শিল্পের আরো বিকাশ করতে চাই: সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান

1
1480

দেশের বিদ্যুৎ খাতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সামিট গ্রুপ। এর বাইরে বন্দর, শিপিং, কার্গো হ্যান্ডলিং ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর মতো খাতগুলোয়ও বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে তারা। শিল্পের আরো বিকাশ করতে চান। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্পের বিকাশ, জবাবদিহিতা ইত্যাদি বিষয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন –আলতাফ মাসুদ ও মাহফুজ উল্লাহ বাবু।

শুরুতেই আমাদের জানাবেন, সামিট গ্রুপ কেন এবং কীভাবে বিদ্যুৎ খাতে এল?

অর্থনৈতিক উন্নতির জন্যই আমার ব্যবসায় আসা। দীর্ঘদিন ট্রেডিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। নব্বইয়ের দশকে আমার উপলব্ধি হলো, অর্থনৈতিক উন্নতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বিদ্যুৎ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমি দেখতাম, বিদ্যুতের অপ্রতুলতায় টানা দু-তিনদিন বন্দর অচল পড়ে থাকে। একেকটি জাহাজ সপ্তাহের পর সপ্তাহ বন্দরে আটকে থাকে। বিদ্যুৎ তখন আমাকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়।

ফিনল্যান্ডের ওয়ার্টসিলা করপোরেশনকে সঙ্গে নিয়ে আমরা খুলনায় দেশের প্রথম বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি করার চেষ্টা করলাম। ১৯৯৮ সালে সরকার আমাদের প্রচেষ্টা অনুমোদন করে। সেখান থেকেই শুরু। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতি ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে ব্যবসার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে জানলাম।

Summit Power Chairman
সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান

দেখলাম, বিদ্যুৎ আমাদের ব্যবসায়িক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় অগ্রগতিতেও ভূমিকা রাখতে সক্ষম। বিষয়টি সামিটকে বিদ্যুৎ খাতে আরো উৎসাহিত করেছে। বর্তমানে আমাদের ১৪টি প্লান্ট থেকে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যাচ্ছে, যা দেশের মোট উৎপাদনের ১৫ শতাংশের বেশি। জাতীয় গ্রিডে বেসরকারি খাত থেকে আমরাই সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করছি।

ইতিহাস বলে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধানতম অনুষঙ্গ বিদ্যুৎ। বাংলাদেশের ৩২ কোটি হাতকে শক্তিশালী করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিদ্যুৎ। শিল্পায়ন, সেবা খাতের বিকাশ কিংবা কৃষির আধুনিকায়ন যা-ই বলুন, বিদ্যুৎ ছাড়া কোনোটিই কল্পনা করা যায় না। আমরা বিদ্যুৎ খাতে থাকতে চাই।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রাথমিক জ্বালানি নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। আপনার ভাবনা কী?

প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে আমাদের সামনে তিনটি মূল রাস্তা খোলা আছে— তেল, গ্যাস ও কয়লা। এ তিন প্রকার জীবাশ্ম জ্বালানির বাইরে রয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুকল। প্রতিটিরই কিছু সুবিধা-অসুবিধা রয়েছে।

আর্থিক, সামাজিক ও পরিবেশগত বিবেচনায় জীবাশ্ম জ্বালানির মধ্যে সারা বিশ্বেই গ্রহণযোগ্যতার শীর্ষে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আমাদের মতো জনবহুল দেশে বিষয়টি আরো প্রযোজ্য। বাংলাদেশের উন্নয়নে নিজস্ব জ্বালানি হিসেবে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু আমরা যে উন্নয়নযজ্ঞ হাতে নিয়েছি, এর বিপরীতে গ্যাসের স্থানীয় মজুদ যথেষ্ট নয়। বিকল্প হিসেবে থাকছে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)।

একটি বিষয় মাঝে মাঝেই ভাবি, বাংলাদেশ সত্যিই ভাগ্যবান। দেখুন, এমন একটি সময়ে আমরা এলএনজি আমদানির দিকে ঝুঁকছি, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির ইউনিট প্রাইস ১০ থেকে আড়াই ডলারে নেমে এসেছে। এক দশকেরও কম সময়ের ব্যবধানে অপরিশোধিত তেল ও কয়লার দর অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। প্রায় একই হারে কমেছে শিপিংয়ের খরচও।

কয়লা বনাম গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। এ দুইয়ের তুলনা করতে আমাদের তিনটি দিক বিবেচনা করতে হবে— মূলধন, জমি ও পরিবেশ। আমাদের হিসাব, এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রতি মেগাওয়াট সক্ষমতার জন্য যে টাকা বিনিয়োগ করতে হয়, কয়লার ক্ষেত্রে তা প্রায় দ্বিগুণ; কোনোভাবেই দেড় গুণের কম হবে না।

