সমন্বয়ের গহিনে বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগ নেই: মন্দায় ডুবছে পুঁজিবাজার

1
1239

পুঁজিবাজার থেকে মুনাফা উত্তোলনে বিনিয়োগাকারীদের প্রচেষ্টার অন্ত নেই। হাতে টাকা থাকলেও লেনদেনে অংশ নেয়াটাই এখন বাজার বিনিয়োগকারীদের প্রধান আচরন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন বিনিয়োগ নেই এটি সাধারন বিনিয়োগকারীদের স্ব- ঘোষিত স্বীকারক্তি। তারপরও তারা নিয়মিতই লেনদেনে থাকছে। স্টক বাংলাদেশের পক্ষে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জানা গেছে, পোর্টফোলিওতে যে শেয়ার আছে তার কোনটির দাম কমলেই সেটি বিক্রি করে নতুন কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করছেন বিনিয়োগকারীরা। কিংবা মূল্য সমন্বয় (নিটিং) করার জন্য ভাল কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করতেই দ্বিধা করছেন না তারা।

Tread 1 stockবাজার বিনিয়োগকারীদের এমন আচরন সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হচ্ছে, পুঁজিবাজারে শেয়ার ক্রয় বিক্রিয় হবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্ত বাজারে অযৌক্তিক যেসব কার্যক্রমের মাধ্যমে শেয়ার ক্রয় বিক্রিয় হয়ে থাকে তার বিপরীত চিত্র হচ্ছে অব্যাহত মন্দা। এটির সমাধানে উদ্যোগ নেয়া উচিত। এজন্য শেয়ার বিক্রির পর পোর্টফোলিওতে ক্রয় যোগ্য যে টাকা থাকে তা এদিন বা দুদিনের জন্য লক করে দেয়া উচিত। তা হলে বিনিয়োগকারীদের এক কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে একই দিনে অন্য কোম্পানির নতুন শেয়ার ক্রয়ের প্রবণতা কমে আসবে। যদিও ডিএসই বলছে, এতে ডিএসইর আয় কমে আসবে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে বাজারে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে ১৯ জানুয়ারী ৭২০ কোটি টাকা। এরপর আর সাতশ কোটি টাকার ঘরে পৌছাতে পারেনি বাজার লেনদেন। তিনশ কিংবা সাড়ে চারশ মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে বাজারের সার্বিক লেনদেন। শেয়ারের দাম কমেছে। তাই কমছে বাজার মূলধন।

বিনিয়োগকারী রুহুম আমীন জানান, মূল্য সমন্বয় হচ্ছে বর্তমান পুঁজিবাজারের প্রধান লেনদেন চিত্র। সকালে ট্রেডিং শুরু হলেই পোর্টফোলিওতে থাকা শেয়ারগুলোর মধ্যে কোনটির দাম কমছে আর কোনটির দাম বাড়ছে তা যাচাই শুরু হয়। তারপর লেনদেনের অবস্থা বোঝে শেয়ার বিক্রি আর শেয়ার ক্রয়।

সকালে লেনদেন শুরুর কয়েক ঘন্টার মধ্যে এমনটিই দেখা গেছে ট্রেডিং হাউজগুলোতে। ওয়াংফু সিকিউরিটিজের রিয়াল হোসেল জানান, নতুন বিনিয়োগ করে শেয়ার ক্রয়ের প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের খুবই কম। বরং তাদের হাতে যে শেয়ার আছে তার থেকে কিছু বিক্রি করে নতুন কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করে। আর নয়তো মূল্য সমন্বয়ের লক্ষ্যে পোর্টফোলিও’র লোকসানে থাকা শেয়ার বিক্রি নতুন শেয়ার কিনছে। নতুন বিনিয়োগ করে মূল্য সমন্বয়ের কোনো আগ্রহ বর্তমান বাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেই। এভাবেই চলছে বাজার বিনিয়োগকারীদের প্রতিদিনের লেনদেন অবস্থা।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী হচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান। কিন্ত এই প্রতিষ্ঠানগুলোই এখন নিষ্ক্রিয়। বিশেষ করে ব্যাংকের শেয়ার প্রতি দাম এতটাই নিম্মমুখী যে, যে কেউ মুনাফা উত্তোলনের জন্য ব্যাংকের শেয়ার থেকে বিরত থাকবে।

পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগের বিষয়ে ডিএসই সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী বলেন, বিনিয়োগকারীদের ক্রয় বিক্রয়ের উপর ডিএসই একটি কমিশন পায়। শেয়ার বিক্রির পর সেই টাকা দিয়ে একদিন পর শেয়ার কেনা যাবে এটি করা হলে ডিএসইর আয় কমে আসবে। তবে বিনিয়োগকারীদের বাজারে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে আগ্রহী করার জন্য এটি বিবেচনা করা যেতে পারে। শেয়ার বিক্রি করে সেদিনই নতুন শেয়ার ক্রয়ে করতে না পারলে বিনিয়োগকীরা একদিন অপেক্ষা করবে।

Tread 2 stockজিএসপি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা দেবব্রুত কুমার সরকার জনান, বর্তমান বাজারের মন্দার পেছনে কয়েকটি কারণ আছে। এরমধ্যে মিউচুয়াল ফান্ডের অবসায়ন, নতুন বিনিয়োগ না থাকা এবং বিনিয়োগকারীদের নিটিং (সমন্বয়) প্রবণতা। মূলত নিটিং প্রবণতার কারণে বাজারে কোনো কোম্পানি শেয়ারের দর স্থায়ী হচ্ছে না। লোকসানে থাকলেই বিনিয়োগকারীরা সেই কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে। বিক্রয়কৃত টাকা দিয়ে সেদিনই আবার অন্য কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করছে। এতে একদিনে শেয়ারের বিক্রয় চাপ বাড়ছে অন্যদিকে নিম্মমুখী থাকা কোম্পানির শেয়ারের দর আর বাড়তে পারছে না। এজন্য শেয়ার বিক্রির একদিন পর সেই টাকা দিয়ে আবার শেয়ার ক্রয় করতে দেয়া উচিত। তবেই বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা আসবে।

তিনি বলেন, বাজারে নতুন বিনিয়োগ নেই বলে-ই লেনদেন তিনশ কিংবা চারশ কোটি টাকায় আটকে আছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নিটিং প্রবণতার কারণে ভাল কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়ছে না। আর নতুন বিনিয়োগ না আসায় একবার কোন একাটি কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়লে তা আর বাড়ে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী জাতীয় ঐকের সাধারন সম্পাদক আনম আতাউল্লাহ নাঈম জানান, বিনিয়োগকারীরা নিটিং বা মূল্য সমন্বয় না করলে মুনাফা পাবে কোথা থেকে? নিটিং করে যা আসছে তা দিয়েই আবার নতুন শেয়ার কেনা হচ্ছে। তবে এটি সত্য বাজারে আগের মতো নতুন বিনিয়োগ নেই। এক্ষেত্রে যেমন পিছিয়ে আছে ব্যাংকগুলো ঠিক তেমনি পিছিয়ে আছে মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলো। ফলে বিনিয়োগকারীরা তাদের সামান্য লাভের আশায় এক কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে অন্য কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করে। তবে নিটিং করার সময় বেধে দেয়া হলে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের ক্ষেত্রটি তৈরি হবে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here