বাংলাদেশ আয় হয়েছে ৪৭ কোটি ২৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার।

বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এবারে সেই পরিমাণকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। গত বছরে মাত্র ১১ মাসে চিংড়ি খাতের লক্ষ্যমাত্রা ৪০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলে প্রায় ৩৯ কোটি টাকার কাঠি স্পর্শ করেছে কোম্পানিগুলো।

জেমিসি সি ফুডের মূল কারখানার ফটক

সক্ষমতা অর্জন করায় এবারে প্রত্যাশা আরো অনেক বেড়েছে। কারণ, বিগত দিনে দেশে রাজনৈতিক কোন্দলসহ বিভিন্ন কারণে উৎপাদন ব্যহত এবং নির্দিষ্ট সময়ে রপ্তানী সম্ভব হতোনা। সে হিসেবে বাংলাদেশ এখন স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বিররাজ করছে। স্থিতিশীলতা এবং সহিংসপূর্ণ মনোভাব না থাকায় উৎপাদন বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকারের সামগ্রিক সহায়তাও বৃদ্ধি করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে এ খাতের উৎপাদন চলছে। বিভিন্ন মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির মওসুম বা কসরতের ভেতর দিয়ে চলছে কোম্পানিগুলো। তবুও অনেক কোম্পানির আয়ের পরিমাণ কম। দিনে-রাতে কমছে তাদের আনুপাতিক হারে আয়। উৎপাদন এবং বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করেও কোম্পানির আনুপাতিক হারে আয় বাড়ছে না, তবে বৃদ্ধি না পাওয়ার কারণ কি হতে পারে?

এখানে প্রশ্ন- কোম্পানিগুলো কি ব্যবসা করতে পারছে না? না পারলে সরকারের এই খাতের এতো সাফল্য কিভাবে এলো? যদি কোম্পানি ভালো ব্যবসা করে থাকে, মুনাফা বাড়ে; তবে বিভিন্ন প্রান্তিকে কেন আয়ের চিত্র প্রকাশ করা হচ্ছে না। ব্যবসা না করতে পারলে বাংলাদেশ প্রায় ৩ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার আয় করলো কিভাবে?

তবে কি কোম্পানিগুলো মিথ্যা বলছে, না-কি বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) জুন মাসে প্রকাশিত হালনাগাদ এই প্রতিবেদন ভুল। উৎপাদন বৃদ্ধির এমন চিত্র ভুল নয়, কারণ সরকারের রাজস্ব বিভাগ থেকে শুরু করে কয়েকটি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় রেখে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। তবে রপ্তানীর পরিমাণ কমের চেয়ে বৃদ্ধির হওয়ার সম্ভাবনা আরো অনেক বেশি রয়েছে।

চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই থেকে মে) হিমায়িত ও জীবিত মাছ রপ্তানিতে আয় হয়েছে ৪৭ কোটি ২৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এই বিশাল আয়ের ফলে এই খাতের সাথে জড়িত কোম্পানিগুলোর আয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুসারে এটি এ সময়ের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩ দশমিক ০৪ শতাংশ কম। এর মধ্যে অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে শুধু চিংড়ি রপ্তানিতে আয় হয়েছে ৩৯ কোটি ৫৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার; যা মোট হিমায়িত ও জীবিত মাছ রপ্তানি আয়ের ৮৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

ধরে নিলাম, কোম্পানির আয় বাড়লো, তবে লাভের গুড় খায় কে? অনেকে হয়তো আমার সঙ্গে একমত হবেন। আবার অনেকে বিরুদ্ধে যাবেন, তবে যারা কোম্পানির কর্তৃপক্ষ। কারণ হলো- যে সব কোম্পানি পণ্য রপ্তানী করছে তাদের মূল কোম্পানির আড়ালে সাবসিডিয়ারি কোম্পানি রয়েছে। সেসব কোম্পানির নামে যাচ্ছে এসব পণ্য।

