‘সরকারি কথিত কোম্পানিগুলো বিক্রি করে দেয়া উচিত’

0
1138

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট বড় হচ্ছে। বড় হওয়াই স্বাভাবিক, কারণ অর্থনীতিও বড় হচ্ছে। নিম্ন ট্যাক্স-জিডিপির অনুপাত নিয়েও বাজেটের আকার বড় হচ্ছে এমন একটা সময়, যখন উন্নয়ন সহযোগীদের মতো পূর্বের ন্যায় বড় রকমের কনসেশনাল ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। এর অন্য অর্থ হলো, বাজেটে বর্ধিত অর্থের জোগান বাংলাদেশ সরকার তার কর কাঠামোকে ব্যবহার করেই জোগান দিচ্ছে।

গত এক দশকে কর আদায়ের হার বেশ বেড়েছে, সামনে আরো বাড়বে বলে আশা করা যায়। তবে সরকারি বাজেটের অন্য বৈশিষ্ট্য হলো, রাজস্ব বাজেট দ্রুত বেশ বড় হচ্ছে। সে তুলনায় উন্নয়ন বাজেটের আকার পেছনে পড়ে আছে। একসময় এ দুই বাজেট সমান ছিল। কিন্তু এখন রাজস্ব ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।

যে তুলনায় রাজস্ব বাজেট বেড়েছে, সে তুলনায় সরকারি কাজকর্মে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা কোনোটিই আসেনি। অর্থনীতির বাজারতত্ত্ব প্রয়োগ করলে দেখা যাবে, সরকারি দপ্তরে এবং অন্য আধা সরকারি দপ্তরগুলোয় অনেক লোকই বেকার। যারা পূর্ণক্ষমতায় কাজ করে না, তাদের অর্থনীতির ভাষায় আন্ডার এমপ্লয়েড বলা হয়। কাগজে-কলমে কিন্তু এখনো অনেক পদ খালি।

কাজ বাদে নিয়োগ দিয়ে অসংখ্য পদ সৃষ্টি করে সেগুলোকে খালি দেখানো যাবে। আর পদ সৃষ্টি করে বেকারত্ব সমস্যার সমাধান করার কথা শুধু জ্ঞানে ঘাটতি আছে, এমন লোকরাই বলতে পারে। রাজস্ব বাজেটের বৃদ্ধির দৌড় থামিয়ে দিতে পারলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য আরো বেশি অর্থ পাওয়া যেত।

শেষ পর্যন্ত বাজেটের বরাদ্দও জিরো সাম গেমের নিয়ম মেনে চলে। এক খাতে বরাদ্দ বেশি হলে অন্য খাতে বরাদ্দ কম হবে। কিন্তু বাজেট এলেই সবাই বরাদ্দ বেশি চায়। মনে হবে, তাদের দাবিটা মেনে নিলে দেশের অর্থনীতির অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু চাওয়ার একটা প্রবণতা হলো— যতই দেয়া হবে, ততই চাওয়া হবে।

সরকার বরাদ্দ বাড়িয়ে কাউকেই খুশি করতে পারেনি; পারবেও না।

আমি অন্য কথা বলতে চাচ্ছি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের বাজেটের অর্থায়নের মূল উৎস হলো, ট্যাক্স বা কর। কর রাজস্ব আয়ের বাইরে সরকারের আয় অতি নগণ্য। অন্য উৎসগুলো হতে পারত বিনিয়োগ থেকে ডিভিডেন্ড আয়, সেবা প্রদানের বিপরীতে মূল্য ও ফি এবং সরকার কর্তৃক পণ্য-সেবা বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত অর্থ।

কিন্তু সত্য হলো— ডিভিডেন্ড, ফি এবং বিক্রয়মূল্য থেকে সরকারের আয় অতি সামান্য। তাহলে আমাদের সরকার কি কোথাও বিনিয়োগ করেনি? করেছে, কিন্তু ওইসব বিনিয়োগ থেকে সরকার কোনো মুনাফাই পাচ্ছে না। ডিভিডেন্ড আয় আসে ইকুইটি ইনভেস্টমেন্ট থেকে। বাংলাদেশ সরকারও শত শত কোটি টাকার ইকুইটি ইনভেস্ট করেছে। কিন্তু সত্য হলো, ওইসব বিনিয়োগ থেকে সরকার ডিভিডেন্ড আয় পাচ্ছে না। এর অর্থ হলো, যেসব প্রকল্প-প্রজেক্টে সরকার স্থায়ী মূলধন বা ইকুইটি ইনভেস্ট করেছে, ওইসব প্রকল্প-প্রজেক্ট লোকসানে আছে বা ডিভিডেন্ড দেয়ার মতো কোনো আয় তাদের নেই।

