রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বিক্রি কমেছে

1
462
ডেস্ক রিপোর্ট : গেল প্রান্তিকে জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের বিক্রি কমে গেছে। মূলত বেসরকারি বিদ্যুত্ প্লান্টে  জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই সরকারের পেট্রোপণ্য উত্পাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় কমেছে। এতে পরিচালন মুনাফার বদলে ব্যাংকে রক্ষিত স্থায়ী আমানতের সুদই এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের উত্স হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর প্রথম প্রান্তিকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এ চিত্র উঠে আসে।

জানা গেছে, চলতি বছর বেসরকারি খাতের সব বিদ্যুত্ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ করে দেয় সরকার। আগে এ খাতের দুই-একটি প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেয়া হলেও এবার বিদ্যুত্ উত্পাদনকারী সব প্রতিষ্ঠানকে ঢালাওভাবে এ সুযোগ দেয়া হয়। এর আগে এসব প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি তেল সরবরাহ করত সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো। এখন বিদ্যুত্ উত্পাদকরা সরাসরি জ্বালানি তেল আমদানি করায় সরকারি তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় কমে গেছে।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, চলতি হিসাব বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর (প্রথম) প্রান্তিকে জ্বালানি তেল বিক্রি থেকে যমুনা অয়েলের আয় ৪৩ শতাংশ কমেছে। আগের বছরের প্রথম প্রান্তিকে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য বিক্রি থেকে কোম্পানিটির আয় ছিল ৪৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, যা চলতি প্রথম প্রান্তিকে ২৮ কোটি ৪ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। অবশ্য প্রথম প্রান্তিকে স্থায়ী আমানত থেকে সুদ বাবদ আয় বেড়েছে।

চলতি প্রথম প্রান্তিকে যমুনা অয়েলের সুদ বাবদ আয় হয়েছে ৫৭ কোটি ৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। সর্বশেষ প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মুনাফা কমেছে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের। এ সময়ে কোম্পানির কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ৫৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭১ কোটি ১২ লাখ টাকা।

চলতি প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এ কোম্পানির ইপিএস হয়েছে ৫ টাকা ২৯ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬ টাকা ৪৪ পয়সা। মূলত পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য বিক্রি থেকে আয় কমে যাওয়ায় কোম্পানির মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

যমুনা অয়েলের মতো পদ্মা অয়েলের মুনাফাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। কোম্পানির মূল ব্যবসা থেকে আয় প্রায় নেই বললেই চলে। পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য বিক্রি কমে যাওয়ায় কোম্পানির আয় কমে গেছে। ২০১৪-১৫ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে পদ্মা অয়েল ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৫৭৫ মেট্রিক টন পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য বিক্রি করে, যা চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ৩ লাখ ৭২ হাজার ৫৩৭ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে। এর ফলে পণ্য বিক্রি থেকে প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির আয় আগের বছরের চেয়ে ২৮ শতাংশ কমে গেছে।

২০১৪-১৫ হিসাব বছরের পণ্য বিক্রি থেকে প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির আয় ছিল ৫০ কোটি ২৩ লাখ টাকা, যা চলতি প্রথম প্রান্তিকে ৩৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। পরিচালন ব্যয় বাদ দেয়ার পর কোম্পানির আয় দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অবশ্য স্থায়ী আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সময় সুদ বাবদ আয় বেড়েছে।

গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির সুদ বাবদ আয় ছিল ৩৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা চলতি প্রথম প্রান্তিকে ৪৮ কোটি ৮ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। চলতি প্রথম প্রান্তিকে ইপিএস দাঁড়িয়েছে ৪ টাকা ৩৬ পয়সায়, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪ টাকা ৭০ পয়সা।

এ প্রসঙ্গে পদ্ম অয়েলের মহাব্যবস্থাপক ও কোম্পানি সচিব মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বেসরকারি বিদ্যুত্ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় টার্নওভার কমে গেছে। এছাড়া গ্যাসক্ষেত্রে কম মার্জিনে তেল সরবরাহের নির্দেশনাও মুনাফায় কিছুটা প্রভাব ফেলেছে।

একই চিত্র মেঘনা পেট্রোলিয়ামের। পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য বিক্রি থেকে আয় কমে যাওয়ায় মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মুনাফা কমেছে। চলতি প্রথম প্রান্তিকে রাষ্ট্রায়ত্ত এ কোম্পানির কর-পরবর্তী মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ কোটি ৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এর ফলে শেয়ারপ্রতি আয় ৫ টাকা ৮৬ পয়সা থেকে কমে ৪ টাকা ৯১ পয়সায় নেমেছে। কোম্পানির আয়ের অধিকাংশই এসেছে স্থায়ী আমানতের প্রাপ্ত সুদ থেকে।

এদিকে বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মার খেয়ে প্রথম প্রান্তিকে লোকসানে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত আরেক কোম্পানি ইস্টার্ন লুব্রিক্যান্টস লিমিটেড। আগের বছরের একই সময়ে এ কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ৫২ পয়সা থাকলেও চলতি বছরের সমাপ্ত প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ২০ পয়সা। যদিও ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরে ৩ টাকা ৩৯ পয়সা ইপিএস দেখিয়ে ৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ। ২০১১ সালের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির আয় কমছে।

সরকারি জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বিদ্যুত্ সরবরাহ ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান ডেসকোর শেয়ারপ্রতি আয় কমেছে। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি তিতাস গ্যাসের আয় কাটছাঁট করেছে। মুনাফা কমে যাওয়া অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে রয়েছে এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেড, জিবিবি পাওয়ার লিমিটেড, বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোড লিমিটেড কোম্পানি ও শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড।

অবশ্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালন মুনাফা হারালেও বেসরকারি কিছু কোম্পানি তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। সর্বশেষ প্রান্তিকে বেসরকারি পাঁচ কোম্পানির মুনাফার পরিমাণ বেড়েছে। আর আগের বছর লোকসানে থাকলেও চলতি প্রথম প্রান্তিকে সরকারি পাওয়ার গ্রিড মুনাফায় ফিরেছে।

বিদ্যুত্ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভালো অবস্থানে রয়েছে সামিট গ্রুপ। শেয়ারবাজারে এ গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠান সামিট পূর্বাঞ্চল পাওয়ার, সামিট পাওয়ার ও খুলনা পাওয়ার কোম্পানির মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। এছাড়া সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি লিমিটেডের আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। বারাকা পাওয়ার, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশনের মুনাফাও বেড়েছে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here