কয়লাভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য যেখানে সব মিলিয়ে ৪০০ একর জমির প্রয়োজন হয়, সেখানে মাত্র ১২ একরেই গ্যাসভিত্তিক একটি প্লান্ট করে ফেলা যায়। কয়লাভিত্তিক প্লান্টের সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে অনেক উদ্বেগ রয়েছে। আমি মনে করি, মূলধন, জমি, পরিবেশ তিন বিবেচনায়ই এলএনজি অনেক এগিয়ে। তাই আমরা এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুতে গুরুত্ব দিচ্ছি। সরকার অনুমতি দিলে আমরা এলএনজি টার্মিনাল করতে চাই, যেখানে জাহাজে করে আনা তরল গ্যাস মজুদ করা হবে এবং তা আবার গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনে সরবরাহ করা হবে।

সময় এখন সত্যিই এলএনজির অনুকূলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের ব্যয়ও অনেক কমে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) আপনাদের অংশীদার। বিষয়টি ব্যবসায় কোনো বাড়তি সুবিধা যোগ করেছে কি?

বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিদেশী বিনিয়োগ একটি ইতিবাচক বাস্তবতা। আইএফসির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারিত্বে যাওয়ার আগে তাদের ব্যবসায়িক দক্ষতা, পণ্য ও সেবার মান, সর্বোপরি করপোরেট সুশাসনকে গুরুত্ব দেয়।

আপনারা জানেন, বাংলাদেশে প্রতি বছরই করপোরেট সুশাসন ও আর্থিক স্বচ্ছতার কারণে পুরস্কার পেয়ে আসছে সামিট। এর বাইরে দক্ষতা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মানের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকারের কাছ থেকে পুরস্কার পাচ্ছি আমরা। সর্বোত্তম প্রযুক্তি আর দক্ষতার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ বেশি। প্রতিষ্ঠানের প্লান্ট ও কর্মীদের পর্যবেক্ষণ করলে আপনারাও কনভিন্সড হবেন আশা করি।

সামিটে আইএফসি এখন পর্যন্ত সাড়ে ১৭ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। কোনো একক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিশ্বে আর কোথাও তাদের এত বড় বিনিয়োগ আছে বলে আমার জানা নেই। আইএফসির বিনিয়োগ একদিকে আমাদের দক্ষতা ও কমপ্লায়েন্সের জন্য উত্সাহিত করেছে, অন্যদিকে এসবের একটি স্বীকৃতি হিসেবেও কাজ করছে। এটি প্রতিষ্ঠানের শক্তি ও ইমেজ বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

সিঙ্গাপুরের পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের একটি পরিকল্পনা রয়েছে আপনাদের। সে অর্থ কীভাবে, কোথায় বিনিয়োগ করতে চান?

অত্যাবশ্যক অবকাঠামোর মধ্যে এখন পর্যন্ত আমরা বিদ্যুৎ, বন্দর ও ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ককে বেছে নিয়েছি। বিদ্যুতের কথা তো বললাম। দেশে আমরা এরই মধ্যে ৩০ হাজার কিলোমিটার ফাইবার অপটিক কেবল টেনেছি। আর ৩০ হাজার কিলোমিটার সম্পন্ন করা গেলে গোটা বাংলাদেশ একটা থ্রিজি ও ফোরজি নেটওয়ার্কের আওতায় চলে আসবে। বন্দর অবকাঠামো নিয়ে আমাদের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে।

ভৌগোলিক কারণে আমাদের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক পরিসরে পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে বড় পথটা হওয়ার কথা ছিল নদীকেন্দ্রিক। আমরা ঢাকার কাছে নৌ-টার্মিনাল করেছি। সমুদ্রপথে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে পণ্য আনা-নেয়ায় আমাদের অনেকটা পথ ঘুরতে হয়। এজন্য কলকাতা, পাটনার মতো স্থানগুলোয় নদীবন্দর করতে সেখানকার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছি আমরা।

এছাড়া আপনারা জানেন, হিমালয় থেকে আসা নদীগুলোর উজানে জলবিদ্যুতের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। ভাটির অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশও উজানের সেসব প্রকল্পে অংশ নিতে পারে। সেটি নিকট ভবিষ্যতেই হবে কিনা জানি না। তবে আমরা দেশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।

সংক্ষেপে বললে, আঞ্চলিক পরিসরে বিদ্যুৎ, পরিবহন বা ইন্টারনেট অবকাঠামোর অংশীদার হতে চাই আমরা। এর পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে সামিটকে একটি আঞ্চলিক কোম্পানি হিসেবে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। সেটি দক্ষতা, প্রযুক্তি, আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন সব দিক থেকেই। সিঙ্গাপুরকে এ কারণেই বেছে নেয়া।

আপনাদের এ সম্প্রসারণ থেকে বাংলাদেশ কতটা উপকৃত হবে?

