রিজেন্ট টেক্সটাইলের শেয়ার কারসাজিতে চাচা-ভাতিজা

0
2206

আনোয়ার ইব্রাহীম : কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই। নেই মুনাফা বৃদ্ধির কোনো খবরও। তারপরও মাত্র সাত মাসে বস্ত্র খাতের রিজেন্ট টেক্সটাইলের শেয়ার দর ১১ টাকা থেকে তিনগুণেরও বেশি বেড়ে গত এপ্রিলে ৩৭ টাকায় উঠেছিল। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির এ ঘটনায় মূল হোতা নোয়াখালীর হাতিয়ার ব্যবসায়ী আহসানুল মাহমুদ ও নারায়ণগঞ্জের সুতা ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম। সম্পর্কে তারা চাচা-ভাতিজা।

শেয়ার কেনাবেচার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চাচা-ভাতিজা রিজেন্টের শেয়ারে প্রায় ৩০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কারসাজিমূলক লেনদেন করেছেন। এই চাচা ও ভাতিজা মিলে গত মার্চ থেকে নিজেদের মধ্যে ক্রমাগত শেয়ার কেনাবেচা (সার্কুলার ট্রেড) করে শেয়ারটির কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করেন। কেবল ইবিএল সিকিউরিটিজ নামক ব্রোকারেজ হাউসে বিও হিসাব খুলে রিজেন্ট টেক্সটাইলের ৭০০ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা করেছেন। এরমধ্যে ক্রয় ৩৫০ কোটি টাকার এবং বিক্রি ৩৩৯ কোটি টাকার।

এরমধ্যে ভাতিজা শফিকুল ইসলাম তার বিও হিসাবে ১৬২ কোটি টাকার শেয়ার কিনে বিক্রি করেছেন ১৫৭ কোটি টাকার। আর চাচা আহসানুল মাহমুদ ১৮৮ কোটি টাকা শেয়ার কিনে বিক্রি করেছেন ১৮২ কোটি টাকার। এখনও উভয়ের হিসাবে অন্তত ২০ কোটি টাকার শেয়ার রয়েছে। এই হিসাব কেবল চাচা-ভাতিজার। চাচি কামরুন নাহারের বিও হিসাবেও শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। শুধু ইবিএল নয়, ইউসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট, লংকাবাংলা সিকিউরিটিজসহ আরও কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউস থেকেও তারা রিজেন্টের শেয়ার কেনাবেচা করেছেন। এর পরিমাণও কয়েক শত কোটি টাকা হবে।

রিজেন্ট টেক্সের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটি এখনও প্রতিবেদন দেয়নি। জানতে চাইলে সংস্থাটির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান বলেন, ক্রমাগত একাধিক ব্যক্তির মধ্যে কোনো শেয়ার লেনদেন করে সংশ্লিষ্ট শেয়ারের দর নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাকে কারসাজিমূলক লেনদেন হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েই বিএসইসি তদন্ত কমিটি করেছে।

এদিকে জানা গেছে, চাচা-ভাতিজার কারসাজির ফায়দা তুলেছেন একাধিক শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তা ও তাদের একজনের পরিবার। এমন একজন নাজমুল হাসান চৌধুরী। বর্তমানে তিনি লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের ব্যবসায় উন্নয়ন বিভাগের সহকারী মহাব্যবস্থাপক। কিছুদিন আগেও ছিলেন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) মালিকানাধীন ব্রোকারেজ হাউস ইউসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টে। এ তালিকায় আছেন লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের এজিএম জোবায়ের মহসিন কবির। তিনি এর আগে ইউসিবিতে ছিলেন। এ ছাড়া বর্তমানে ইউসিবিতে কর্মরত রাজেশ সাহাও শেয়ার কিনে মুনাফা করেছেন।

কারসাজির হোতা চাচা-ভাতিজা হলেন ব্রোকারেজ হাউস কর্মকর্তা নাজমুল হাসান চৌধুরীর গ্রাহক। গ্রাহকের হিসাবে রিজেন্টের ব্যাপক শেয়ার কেনাবেচা দেখে নাজমুল এবং তার ভাই মো. শরীফ উদ্দিন চৌধুরী, তাদের মা নূরে হাওয়া, অপর তিন ভাই নুরুল আনোয়ার চৌধুরী, মেহেদী হাসান চৌধুরী ও কামরুল হাসান চৌধুরী এ কোম্পানিটির শেয়ার কেনাবেচা করেছেন। এরা শেয়ার কেনাবেচা করেছেন আইডিএলসি, ইবিএল ও আইআইডিএফসি নামক ব্রোকারেজ হাউসে।

শেয়ারবাজারের একটি সূত্র জানিয়েছে, পুরো এই গ্রুপটি গত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) রিজেন্ট টেক্সটাইলের যে শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে, কোনো কোনো দিন তার ৫০ থেকে ৯০ শতাংশই ছিল তাদের। শেয়ারটির ব্যাপক চাহিদা তৈরি করার জন্য বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রিও করেছেন চাচা-ভাতিজা।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর রিজেন্ট টেক্সটাইল স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ও লেনদেন শুরু হয়। আইপিওতে ২৫ টাকা দরে শেয়ার বিক্রি করেছিল কোম্পানিটি। লেনদেনে প্রথম দিনের পর চলতি বছরের ৫ এপ্রিলের আগ পর্যন্ত প্রায় দেড় বছরে কখনই এর বাজারদর ২৫ টাকায় ওঠেনি। তালিকাভুক্তির পর ক্রমাগত দর কমে গত বছরের অক্টোবরের শুরুতে সর্বনিম্ন ১১ টাকায় নামে।