অন্যান্য সব কোম্পানির আয় বাড়লেও এসব কোম্পানির বাড়ে না। রপ্তানী বাড়ে, দেশে বিপুল পরিমাণের আয় হয়, কিন্তু কোম্পানি চিত্র বদল হয়না। আড়ালে সাবসিডিয়ারি কোম্পানি খাচ্ছে লাভের গুড়। বঞ্চিত হচ্ছেন- এই খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কিছু বিনিয়োগকারী।

অনুসন্ধান করলেই মিলবে- কোম্পানির এমডি বা চেয়ারম্যানের নিজস্ব লোক দিয়ে অন্য নামে তৈরি করা হয়েছে আরেকটি কোম্পানি। উৎপাদন ব্যয় করা হচ্ছে মূল কোম্পানির নামে এবং আর পণ্য রপ্তানী হচ্ছে সাবসিডিয়ারি বা অজ্ঞাত সেই কোম্পানির নামে। যেকোন খাতের কোম্পানির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারেন- এই চিত্র। অভিজ্ঞতার আলোকে আমার এই প্রকাশ।

একই সঙ্গে আরো জানা দরকার- পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি জেমিনি সি ফুড ও বিচ হ্যাচারি লিমিটেড সামুদ্রিক মাছ রপ্তানী করে। এর মধ্যে বিচ হ্যাচারি লিমিটেডের উৎপাদন বন্ধ।

জেমকন গ্রুপের কোম্পানি জেমিনি সি ফুড বিশাল আয়তনের কারখানা এবং দক্ষ লোকবল দিয়ে পরিচালিত। তবু আয় কমছে কেন? অনুসন্ধান চলে- কথা হয় কোম্পানির কর্তৃপক্ষ এবং অনেক শ্রমিকে সঙ্গে। হাজারো প্রশ্ন থাকলেও আদতে সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না। ইতোমধ্যে কোম্পানির কর্তৃপক্ষ খুলনার রুপসায় নতুন করে আরো ব্যবসা বৃদ্ধি করছে বলে জানা গেছে।

জেমিসি সি ফুডের মূল কারখানা

জেমকন গ্রুপের এই কোম্পানির যে চিংড়ি উৎপাদন হয় তা মিনাবাজারে বিক্রি করা হলেও অনন্ত কোম্পানির ব্যয় কমবে এবং অন্যদিকে আয় বাড়বে। তার ওপরে বিদেশে রপ্তানী করেও কেন আয় কমবে? ভেতরের গুড় খায় কে? নিয়ন্ত্রক সংস্থার এ বিষয়ে অনুসন্ধান করা দরকার বলে মনে করছি।

জেমিসি সি ফুডের মূল অফিস

সম্প্রতি পরিদর্শনে যাই খুলনার রুপসায়। সেখানে জেমিনি সি-ফুডের কারকানায় মেলে ভিন্ন চিত্র। কারখানার অনেক শ্রমিক এবারের মওসুমকে অনেক ভালো বলছেন। তারা প্রত্যাশা করছেন, বিগত দিনের তুলনায় এবারে কোম্পানির আয় অনেক বাড়বে। কেননা, সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন গত বছরগুলোর তুলনায় এবারে অনেকটা বেশি।

জেমিসি সি ফুডের মূল কারখানার পাশে নদী

ছবির মাধ্যমে কোম্পানির কারখানার কিছু চিত্র প্রকাশ করা হলো।

জেমিসি সি ফুডের মূল কারখানা পাশে কিনছে এই জমি

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) জুন মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে হিমায়িত ও জীবিত মাছ রপ্তানিতে আয় হয়েছিল ৫৩ কোটি ৫৭ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। চলতি অর্থবছরে এই খাতের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৪ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে প্রথম ১১ মাসে ৪৮ কোটি ৭৬ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার আয়ের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে ৪৭ কোটি ২৮ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। এটি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ কম।

জেমিসি সি ফুডের মূল কারখানার পেছনের অংশ

২০১৫-১৬ অর্থবছরের জুলাই-মে মেয়াদের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই মেয়াদে হিমায়িত ও জীবিত মাছ রপ্তানি আয় ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এ খাতের পণ্য রপ্তানিতে আয় হয়েছিল ৪৮ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার।

  •  রাহেল আহমেদ শানু, সাংবাদিক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here