তাহলে দেখতে হবে, ওইসব বিনিয়োগে সরকার গেল কেন? গেছে ইচ্ছায় এবং ক্ষেত্র বিশেষে অনিচ্ছায়। যত সরকারি কল-কারখানা বা কোম্পানি আছে, ওইগুলোর কোনো কোনোটি ১০ বছর আগে পর্যন্ত কম হলেও কিছু লাভ করত। কিন্তু এখন ওইগুলো বসে গেছে। তবুও সরকার যেন ওইগুলোর প্রতি একটা দায় অনুভব করে। মূলধন তো দিয়েছে, এখনো প্রতি বছর ওইসব সরকারি স্থাপনা-ব্যবসাকে কয়েকশ কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। দিতে হচ্ছে বলব না। সরকার দৃঢ় অবস্থান নিতে পারছে না বলে ওইসব ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান সরকারকে ক্যাশ-কাউ হিসেবে ব্যবহার করছে।

চাইলেই যখন সরকার থেকে অর্থ পাওয়া যায়, তাহলে চাইতে অসুবিধা কোথায়! সরকারের কাছে অর্থ চাওয়ার দৌড়ে এখন এগিয়ে গেছে রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকগুলো। ওইগুলোকে শত শত কোটিতে নয়, হাজার হাজার কোটিতে অর্থ জোগান দিয়ে সরকার বলছে— ক্যাপিটাল ঘাটতি মেটানোর জন্য ওই জোগান! হায়রে অর্থায়নের ধরন!

একদিকে ট্যাক্স বসিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আনা হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণ দিতে গিয়ে লোকসানে পড়ে যে মূলধন ঘাটতি হচ্ছে, তা পূরণ করা হচ্ছে ওই ট্যাক্সের অর্থে! এ মূলধন খেয়ে ফেলা, আবার ট্যাক্সের অর্থে তা পূরণ করার এ সাইকেল কি কখনো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শেষ হবে না? সহজে অর্থ পেলে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানই ব্যবসা করবে না। এটাই স্বাভাবিক।

সরকারি কোম্পানি বা কথিত ব্যবসায়িক স্থাপনাগুলো অনেক আগেই প্রাইভেট সেক্টরের কাছে বিক্রি করে দেয়া উচিত ছিল। আর এখন তো সরকার এক ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে— যথেষ্ট বিক্রি করা হয়েছে, আর কোনো কিছুকে বিক্রি করা হবে না।

বিক্রির জন্য যে কমিশন গঠন করা হয়েছিল, তারা এখন সেই কমিশনকেও গুটিয়ে ফেলেছে। এখন লোকসান হলে— হয় সরকার আরো অর্থ দেবে, না হলে ওইগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। তবে বন্ধের উদাহরণ বাংলাদেশে তেমন নেই। অর্থনীতির সূত্র মেনে চললে বাংলাদেশ সরকারের অধীন প্রায় সব কোম্পানি-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এত দিনে বন্ধ হয়ে যেত। বিরাট অদক্ষ এক সরকারি খাত নিয়ে পুরো অর্থনীতি দক্ষভাবে চলবে— এটা আশা করা যায় না।

সরকার বিনিয়োগ করেছে কিন্তু আয় পায় না। তবে সেটা হচ্ছে সরকারি ভুলে। ব্যবস্থাপনার মেজরিটি শেয়ার ব্যক্তিখাতে, বিশেষ করে শেয়ারবাজারে ছেড়ে দিলে সরকার অবশ্যই বড় অংকের মুনাফা পেত। এক সময়ের তারকামানের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল টিউবস, ইস্টার্ন কেবলস, ওসমানিয়া গ্লাসশিট এখন লোকসানে। অথচ ওইসব কোম্পানি থেকে সরকার ৫১ শতাংশ শেয়ার জনগণের কাছে বিক্রয় করে দিলে বিনিয়োগের জন্য অর্থের অভাব হতো না।

ম্যানেজমেন্টের উন্নতির মাধ্যমে যে মুনাফা ওইসব প্রতিষ্ঠান অর্জন করত। সে মুনাফার ৪৯ শতাংশ ডিভিডেন্ড হিসেবে সরকার পেলে সে অংক হতো কয়েকশ কোটি টাকার।

অন্যদিকে ৫১ শতাংশ শেয়ার বেচে সরকার যে অর্থ সংগ্রহ করতে পারত, সে অংশ হতো কয়েক হাজার কোটি টাকার। এ তিনটি কোম্পানির আংশিক শেয়ার অনেক আগে জনগণের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। এরপর ওইগুলো এবং অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে অতিরিক্ত শেয়ার বেচবে বলে সরকার বারবার ঘোষণা দিলেও গত ১০ বছরে সরকার একটি শেয়ারও বেচতে পারেনি।

