রূপালী ব্যাংকের মূলধন ও রিজার্ভ কমেছে

0
247
ছবি: সংগৃহিত

সিনিয়র রিপোর্টার : রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রূপালী ব্যাংকের মূলধন এবং রিজার্ভ ও সারপ্লাস হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। ‘মাদার টেক্সটাইল’ নামক এক প্রতিষ্ঠানকে দেয়া ব্যাংকের প্রায় এক হাজার ১৩৫ কোটি টাকা আটকে গেছে, যা রূপালী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের প্রায় তিনগুণ এবং মূলধন ও রিজার্ভ সারপ্লাস মিলিযে যা, তারচেয়ে বেশি।

ব্যাংকটির বর্তমান মূলধন এবং রিজার্ভ ও সারপ্লাস মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে আটকে থাকা ওই ঋণের অঙ্কের জামানত রয়েছে অর্ধেকেরও কম। তারপরও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঋণ পুনর্গঠন ও সুদ মওকুফ সুবিধা পেয়েছে মাদার গ্রুপ। ঝুঁকি এড়াতে ‘জিইয়ে রাখা’ ওই ঋণের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ গ্রাহক মাদার টেক্সটাইলের ঋণের পরিমাণ এক হাজার ১৩৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বারবার সুবিধা নিয়েও ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় গত পাঁচ বছরে ঋণের অঙ্ক প্রায় ৪৭৭ কোটি টাকা বা ৭২ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়েছে।

২০১২ সালের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির ঋণ প্রায় ৬৫৮ কোটি ১২ লাখ টাকা ছিল, যা ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে প্রায় এক হাজার ১৩৫ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। তারপরও ঋণটিকে ‘জিইয়ে রাখতে’ কোম্পানিটিকে ঋণ পুনঃতফসিল ও সুদ মওকুফ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ গ্রুপটির প্রায় ৬৩৪ কোটি টাকা পুনর্গঠন করে তা পরিশোধের জন্য ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে ২০২২ সাল পর্যন্ত ঋণের কিস্তি পরিশোধ ও সুদ গণনা মওকুফ করা হয়েছে।

ব্যাংকের দায়িত্বশীলরা বলছেন, বড় অঙ্কের কারণে ঋণ আদায় ও ঋণটি নিয়মিত রাখতেই গ্রুপটিকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তবে ‘জিইয়ে রাখা’ হলেও মাদার টেক্সাইলের ঋণ আদায় কঠিন হবে। ওই ঋণের বিপরীতে জামানত ঘাটতি আছে। ঋণ নেওয়ার সময় ওই সম্পদের তাৎক্ষণিক বিক্রয়মূল্য ৩০০ কোটি টাকারও কম ছিল। সেই সম্পদের মূল্য এখন ৯২০ কোটি টাকা বলা হচ্ছে। এখন ওই সম্পত্তি বিক্রি করে ঠিক কত টাকা আয় করা যাবে, সেটাও বলা কঠিন।

নতুন শর্ত অনুযায়ী, ২০১৭ সালের জানুয়ারির মধ্যেই জামানত ঘাটতি পূরণের জন্য কিস্তি হিসেবে ২৪০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এখনও কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। পাওনা চাইতে গেলে কানাডায় টাকা পাঠানো ও সেই টাকা আত্মসাতের পুরোনো গল্পই শোনানো হচ্ছে। আর ২০২৩ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ত্রৈমাসিক কিস্তিতে ঋণের অর্থ পরিশোধ করার কথা রয়েছে। কোম্পানির ব্যবসায়িক অবস্থা ভালো নয়, তাই মুনাফার অর্থে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব নয়।

রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান প্রধান বলেন, মাদার টেক্সটাইল আমাদের বড় গ্রাহক, তারা খেলাপি হয়নি। ওই ঋণ আদায়ের জন্য গ্রুপটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। আর গত পাঁচ বছরে ওই গ্রুপটিকে নতুন করে কোনো অর্থায়ন করা হয়নি। ঋণ পরিশোধ না করায় সুদ যোগ হয়ে টাকার অঙ্ক বেড়েছে।

এদিকে, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ ফেরত না দেওয়ার কারণ জানতে ঢাকার মতিঝিলে মাদার টেক্সটাইলের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয় ‘এমডি স্যার অসুস্থ, তিনি সিঙ্গাপুরে আছেন। তার অবর্তমানে ঋণের বিষয়ে কথা বলার মতো কেউ অফিসে নেই’ বলে রিসিপশন থেকে জানানো হয়েছে।

মাদার গ্রুপের কর্ণধার সুলতান আহমেদের সঙ্গে সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে অপর প্রান্ত থেকে কোম্পানিটির এক কর্মকর্তা ‘ঋণ বিষয়ে হিসাব বিভাগের সঙ্গে কথা বলা’র জন্য পরামর্শ দেন। সে অনুযায়ী মাদার টেক্সটাইলের হিসাব শাখার মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) সঙ্গে কথা বলার জন্য কয়েক দফায় যোগাযোগ করেও তাকে অফিসে পাওয়া যায়নি।

জানা যায়, মাদার গ্রুপের কর্ণধার সুলতান আহমেদ ১৯৯২ সালে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাশিমপুরের ছোট গোবিন্দবাড়ী এলাকায় প্রায় ৩৫ বিঘা জমির ওপর মাদার টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৪ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে সুতা উৎপাদন শুরু করে মাদার টেক্সটাইল। পরে আরও দুটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে মাদার টেক্সটাইল গ্রুপ গড়ে তোলা হয়।

এর মধ্যে মাদার টেক্সটাইলের নামে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে চার দফায় রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক থেকে তিনি ৭০০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়েছেন। ব্যাংকটির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের যোগসাজশে একক গ্রাহকের ঋণসীমা ভেঙে পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই মাদার টেক্সটাইলকে বিভিন্ন ধরনের ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে ওই ঋণ জালিয়াতি ফাঁস হওয়ার পর ২০১৪ সালের শেষদিকে ব্যাংকটির কয়েকজন কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্তও করা হয়েছিল। ঋণ জালিয়াতি ও কথিত অর্থ পাচারের ঘটনায় কয়েক বছর ধরে আলোচনায় মাদার টেক্সটাইল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here