রহস্য নিয়ে আসছে বিতর্কিত কোম্পানি ফার কেমিক্যালের আইপিও

4
1227
বিশেষ প্রতিনিধি : সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন ও জালিয়াতির অভিযোগে ফার ক্যামক্যালস লিমিটেডের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। দায়ের করা মামলাটি এখনো বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। মামলার আসামি ও উদ্যোক্তাদের পরিচালিত ফ্যামিলিটেক্স কোম্পানিকে গত বছরের ২২ জানুয়ারি আইপিওর অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসিইসি)।
এরপরেই আরএন স্পিনিংয়ের রাইট শেয়ার কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতি দায়ে আদালত পর্যন্ত মামলা গড়ায়। আরএন স্পিনিংয়ের রাইট শেয়ার কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত আবদুল কাদের ফারুক ফার ক্যামক্যালস লিমিটেডের একজন অন্যতম উদ্যোক্তা। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির আইপিও নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা রহস্য।
বিএসইসিতে আইপিও’র পাইপলাইনে থাকা অন্য কোম্পানিগুলোকে টপকে মাত্র ৬ মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের অনুমোদন পায়। ফার কেমিকেলের আইপিও নিয়ে দৈনিক স্টক বাংলাদেশ- এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নানা তথ্য। যা পাঠকদেরেউদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো-
অনুসন্ধানে জানা গেছে,  রাইট শেয়ার কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতির দায়ে আরএন স্পিনিং মিলস লিমিটেডের উদ্যোক্তা-পরিচালকদের বিরুদ্ধে মামলা করে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। মামলার আসামি ওই উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি ফার কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। আইপিও আবেদনের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে বিতর্কিত উদ্যোক্তাদের পরিচালিত এ কোম্পানি অর্থ সংগ্রহের অনুমোদন পায়।
বিএসইসি জানায়, ২০১৩ সালের ২২ জানুয়ারি মামলার আসামি এসব উদ্যোক্তা-পরিচালকের প্রতিষ্ঠিত ফ্যামিলিটেক্স (বিডি) লিমিটেড নামে আরো একটি কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আইপিওর শর্ত ভঙ্গের কারণে কোম্পানিটিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করে স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে শর্ত ভঙ্গের কারণে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ অবস্থায় বিভিন্ন কেলেঙ্কারির দায়ে অভিযুক্ত উদ্যোক্তাদের পরিচালিত আরো একটি কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এছাড়া এমন আরো একটি কোম্পানির আইপিও আবেদন কমিশনে জমা রয়েছে।
ফার কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ ২০১৩ সালের ৯ জুলাই শেয়ারবাজারে অর্থ সংগ্রহের জন্য প্রসপেক্টাস জমা দেয়। এ কোম্পানির আইপিও সম্পর্কে মতামত দেয়ার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ এখনো পর্যালোচনা করতে পারেনি। অথচ প্রসপেক্টাস দাখিলের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে এ কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিল কমিশন। যদিও তিন বছর আগে আবেদন করেছে, এমন প্রতিষ্ঠান এখনো আইপিও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
আরএন স্পিনিংয়ের রাইট শেয়ার কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত আবদুল কাদের ফারুক এ কোম্পানির একজন অন্যতম উদ্যোক্তা। ফার কেমিক্যালে এ উদ্যোক্তার ২৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। শুরুতে এ কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকলেও পরবর্তী সময়ে ‘আরএন স্পিনিং’ ইস্যুর কারণে পদ থেকে সরে দাঁড়ান তিনি।
একইভাবে শুরুতে পরিচালক থাকলেও আরএন স্পিনিংয়ের মামলার আসামি আবিদ মোস্তাফিজুর রহমানকেও প্রসপেক্টাসে শেয়ারহোল্ডার হিসেবে দেখানো হয়েছে। এছাড়া প্রসপেক্টাসে কিম জং সুককে ফার কেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; যিনি একই মামলার অন্যতম আসামি। এ কোম্পানিতে তার শেয়ার রয়েছে ২৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এছাড়া একই কেলেঙ্কারির ঘটনায় জরিমানা হয় আরএন স্পিনিংয়ের পরিচালক শিরিন ফারুকের। তিনিও ফার কেমিক্যালের পরিচালক।