আর এখন কেউ বিশ্বাসও করে না, সরকার ওইগুলো থেকে আদৌ শেয়ার বেচতে পারবে। যাদের শেয়ার বিক্রির দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, তারা কোনো দিনই সরকারি পলিসি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তরিক ছিল না। তাদের অনেকে এখন অবসরে চলে গেছে। কিন্তু পদে থাকতে কাজটি করে যায়নি। বিশ্বের প্রায় সর্বত্র সরকারি লাভজনক স্থাপনাগুলোর শেয়ার স্টক মার্কেটের মাধ্যমে জনগণের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

যে অর্থ বিক্রি থেকে সরকার পেয়েছে, তা দিয়ে সরকার অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছে। সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে শেয়ারবাজারে ভালো শেয়ারের জোগান দেয়া সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে যাদের সঞ্চয় আছে, তাদের ভালো শেয়ার কিনে ভালো মুনাফা করারও সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ সরকারের পলিসি মেকাররা এ ইস্যুগুলো মনে হয় বোঝেন।

তবে তারা কেন যেন কাজগুলো এগিয়ে যেতে চান না। আজকে ওইসব তারকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বসে যেতে দিয়ে কার কী লাভ হচ্ছে! সরকার শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ করেও মুনাফা পাচ্ছে না।

অন্যদিকে দেখুন, সরকার যেসব বিদেশী এবং ক্ষেত্র বিশেষে স্বদেশী বিনিয়োগ থেকে সামান্য ইকুইটি ক্যাপিটালের জোগান দিয়ে অতি বড় অংকের ডিভিডেন্ড আয় পেতে পারত, তার ধারে কাছেও যায়নি। ধরুন, গ্রামীণফোন-বাংলালিংক মোবাইল টেলিফোনের কথা। এগুলোকে তো লাইসেন্স দিয়েছে সরকার। লাইসেন্স দেয়ার সময় এগুলোয় ১২ শতাংশ ইকুইটি ক্যাপিট্যাল সরকার জোগান দিয়ে কি কোনো শর্ত দিতে পারত না? পারত। তবে আমি মনে করি, না দেয়ার ক্ষেত্রে পলিসি মেকারদের মধ্যে অজ্ঞতা কাজ করেছে। মালয়েশিয়ায়  দেখুন, তাদের সরকারি মালিকানায় গঠিত সভরেন ফান্ডে বড় বড় শ্রমগোষ্ঠী ইকুইটি পার্টনার হয়েছে।

এতে মালয়েশিয়ার সরকার বছরে হাজার হাজার রিঙ্গিত ডিভিডেন্ড আয় হিসাবে পাচ্ছে। বিদেশীরা যখন ব্যবসা করতে আসে আর সরকারের কাছ থেকে ইকুইটি পার্টনার হতে আগ্রহের ঘাটতি দেখে, তখন আমাদের পলিসি মেকারদের বোকা মনে করে। আমরা হলাম- পেনি ওয়াইজ পাউন্ড ফুলিশ! না হলে আমরা কেন শুধু লাইসেন্স বিক্রি ফি, স্পেকট্রাম বিক্রয় বাবদ ফি এবং কল-সিমের ওপর ভ্যাট আরোপ করে বসে থাকব।

চিন্তা করে দেখুন, আজকে যেসব বিদেশী বিনিয়োগ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আসছে, ওইগুলোতে যদি সরকার শুধু ৫-১০ শতাংশ মূলধনে অংশীদারিত্ব নিত, তাহলে বছর শেষে সরকার যে মুনাফা পেত, তার পরিমাণ কত হবে? কিন্তু আমাদের চিন্তাধারায় স্বচ্ছতার অভাবের কারণে আমরা ভুলেই গেছি, লাভ বেশি হতো মালিকানার একটা অংশ পেলে।

আজকে আমরা ট্যাক্স-নির্ভর বাজেট প্রণয়ন করতে গিয়ে মেগা প্রজেক্টে অর্থায়নের জন্য অর্থের ঘাটতিতে ভুগছি। বড় অংকের ডিভিডেন্ড আয় পেলে ওইসব প্রজেক্ট অর্থায়নের জন্য অর্থের কি কোনো অভাব হতো? অর্থায়নের পদ্ধতিগুলো নিয়ে আমাদের প্রশাসকদের মধ্যে স্বচ্ছ জ্ঞান থাকতে হবে।

  • আবু আহমেদলেখক: অর্থনীতিবিদ; পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ, অনারারি অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here