লিবরার ‘পাওনা অনুমান নির্ভর’

0
284

স্টাফ রিপোর্টার : আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের (এআইবিএল) কাছে লিবরা ইনফিউশন্সের দাবিকৃত ১৫৭ কোটি টাকা পাওনাকে নিতান্তই অনুমাননির্ভর বলে অভিহিত করেছে কোম্পানিটির নিরীক্ষক রহমান মোস্তফা আলম অ্যান্ড কোম্পানি। দাবিকৃত অর্থের সপক্ষে কোনো ধরনের নথিপত্রও নিরীক্ষককে দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে কোম্পানিটি।

২০১৬-১৭ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে কোয়ালিফাইড মতামতে এ তথ্য উল্লেখ করেছে লিবরার নিরীক্ষক। তাছাড়া কোম্পানিটির সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন, স্থায়ী সম্পদের ওপর অবচয় ধার্য না করা ও বিলম্বিত কর দায় সম্পর্কিত বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে নিরীক্ষক।

ব্যাংকের কাছে লিবরার পাওনা নিয়ে নিরীক্ষক বলছে, ২০১৬-১৭ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে লিবরা ইনফিউশন্স এআইবিএলের কাছে দাবিকৃত ১৫৭ কোটি ২০ লাখ ৫৮ হাজার ৬৬১ টাকা অন্যান্য পাওনা হিসেবে দেখিয়েছে। সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর লোকসান বা ক্ষতির ভিত্তিতে কোম্পানিটি এ অর্থ দাবি করেছে বলে পাওনা হিসেবে উল্লেখ করা অংকের সঙ্গে একমত হতে পারেনি নিরীক্ষক।

এদিকে কোম্পানি পাওনা আদায়ের জন্য আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে এবং তা চলমান বলে জানালেও নিরীক্ষক বলছে, বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড (বিএএস) অনুসারে, এ ধরনের পাওনা অর্থকে আর্থিক প্রতিবেদনে আলাদা নোটে সম্ভাব্য আয় হিসেবে দেখাতে হয়। অথচ কোম্পানিটি আইনি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেই দাবিকৃত অর্থকে তাদের চলতি সম্পদ হিসেবে দেখিয়েছে।

বর্তমানে কোম্পানিটির মোট চলতি সম্পদের পরিমাণ ১৭৪ কোটি ৫৫ লাখ ৮ হাজার ৩৯ টাকা। এ সম্পদের ৯০ শতাংশ বা ১৫৭ কোটি ২০ লাখ ৫৮ হাজার ৬৬১ টাকাই হচ্ছে এআইবিএলের কাছে কোম্পানির দেখানো পাওনা। নিরীক্ষকের মতে, কোম্পানির এ বিবাদমান পাওনাকে আলাদা নোটে সম্ভাব্য আয়ের বদলে চলতি সম্পদ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর মাধ্যমে কোম্পানির চলতি সম্পদ ও শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে।

নিরীক্ষকের মতে, ব্যাংকঋণের পরিমাণ নিয়ে কোম্পানি ও ব্যাংকের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। লিবরা ইনফিউশন্সের হিসাবে, এআইবিএলে তাদের ঋণের পরিমাণ ৮৩ কোটি ১২ লাখ ২৪ হাজার ৮৫৬ টাকা। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ৩০ কোটি ৫৮ লাখ ৮ হাজার ৯০, মেয়াদি ঋণ ২৭ কোটি ৭১ লাখ ৬১ হাজার ৬৩১ ও স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ২৪ কোটি ৮২ লাখ ৫৫ হাজার ১৩৫ টাকা। তবে এআইবিএলের হিসাবে লিবরার কাছে ঋণ বাবদ তাদের পাওনা ১০৫ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার ৮৩৯ টাকা।

এদিকে কোম্পানির পক্ষ থেকে নিরীক্ষকের কাছে ব্যাংকঋণ সংক্রান্ত রেকর্ড বই, ব্যাংক বিবরণী ও ব্যাংক বিবরণীর সমন্বয় হিসাব সরবরাহ না করায় ব্যাংকঋণের প্রকৃত তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে মুনাফায় থাকলেও ২০১৫-১৬ হিসাব বছর থেকেই এআইবিএলকে ঋণের বিপরীতে মুনাফার অংশ কিংবা অগ্রিম পরিশোধ করছে না লিবরা। এ বিষয়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে আর্থিক প্রতিবেদনের ২৮ নং নোটে ব্যাখ্যা দেয়া হলেও তা স্ববিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন নিরীক্ষক।

লিবরা ইনফিউশন্সের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৪-১৫ হিসাব বছরে কোম্পানিটি ব্যাংকঋণের বিপরীতে ৪ কোটি ৯৮ লাখ ৯৯ হাজার ৮৮ টাকা সুদ দিয়েছে। তবে ২০১৫-১৬ হিসাব বছর থেকেই তারা এআইবিএলের ঋণের সুদ বাবদ অর্থ দেয়া বন্ধ রেখেছে। সর্বশেষ ২০১৬-১৭ হিসাব বছরেও অন্যান্য ব্যাংকের ঋণের বিপরীতে ১ কোটি ৫৭ লাখ ২৬ হাজার ২৮৮ টাকা সুদ দিলেও এআইবিএলকে কোনো অর্থ দেয়নি।

নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, ২০১০ সালের পুনর্মূল্যায়িত মূল্যের ভিত্তিতে কোম্পানিটির সম্পদ, জমি ও সরঞ্জামাদির মূল্য ২৮১ কোটি ৬১ লাখ ৪১ হাজার ৭৭ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে বিদ্যমান বাজারমূল্যের সঙ্গে আর্থিক প্রতিবেদনে প্রদত্ত সম্পদের মূল্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করছেন নিরীক্ষক।

হিসাব মান অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ে সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন করেনি লিবরা ইনফিউশন্স। এছাড়া কোম্পানি আইন অনুসারে, আর্থিক প্রতিবেদনে স্থায়ী সম্পদের পুনর্মূল্যায়িত মূল্যকে ক্রয়মূল্য থেকে আলাদা হিসাবে উপস্থাপন করার নিয়ম থাকলেও কোম্পানি তা পরিপালনে ব্যর্থ হয়েছে।

নিরীক্ষকের মতে, শুরু থেকেই লিবরা ইনফিউশন্স তাদের ইউনিট-২-এর ১১৬ কোটি ৬৫ লাখ ৬ হাজার টাকা স্থায়ী সম্পদের ওপর হিসাব মান অনুসারে কোনো অবচয় ধার্য করেনি। পাশাপাশি বিলম্বিত কর বাবদ ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫২২ টাকা সঞ্চিতি রেখেছে লিবরা ইনফিউশন্স। কিন্তু কীভাবে এ সঞ্চিতি রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে নিরীক্ষকের কাছে কোনো হিসাব দেয়নি কোম্পানি। ফলে যথাযথভাবে বিলম্বিত কর সঞ্চিতি সংরক্ষণ করা হয়েছে কিনা, তা যাচাই করতে পারেনি নিরীক্ষক।

নিরীক্ষকের মতামত ও কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, মুনাফায় থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকঋণের বিপরীতে সুদারোপ না করা ও যথাযথভাবে বিলম্বিত কর দায় ধার্য না করার মাধ্যমে মুনাফা ও শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) অতিমূল্যায়িত করেছে কোম্পানিটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here