প্রসঙ্গত, রাইট শেয়ার ইস্যু-সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের কারণে আরএন স্পিনিং মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলহাজ আবদুল কাদের ফারুককে অপসারণ করে বিএসইসি। পরবর্তী সময়ে ব্যাংক হিসাবে কোম্পানির রাইট শেয়ারের ২৭৮ কোটি টাকার জাল কাগজপত্র দাখিলের অভিযোগে আরএন স্পিনিংয়ের চেয়ারম্যান, পরিচালকসহ মোট সাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কমিশনের একজন কর্মকর্তা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।
মামলার আসামিরা হলেন— আরএন স্পিনিংয়ের চেয়ারম্যান আলহাজ মোস্তাফিজুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলহাজ আবদুল কাদের ফারুক, পরিচালক আবদুল কাউয়ুম মামুন, শিরিন ফারুক, আবিদ মোস্তাফিজুর রহমান, কিম জং সুক ও কোম্পানি সচিব হুমায়ুন কবির। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন।
সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন ও জালিয়াতির অভিযোগে দায়ের করা মামলাটি বিচারাধীন অবস্থায়ই মামলার আসামিদের পরিচালিত অন্য একটি কোম্পানি ফ্যামিলিটেক্সকে গত বছরের ২২ জানুয়ারি আইপিওর অনুমোদন দেয় কমিশন। তবে লেনদেন শুরুর আগে লভ্যাংশ বিষয়ে আইপিওতে দেয়া শর্ত ভঙ্গের দায়ে তালিকাভুক্তির দেড় মাসের মধ্যে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে আনা হয়। এ কোম্পানির আইপিও অনুমোদনের এক বছর পর একই উদ্যোক্তা দ্বারা পরিচালিত ফার কেমিক্যালকে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের অনুমোদন দিল বিএসইসি।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিতর্কিত এসব উদ্যোক্তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, এমন মোট পাঁচটি কোম্পানির আইপিও আবেদন কমিশনে জমা দেয়া হয়। এর মধ্যে গতকাল অনুমোদন পাওয়া কোম্পানিসহ মোট তিনটি কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির অনুমোদন পেয়েছে। আর এমএল ডায়িং নামে অন্য একটি কোম্পানির আইপিও আবেদন ফেরত নিতে বাধ্য হয় উদ্যোক্তারা। আর্থিক প্রতিবেদনে এসব কোম্পানির মৌলভিত্তি ভালো দেখানো হলেও প্রতিটি কোম্পানিই অভিহিত মূল্যে শেয়ার ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছে। যদিও বর্তমানে আরএন স্পিনিং ও ফ্যামিলিটেক্স ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছে। এর আগে ঊর্ধ্বমুখী বাজারে উদ্যোক্তা অংশের শেয়ার বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নেন আরএন স্পিনিংয়ের উদ্যোক্তা-পরিচালকরা।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য এসব কোম্পানির প্রসপেক্টাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, আরএন স্পিনিং মিলস, ফ্যামিলিটেক্স, হেম্পল রি ও ফার কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের কারখানার জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হয়েছে বিদেশী ব্যক্তির নামে শেয়ার ইস্যু করে। ফার কেমিক্যালের মূলধনি যন্ত্রপাতি সংগ্রহের জন্য ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের ৩০ লাখ ৬৯ হাজার ৭৭১টি শেয়ার কিম জং সুকের নামে ইস্যু করা হয়। ফার কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানিটি অভিহিত মূল্যে ১ কোটি ২০ লাখ শেয়ার ছেড়ে ১২ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে।
এর আগ আরএন স্পিনিংয়ের মূলধনি যন্ত্রপাতির জন্য কিম জং সুকের নামে ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যের ২৩ লাখ ২১ হাজার ৫০০ শেয়ার ইস্যু করা হয়। এ দুটি প্রতিষ্ঠানেই কিম জং সুক পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন। একইভাবে বিদেশী ব্যক্তির নামে শেয়ার ইস্যু করে ফ্যামিলিটেক্স ও হেম্পল রি কোম্পানির মূলধনি যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে সমপরিমাণ অর্থের মূলধনি যন্ত্রপাতি এসেছে কিনা, তার সঠিক হিসাব প্রসপেক্টাসে দেয়া হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করেছেন একই প্রতিষ্ঠান।
ফার কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের ১ কোটি ২০ লাখ শেয়ার ছেড়ে ১২ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। আইপিওর অর্থ দিয়ে কোম্পানিটি মূলধনি যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং উত্পাদন সক্ষমতা বাড়ানোর খাতে ব্যয় করবে। ২০১৩ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এ কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৫ টাকা ১ পয়সা ও শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য ১৫ টাকা ৫৫ পয়সা। কোম্পানিটির ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটিজ সার্ভিসেস লিমিটেড।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here