‘শঙ্কিত হও, যখন সবাই আশাবাদী…’

0
3006

দেশের পুঁজিবাজারে সুবাতাস বইছে। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে বাতাস বইতে শুরু করেছে। বাধা ছিল অনেক, প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে মাত্র চার মাসে সূচক এবং লেনেদেনে অনেক উত্থান ঘটে। যা, গত দুই বছরের মধ্যে ইনডেক্সের সর্বোচ্চ অবস্থান।

প্রান্তিক বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকারের নীতিনির্ধারক মহল সকলেই আশাবাদী হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ ছয় বছরের খরা কাটিয়ে বাজার তার জৌলুস ফিরে পাচ্ছে।

ছোট-বড় সবাই নতুন সব স্বপ্ন বুনছেন। ২০১০ এর তিক্ত অভিজ্ঞতার পর আবারো আলোর দেখতে চান। এবারে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই ঊর্ধমূখী। ফলে ব্যক্তি শ্রেণির বিনিয়োগকারী, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, বাজার বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারণী মহল বলছেন, পুঁজিবাজারে শুভদিন আসন্ন।

পতন শেষে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে; এতে নতুন কোন চমক নেই। বিশ্বজুড়ে বাজারের উত্থান-পতন নিয়মিত ঘটনা। যা চক্রাকারে চলে আসছে। তবে সর্বশেষ পতনের ধাক্কা কাটিয়ে দেরিতে হলেও উঠে দাঁড়াবার পূর্বাভাস দিচ্ছে।

প্রতিটি পতন থেকেই বাজার সংশ্লিষ্টরা কিছু না কিছু শিক্ষা গ্রহণ করেন। আমাদের অবস্থাও ব্যাতিক্রম নয়। নিয়ম-নীতি, আইন-কানুন, ম্যানেজমেন্ট অনেক কিছুই আমুল পাল্টে ফেলা হয়েছে। তবে বিনিয়োগকারী হিসেবে আমাদের মানসিকতা ও বিনিয়োগ চিন্তায় ব্যাপক পরিবর্তন আসেনি। তবে শুধু মাত্র আইন-কানুন দিয়ে পুঁজির পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব নয়।

এখানে বিনিয়োগ গুরু ওয়ারেন বাফেট একটি বক্তব্য দেয়া প্রয়োজন। তা হলো- ‘শঙ্কিত হও, সবাই যখন আশাবাদী। সাহসী হও, সবাই যখন ভীত সন্ত্রস্ত’। বাজার নিয়ে সবাই এখন আশাবাদী। চারপাশের উচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভেসে না গিয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীদের জন্য সময় এখন সাবধানী হওয়ার। মন্দা বাজারে ভাল স্টক ন্যায্য দামে বা অবমূল্যায়িত অবস্থায় কেনার জন্য অনেক বেশী সযোগ পাওয়া যায়। ঠিক বিপরীত অবস্থা হয় উঠতি বাজারে। নায্য দামে কেনার সুযোগ যেমন কমে আসে, তেমনি উচ্চ দামে মানহীন শেয়ার কেনার আশঙ্কা বাড়তে থাকে।

তাই উঠতি বাজারে বুদ্ধিমান বিনিয়গকারীরা কেনার ক্ষেত্রে অধিক সাবধানতা অবলম্বন করেন। কারণ, কেনার সময়-ই মুনাফা নিশ্চিত করতে হয়, বিক্রি করে মুনাফা করা সম্ভব নয়। মূল্য ছাড়ে (অবমূল্যায়িত স্টক) অথবা সঠিক দামে কিনতে পারলেই শুধু মুনাফাসহ বিক্রি করার সুযোগ পাওয়া যায়। উচ্চ দামে কিনে অতি উচ্চ দামে বিক্রি করার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

বাজার নিয়ে আগের যে কোন সময়ের চেয়ে এখন সবাই অনেক বেশি আশাবাদী। তাই ভয়ে গুটিয়ে যাওয়া অনাবশ্যক। শুধু কেনার সময় একটু অতিরিক্ত সাবধানী হেতে হবে। সাবধান হলেই বড় ক্ষতির ফাঁদ থেকে বাঁচা সম্ভব। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হিসেবে পুঁজির নিরাপত্তা আগে, তার পর মুনাফা অর্জনের চেষ্টা। গত দুই-তিন মাসে বাজারের সব শেয়ারই কমবেশি দাম বেড়েছে। যারা যা কিনেছেন তাতেই মুনাফা পেয়েছেন। কারণ, বেশির ভাগ স্টক ছিল অবমূল্যায়িত।

তবে এমন অবস্থা ক্ষণস্থায়ী। ঊর্ধমূখী বাজরে দ্রুত বহু স্টক সঠিক দামে চলে যাবে। আবার কোন-কোনটি অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়বে। তাই আজ যা অল্প মুনাফায় বিক্রি করছেন, তা আগের মূল্য স্তরে কেনার সুযোগ নাও পেতে পারেন।

ওয়ারেন বাফেটের ভাষায়, ‘পূঁজিবাজার এমন এক স্থান, যা ধৈর্যহীনদের পুঁজি ধৈর্যশীলদের পকেটে স্থানান্তর করে’। এবং তার সহযোগী চার্লস মঙ্গার বলেন, ‘কেনা-বেচায় (ট্রেডিং) বড় মুনাফা সম্ভব নয়, যা অপেক্ষায় (বিনিয়োগ) মেলে।’

তাই পোর্টফলিওতে থাকা ভাল শেয়ারগুলোকে সময় দিন। যেন ন্যায্য দাম ফিরে পায়। শুধু সেই স্টকগুলি বিক্রি করুন, যা আপনার বিবেচনায় অতিমূল্যায়িত হয়ে যাচ্ছে। তাতে আপনি এক দিনে মুনাফা নগদায়ন করতে পারছেন। অপরদিকে পোর্টফোলিওকে ঝুঁকিমূক্ত রাখতে পারছেন।

তাই হুট হাট স্টক পরিবর্তন না করে, ভাল যা আছে- তাতেই থাকুন। ভাল দাম পেলে অল্প অল্প করে বা ধাপে ধাপে বিক্রি করুন।

যদি নতুন কিছু কিনতেই হয় তবে কৃপণতার পরিচয় দিন। যাচাই বাছাই করে, দামাদামি চূড়ান্ত করে কিনুন। ঠিক যেভাবে কাঁচা বাজারে শাকসবজি কেনেন, সেভাবে। হট টিপস আর বেড়ে যাওয়া হট স্টকের পিছু ধাওয়া না করে ভাল স্টক কমে/ন্যায্য দামে কেনার চেষ্টা করুন।

কারণ, কিনেই মুনাফা নিশ্চিত করতে হয়, বিক্রিতে নয়।

  • মোহাম্মদ হাসান শাহারিয়ার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here