রাজনীতির হাওয়া বইছে পুঁজিবাজারে

1
1515

রাহেল আহমেদ শানু : জাতীয় রাজনীতির অস্থিরতা ভর করেছে দেশের পুঁজিবাজারে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার আশঙ্কায় টানা দরপতন হচ্ছে। গত তিন বছরের মধ্যে রবিবার পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় দরপতন হয়েছে। সূচকের ব্যাপক দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।

সূচকে হঠাৎ ধস ভাবিয়ে তোলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও। এ জন্য রবিবার জরুরি বৈঠক ডাকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ। ডিবিএ সভাপতি মোস্তাক আহমেদ সাদেকের মতে, অতীতে বহু রাজনৈতিক ঘটনায় গুজব হলেও এবারের ঘটনা একটু বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে রবিবারদেশের প্রধান পুঁজিবাবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচক পড়েছে ১৩০ পয়েন্টেরও বেশি। এ নিয়ে গত ছয় কার্যদিবসে সূচক ৩২৭ পয়েন্ট কমে যায়। যা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) চার বছরে সবচেয়ে বড় দরপতন। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চিত্রও ছিল অনুরূপ। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সিএএসপিআই সূচক দুইটা-চার মিনিটে প্রায় ৩৮০ পয়েন্ট কমে হয় ১৮ হাজার ২৪৩ পয়েন্ট।

এ দিকে রবিবার দুই পুঁজিবাজারে ৮০ শতাংশের বেশি কোম্পানি দরপতনের শিকার হয়। ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে দরপতন ঘটে ৯০ শতাংশ কোম্পানির। আবার শতভাগ কোম্পানি দর হারায় সিমেন্ট, সিরামিকস, কাগজ, টেলিকমিউনিকেশন, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবা খাতের। বাকি খাতগুলোর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি ছাড়া অন্যগুলো দর হারায়।

ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া ৩৩৩টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩৫টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ২৬৮টি, যা লেনদেন হওয়া মোট সিকিউরিটিজের ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ। ৩০টির দর ছিল অপরিবর্তিত। অপর দিকে চট্টগ্রামে লেনদেন হওয়া ২২০টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ২৫টির দাম বাড়ে, ১৭৯টির কমে এবং ১৬টির দাম অপরিবর্তিত থাকে।

এমন পরিস্থিতিতে ডিএসই বোর্ড রুমে ‘পুঁজিবাজারে বর্তমান পরিস্থিতি’ নিয়ে আয়োজিত জরুরি সভা শেষে ডিবিএ সভাপতি মোস্তাক আহমেদ সাদেক বলেন, বৈঠকে শীর্ষ ৩০ ব্রোকারেজ প্রতিনিধির বক্তব্য শুনেছি। তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে বলা যায়, পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিছক গুজবের কারণে হয়েছে।

পাশাপাশি বাজার খারাপ হলে প্রাতিষ্ঠানিক বড় বিনিয়োগকারীদের থেকে যে সাপোর্ট আমরা পেতাম, সেটা এবার পর্যাপ্ত নয়। তিনি আরো বলেন, বাজারে সাপোর্ট দিতে আমরা আইসিবিকে বরাবরই শক্তিশালী অবস্থান নিতে দেখেছি। তবে খোদ আইসিবিকেই যদি দুর্বল করে রাখা হয়; তাতে সাপোর্ট লেবেলও দুর্বল হয়ে যাবে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে বাজার ভালো হবে বলে মনে করেন তিনি।

এ সময় বিএমবিএ সভাপতি মুহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ নিয়ে যে সব সমস্যা তৈরি হচ্ছে, সেগুলো সমাধান করতে হবে। বিশেষ করে এক্সপোজারের সমস্যা। আমরা শীর্ষ ব্রোকারেজ প্রতিনিধিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে বেশ কিছু প্রস্তাব নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকে দিতে চাই। এসব বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘমেয়াদ পুঁজিবাজার ভালো থাকবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসইর একজন সাবেক পরিচালক বলেন, হঠাৎ করেই রাজনীতির ময়দান যেন উত্তপ্ত হতে চলেছে। আর খুবই সংবেদনশীল হওয়ায় প্রথমেই এর প্রভাব পড়েছে দেশের পুঁজিবাজারে। বিনিয়োগকারীরা নিকট ভবিষ্যতের বাজার আচরণ নিয়ে যে শঙ্কিত দিনের বাজার আচরণ তারই প্রতিফলন। তবে তিনি মনে করেন, বাজারের এ অস্বাভাবিকতা সাময়িক। বড় কোনো অঘটন না ঘটলেও দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে ওঠবে পুঁজিবাজার।

একাধিক বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকরা বলেন, ব্যাংক ও পুঁজিবাজার নিয়ে বিএনপি নেতা খালেদা জিয়ার বক্তব্য ও দুর্নীতি মামলার রায়কে কেন্দ্র করে রাজনীতির মাঠে তৈরি হওয়া টানাপড়েনের প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। গত শনিবার বিএনপির নির্বাহী কমিটির সভায় খালেদা জিয়ার বক্তব্যের পর গতকাল পুঁজিবাজার সাড়ে ৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন সূচকে নেমে আসে। এছাড়া মুদ্রানীতিতে এডিরেশিও কমানোর সিদ্ধান্তকেও দায়ী করছেন তারা।

গত শনিবার বিএনপির নির্বাহী কমিটির সভায় খালেদা জিয়া বলেন, সরকারের দুর্নীতির সীমা এতটাই মাত্রা ছাড়িয়েছে যে, দেশের মানুষ আর ব্যাংকে টাকা রাখার সাহস পাচ্ছে না। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে ধস নেমেছে। সাধারণ জনগণ নিজেদের সর্বস্ব পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে রাস্তায় নেমেছে। আর পুঁজিবাজারের টাকা লুটপাট করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তা সুইস ব্যাংকে পাচার করছে।

খালেদা জিয়ার এমন বক্তব্যে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি বলেন, আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা মনস্তাত্বিক প্রভাব পড়েছে। এরপর বিএনপি নেতার এমন বক্তব্যে বিনিয়োগকারীরা আরো আতঙ্কিত হয়েছেন। তিনি বলেন, এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির প্রভাব তো রয়েছেই।

এদিকে ডিএসইর ডাকা বৈঠক শেষে বিএমবি প্রেসিডেন্ট নাছির উদ্দিন চৌধুরী এবং ডিবিএ প্রেসিডেন্ট মোস্তাক আহমেদ সাদেক সাংবাদিকদের জানান, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্ষমতার অভাবে পুঁজিবাজারে দরপতন হচ্ছে। এ সময় তারা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সীমা গণনার ক্ষেত্রে শেয়ারের দাম বাজার দরের পরিবর্তে কস্ট প্রাইসে কেনার দাম বিবেচনা করার আহ্বান জানান।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here