গত বছরের ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১২ টাকায় কেনাবেচা হয়। এরপর ক্রমাগত বাড়তে থাকে শেয়ারটির দাম। গত মার্চের শেষে দর ওঠে ২১ টাকা। ২ এপ্রিল থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ১১ কার্যদিবসে বাজারদর ২১ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৩৭ টাকা হয়। গত তিন মাসে অবশ্য শেয়ারটির দর কিছুটা ওঠানামা করছে। সর্বশেষ গতকাল সোমবার শেয়ারটি কেনাবেচা হয় ২৭ টাকা ৭০ পয়সায়।

কারসাজিমূলক লেনদেনের বিষয়ে জানতে চাইলে আহসানুল মাহমুদ রিজেন্ট টেক্সটাইলের শেয়ার ব্যাপক লেনদেন করার কথা স্বীকার করেছেন। তবে এমন লেনদেন যে বেআইনি তা তিনি জানতেন না বলে দাবি করেন। যদিও গত প্রায় ২০ বছর ধরে শেয়ার ব্যবসায় আছেন বলে জানান তিনি। আহসানুল মাহমুদ বলেন, ভাতিজা শফিকুল ইসলামই বেশিরভাগ সময় তার শেয়ার কেনাবেচা করে।

জানতে চাইলে ভাতিজা শফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি নারায়ণগঞ্জে সুতার ব্যবসা করেন। পাশাপাশি গত ৭-৮ বছর শেয়ার ব্যবসাও করছেন। তিনি বলেন, দাম বাড়তে পারে এমনটা মনে করেই রিজেন্ট টেক্সটাইলের শেয়ার কেনেন তিনি। যদিও লাভের তুলনায় লোকসানই হয়েছে বেশি তার।

ক্রমাগত শেয়ার কেনাবেচার বিষয়ে জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম মন্তব্য করেন, এটা অপরাধ বলে তিনি মনে করেন না। শফিকুল বলেন, চাচা কখন কোন শেয়ার কেনেন বা বেচেন তা জানেন না। অবশ্য একই সঙ্গে চাচা-ভাতিজার বিও হিসাব খোলা ও নির্দিষ্ট কোম্পানির শেয়ারে সন্দেহজনক লেনদেনের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি।

ইবিএল সিকিউরিটিজের একটি সূত্র জানিয়েছে, এই ব্রোকারেজ হাউসে গত এপ্রিল মাসে খোলা বিও হিসাবে শফিকুল ইসলাম শুধু রিজেন্ট টেক্সটাইলের শেয়ার লেনদেন করেছেন। গত কিছুদিনে শেয়ারটির দর কমার কারণে বর্তমানে তার হিসাবে লোকসান প্রায় ৫ কোটি টাকা। জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম বলেন, এই লোকসান নিয়ে তিনি ভাবছেন না। কারণ ব্যবসায় লাভ-লোকসান থাকবেই।

এদিকে এই কারসাজির কেন্দ্রে থাকা ব্রোকারেজ হাউস কর্মকর্তা নাজমুল হাসান চৌধুরী জানান, ‘তিনি নিজের ইচ্ছায় রিজেন্ট টেক্সটাইলের শেয়ার কেনাবেচা করেছেন। তার মা ও ভাইয়েরা প্রত্যেকেই পূর্ণবয়স্ক। তারাও তাদের ইচ্ছাতেই শেয়ার কেনাবেচা করেছেন।’

কীভাবে প্রায় একই সময়ে তার পরিবারের ছয় সদস্য একই শেয়ার কিনেছেন এবং ক্রমাগত বিক্রি করেছেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বাজারে যখন কোনো শেয়ারের দর বাড়ে, তখন অনেকেই শেয়ার কেনেন। পরিবারের সদস্যরা হয়তো এভাবেই শেয়ার কেনাবেচা করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমি একবারই শেয়ার কিনেছি ও একদিনেই বিক্রি করেছি।’ গড়ে ২৪ টাকা দরে শেয়ার কিনে গড়ে ৩৩ টাকা দরে শেয়ার বিক্রি করে ৫৭ লাখ টাকা লাভ করেছেন বলেও স্বীকার করেন তিনি। পরিবারের অন্য সদস্যদের মুনাফার বিষয়টি জানেন না বলে এ প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন তিনি।

জানতে চাইলে লংকাবাংলার কর্মকর্তা জোবায়ের জানান, তিনি সরল মনেই রিজেন্টের শেয়ার কেনাবেচা করেছেন। কারসাজি করতে চাইলে বেনামে শেয়ার কিনতেন। তিনি জানান, একবার কিনে একবারই বিক্রি করেছেন তিনি। এতে ৮০ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছে তার।

ব্রোকারেজ হাউস কর্মকর্তা রাজেশ সাহা জানান, তিনি ২৮ টাকা দরে কিনে ৩২ টাকায় রিজেন্টের শেয়ার বিক্রি করেছেন। এতে কিছু লাভ হলেও পরে ৩৩ টাকা দরে শেয়ার কেনার পর কিছুটা লোকসান হয়েছে।

জানতে চাইলে ইবিএল সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছায়েদুর রহমান বলেন, কারসাজিমূলক লেনদেনের বিষয়টি নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে শফিকুল ইসলাম এবং আহসানুল মাহমুদের লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে। এদের অন্যত্র শেয়ার সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, এই দুই গ্রাহক কর্মকর্তাদের অজ্ঞাতে সন্দেহজনক লেনদেন করেছেন। আইন অনুযায়ী, গ্রাহক শেয়ার কিনতে বা বিক্রি করতে চাইলে ব্রোকারেজ হাউস তাতে বাধা দিতে পারে না। সূত্র : সমকাল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here