আঞ্চলিক অবকাঠামো ও কানেক্টিভিটির গুরুত্ব সম্পর্কে বোধ করি নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি, সমৃদ্ধি প্রতিটির জন্যই চাই সামগ্রিক অবকাঠামোগত সক্ষমতা। উন্নয়নের ধাপে ধাপে আগামীর বাংলাদেশ অনেক কিছুই চাইবে। স্থানীয় ও আঞ্চলিক কোম্পানি হিসেবে সামিট সেখানে নিজেদের বিনিয়োগ ও ভূমিকা বাড়াতে চায়।

একটি বিষয় আপনারা খেয়াল করেছেন কিনা জানি না। বাংলাদেশে এখন ২০-২৫টি বেসরকারি কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্রই স্থানীয় প্রকৌশলীরা চালাচ্ছেন। আমাদের কর্মীদের টেকনিক্যাল এক্সপার্টিজ এখন বিশ্বসেরা কোম্পানিগুলোর সমতুল্য। তাদের অনেকেই উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন প্লান্টে কাজ করছেন। অনেকটা নীরবেই বাংলাদেশ এসব অর্জন করছে। এসবে বেসরকারি খাতের উদ্যোগ ও সম্প্রসারণ প্রচেষ্টার ভূমিকা অনেক।

আগামীর বাংলাদেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মতো সামাজিক খাতগুলোয় বড় ও মানসম্মত বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। ভৌত ও অবকাঠামোগত উন্নয়নগুলোর পর দেশের জনগণের জীবনমান উন্নয়নই বেশি গুরুত্ব পাবে। বিদেশীদের পাশাপাশি স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। সব মিলিয়ে আমি মনে করি, জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই আমাদের বেসরকারি খাতকে আরো শক্তিশালী হতে হবে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

একটা সময় ছিল যখন, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হতো রাজ্য তথা ভূমি দখলে। আধুনিক বিশ্বে এটি বাতিলপ্রায় একটি ধারণা। এখন দেশে দেশে চলছে অর্থনীতির লড়াই, মগজের যুদ্ধ। জ্বালানির জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো দেশ বা পক্ষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সে লড়াইয়ে একটি দেশকে দুর্বল করে দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইউক্রেন-রাশিয়া দ্বন্দ্বে এর উদাহরণ দেখেছি আমরা।

উত্স বহুমুখীকরণেই এর সমাধান। এখনকার বিশ্বে জ্বালানির অনেক বিকল্প উত্স দেশ রয়েছে। একটি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ আপনার জন্য অসুবিধার মনে হলে আপনি অন্য কোনোটি থেকে কিনতে পারেন। আমাদের সামনে বেশির ভাগ উত্সই খোলা।

দেশের বিশেষজ্ঞ কৌশলপ্রণেতারা জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছেন। আমার ব্যক্তিগত অভিমত, জ্বালানির উত্স হিসেবে কোনো দেশকেই আমাদের পোর্টফোলিওর ১০ শতাংশ অতিক্রম করতে দেয়া উচিত হবে না। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত দিক থেকেও বৈচিত্র্য থাকা দরকার। কোনো নির্দিষ্ট ধরনের জ্বালানি বা প্রযুক্তির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতাও জ্বালানি নিরাপত্তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

টেকনিক্যাল দিকগুলোয় আপনি স্থানীয় সক্ষমতার কথা বলছিলেন। আমরা জানি, দেশী-বিদেশী অংশীদারিত্বের অন্যতম সুফল প্রযুক্তি স্থানান্তর। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ কতটা পাচ্ছে?

বিদ্যুৎ খাত নিয়ে আগেই বলেছি। একসঙ্গে কাজ করলে মানুষ অন্যদের কাছ থেকে শেখে। আমি বিশ্বাস করি, বাঙালিরা আরো দ্রুত শেখে। এর ওপর এখন মুক্ত জ্ঞানের যুগ। অনলাইনে প্রত্যেক পেশার মানুষের বৈশ্বিক কমিউনিটি রয়েছে। সেখানে তারা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। বিজনেস সিক্রেটের দোহাই দিয়ে জ্ঞান এখন খুব বেশিদিন বন্দি করে রাখা যায় না। একদিন আমাদের এক প্রকৌশলী অনলাইনে দেখছিলেন, উরুগুয়ের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে একবার একটি টেকনিক্যাল সমস্যা হয়েছিল এবং সেখানে একভাবে সমস্যাটির সমাধান করা হয়। একটি আর্টিকেল পড়েই তিনি নিজের সমস্যাটির সমাধান করতে সক্ষম হন। এটি সম্ভব না হলে আমরা হয়তো উরুগুয়ের সেই প্রকৌশলীকেই খুঁজতাম।

বিদেশী অংশীদাররা আমাদের সঙ্গে খুশিমনে তাদের জ্ঞান ও স্কিল শেয়ার করবেন— আমি এটি আশাও করি না। আমাদেরই নিজ প্রয়োজনে এটি শিখে নিতে হয়। বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে আমরা নিচ্ছিও।

বাংলাদেশ প্রযুক্তিনির্ভর ইন্ডাস্ট্রিগুলোতেও ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে। বস্ত্র শিল্পের কথাই ধরুন। একসময় আমরা শুধু সেলাই করতাম। এখন ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ অনেক বেড়েছে। ফরওয়ার্ড লিংকেজে তুলনামূলক ধীরে হলেও আমরা কিন্তু এগোচ্ছি। আসলে সব দিক বিবেচনা করে আমাদের দেখতে হবে, শত শত কাজের মধ্যে কোনটি আমার জন্য মানানসই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাজারের আকার বা অন্যান্য কারণে আমাদের এখানে গাড়ি নির্মাণ হচ্ছে না।

তবে আমরা চেষ্টা করলে গাড়ির সিট বানিয়ে বিশ্বে নাম করতে পারি। আমাদের নিজস্ব চামড়া রয়েছে। এজন্য শুধু দরকার ভিশন অ্যান্ড এক্সিলেন্স। বিশ্বের সেরা কোম্পানিগুলো যখন বাংলাদেশ থেকে তাদের গাড়ির সিট কিনতে থাকবে, আমরা তখন আরো হাই-এন্ডে তাকাব। ধাপে ধাপেই এগোতে হবে।

এছাড়া সব ইন্ডাস্ট্রির জন্যই নানা সাপোর্টিং উপাদান থাকতে হয়। আমাদের অর্থনীতিতে সেসব উপাদানকে শক্তিশালী করতে হবে।

স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিষয়ে কিছু বলুন। সামিট গ্রুপের একাধিক কোম্পানি দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। আগে বন্দর অবকাঠামো খাতে আপনাদের দুটি কোম্পানি একীভূত হয়েছে। তবে সম্প্রতি গ্রুপের তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সামিট পাওয়ার লিমিটেডের সঙ্গে একীভূত করার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্টক এক্সচেঞ্জে কিছুদিন কোম্পানির শেয়ার লেনদেনও স্থগিত ছিল। প্রশ্ন ছিল একীভূতকরণের উদ্দেশ্য নিয়েও…।

একীভূতকরণের মূল উদ্দেশ্য হলো বৃহদায়তন কারবারের সুবিধা নিয়ে ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনা। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। দেখুন, নিজেদের সব বিদুৎকেন্দ্রের জন্য সামিট গ্রুপের হাতে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার স্পেয়ার পার্টস রয়েছে। পুরো বিষয়টি একটি কোম্পানির হাতে থাকা আর ভেঙে ভেঙে আট-দশটি কোম্পানির হাতে থাকার পার্থক্যটি আপনারা নিশ্চয়ই বোঝেন। ইকোনমি অব স্কেল ছাড়া আমাদের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। ব্যয় কমলে শেষ পর্যন্ত শেয়ারহোল্ডাররাই লাভবান হবেন।

আরেকটি উদাহরণ দিই। ধরুন, সামিট উত্তরাঞ্চল পাওয়ার কোম্পানির একজন প্রকৌশলী একটি কাজে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছেন। পূর্বাঞ্চল পাওয়ারে একটি টেকনিক্যাল সমস্যা হলো, যেখানে তাকেই দরকার। গ্রুপ থেকে তাকে অনুরোধ-অনুনয় করে সিস্টার কনসার্নের সমস্যা সমাধানে পাঠানো হয়তো অসম্ভব নয়। কিন্তু এটি তার অত্যাবশ্যক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। একই কোম্পানি ও ম্যানেজমেন্টের অধীন দুটো বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে এমন শত শত জটিলতার নিরসন হয়।

আমরা সম্মানিত আদালতকে এ বিষয়গুলো বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। শেয়ারহোল্ডাররাও একীভূতকরণ প্রস্তাবের খুঁটিনাটি বিচার-বিশ্লেষণ করে অনুমোদন করেছেন। আগে যে প্রক্রিয়ায় গ্রুপের একাধিক কোম্পানি একীভূত করা হয়েছিল, এক্ষেত্রেও তা-ই করা হয়েছে। প্রক্রিয়াগত কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি কিংবা ভুল বোঝাবুঝির ব্যাপার থাকতে পারে, তবে উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। সমস্যাটি কোথায়, তা বোঝার জন্য আমি নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আছি। সংগৃহিত: বণিক বার্তা

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here