যুক্তরাষ্ট্রে আর্থিক সংকটে বৈশ্বিক অর্থনৈতিকে অধোগতি

0
837
বিশ্ব অর্থনীতির শ্রমব্যথা
কৌশিক বসু

২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হওয়া আর্থিক সংকটের ফলে সৃষ্ট চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অধোগতি স্থায়িত্বের নতুন এক রেকর্ড গড়েছে। যা নিশ্চিত তা হলো, জাপানে বিরাজিত প্রবৃদ্ধি স্থবিরতা, চীনা প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, রাশিয়ার অর্থনীতিতে বিদ্যমান গভীর সংকট এবং ইউরো অঞ্চলের অর্থনীতির খুব কমই পুনরুদ্ধার সত্ত্বেও বিশ্ব অর্থনীতি এখনো অনেকটা বিপন্মুক্ত ও নিরাপদ।

এই ‘প্রলম্বিত মন্দা’সহ বিশ্বের কিছু দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতির এক গভীর রূপান্তরেরই বহিঃপ্রকাশ; যে রূপান্তর দুই ধরনের উদ্ভাবনে চালিত: শ্রম-সাশ্রয় (লেবার-সেভিং) এবং শ্রম-সংযোগ (লেবার-লিংকিং)।

শ্রম-সাশ্রয়ী উদ্ভাবন যদিও আমাদের অনেক আগে থেকেই আছে, সম্প্রতি তা নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ফি বছর ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে শিল্প রোবটের বৈশ্বিক বিক্রি ২০১৪ সালে ২ লাখ ২৫ হাজারে পৌঁছেছে। তবে অধিকতর রূপান্তরমূলক হলো, শ্রম-সংযোগী প্রযুক্তি। গত তিন দশকের এমন ধরনের ডিজিটাল উদ্ভাবনে এখন মানুষ কোনো ধরনের অভিবাসন ছাড়াই বিভিন্ন দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও মালিকদের জন্য কাজ করতে সমর্থ।

এসব পরিবর্তন উচ্চ ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যানিক প্রবণতা অধিকার করে আছে। এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, জিডিপির শতাংশ হিসাবে মোট শ্রম আয় ক্রমেই কমছে এবং এ হার এখন কমই দৃশ্যমান। ১৯৭৫ থেকে ২০১৫ সাল নাগাদ শ্রম আয় যুক্তরাষ্ট্রে মোট জিডিপির ৬১ থেকে ৫৫, অস্ট্রেলিয়ায় ৬৬ থেকে ৫৪, কানাডায় ৬১ থেকে ৫৫, জাপানে ৭৭ থেকে ৬০ এবং তুরস্কে ৪৩ থেকে ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

মধ্যমেয়াদে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোয় শ্রম-সাশ্রয়ী উদ্ভাবন মেটানো হয় শ্রম-সংযোগী প্রযুক্তি দ্বারা। সস্তা শ্রমের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো, যারা নিজেরাই মৌলিক অবকাঠামো ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমর্থ, তারা এই বৈশ্বিক কাঠামোগত পরিবর্তন থেকে বিপুলভাবে উপকৃত হতে পারে।

এটি আমরা সংখ্যায় দেখি। ১৯৯০ সালের দিকে ৫০০ সৌভাগ্যবান করপোরেশনের কেবল ৫ শতাংশ ছিল উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর অধিকারে; এখন তা ২৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

চীনা করপোরেশনগুলো লক্ষণীয় মাত্রায় ওই তালিকায় রয়েছে। ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতটি উন্মোচিত হয়েছে নব্বইয়ের দশক থেকে। বলা যায়, তখন থেকেই খাতটি দেশটির পুরো অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। ৩৫টি দেশে ব্যবসা প্রসারকারী ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত মালয়েশিয়ার পেট্রোনাসকে এখন বলা হয় বিশ্বের অন্যতম নতুন ‘সেভেন সিস্টারস’ এনার্জি কোম্পানি, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।

সত্যি বলতে কি, কিছু উদীয়মান অর্থনীতির দেশ দুর্নীতিতে ব্যাপকভাবে জর্জরিত। উপরন্তু, সেখানে পণ্যদামও পড়তির দিকে। এর প্রধান উদাহরণ ব্রাজিল, যেখানে ২০১৫ সালে জিডিপি প্রায় ২ শতাংশ কমবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। তথাপি উদীয়মান অর্থনীতির কিছু দেশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভালোও করছে। উদীয়মান অর্থনীতির বার্ষিক উচ্চপ্রবৃদ্ধির রেকর্ডধারী একক দেশগুলো হলো— ভিয়েতনাম (৬ দশমিক ৫ শতাংশ), ভারত, চীন, বাংলাদেশ ও রুয়ান্ডা (প্রায় ৭ শতাংশ) এবং ইথিওপিয়া (৯ শতাংশের ওপর)।

উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের এখন মানিয়ে নিতে সমর্থ হওয়ায় ২০১৬ সাল ও তত্পরবর্তী সময়ে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা হলো, অসম নৈপুণ্য। এমনকি এটা যখন ঘটছে, তখন উচ্চ ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর শ্রমিকরাও ধীরে ধীরে বিভিন্ন চাপের মুখে পড়বে। কারণ নতুন বাস্তবতায় বিশ্বায়িত শ্রমবাজারের সঙ্গে তাদেরও সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে হয়।

ফলে তাদের আয়বৈষম্য বাড়বে এবং এর সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে। এর প্রতিক্রিয়ায় কিছু ক্ষেত্রে আউটসোর্সিং বন্ধ করা দেয়া হবে বড় ভুল। কেননা তখন উচ্চতর উত্পাদন ব্যয় ওসব দেশকে বৈশ্বিক বাজারের প্রতিযোগিতার বাইরে নিয়ে যাবে।

প্রযুক্তির যাত্রা অব্যাহত থাকলে এসব চাপ শেষ পর্যন্ত পুরো বিশ্বে বিস্তার ঘটবে। ফলে অসহনীয় উচ্চমাত্রায় শ্রমিকদের আয় হ্রাসের মাধ্যমে বৈশ্বিক অসমতা বৃদ্ধি পাবে, যা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। এমন হলে সার্বিক আয়-প্রবৃদ্ধি কেবল উপকরণ (যন্ত্রপাতি) ও মালিকানার অধিকারীদের কাছে যাতে পর্যবসিত না হয়, তা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের।

উনিশ শতকের প্রথম দিকে শিল্প বিপ্লবের সময়ে যুক্তরাজ্য যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল, এ চ্যালেঞ্জ অনেকটা তার সঙ্গে তুলনীয়। তখন শিশুশ্রমের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল এবং একে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হতো। শ্রমিকদের দৈনিক ১৪ ঘণ্টা বা ততোধিক সময় কাজ করতে হতো। রক্ষণশীলরা যুক্তি দেখাত, অব্যাহত শ্রমই চরিত্র গঠনে সাহায্য করে (বলার অপেক্ষা রাখে না, অন্য মানুষের; তাদের নয়)।

প্রগতিশীল গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা, বুদ্ধিজীবীদের লেখা এবং গৃহীত ব্যাপক প্রচেষ্টায় কারখানা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য এসব ঘৃণ্য চর্চা বন্ধ করে। ফলে দেশটি রক্ষা পায় আশু বিপর্যয় থেকে এবং পরিণত হয় প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের এক শক্তিকেন্দ্রে।

মহাফেজখানায় সংরক্ষিত রেকর্ড থেকে কেমন নাটকীয়ভাবে আমাদের ভাবনা-চিন্তা পরিবর্তন হয়েছে, তা আমরা দেখতে পারি। ১৭৪১ সালে জন ওয়াইট নতুন স্পিনিং মেশিন উন্নয়নের মাধ্যমে মালিকদের দেখিয়েছেন, তার আবিষ্কার ১০ জন দুর্বল মানুষ বা শিশুর পরিবর্তে ৩০ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষ কীভাবে প্রতিস্থাপনে সমর্থ। এ মেশিনের পেটেন্ট অনুমোদনকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেছিলেন, স্পিনিং মেশিন, এমনকি পাঁচ বা ছয় বছরের শিশুও চালাতে পারে।

আরেকটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও নীতি সংস্কারের সময় এসেছে। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বেইনসাফের (ইনজাস্টিস) বিষয় হলো, জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বিশাল মানবিক অসমতা; শুরু থেকে অপুষ্টি মোকাবেলা করতে না পারায় নিঃস্ব গৃহস্থের ঘরে জন্ম নেয়া শিশুরা যার মুখোমুখি হচ্ছে। আবার এর বিপরীত চিত্র হলো, আজ মাত্র কিয়দংশ মানুষ বিশ্বের বিপুল সঞ্চিত সম্পদ ও আয়ের উত্তরাধিকারী। শ্রম আয় বা মজুরি ক্রমে হ্রাস পাওয়ায় এ অসমতা আরো বাড়বে এবং তা দেশে দেশে তৈরি করবে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট।

এ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের বিস্তার রোধে সর্বোপরি প্রয়োজন শিক্ষা বিস্তারের বৃহত্তর প্রচেষ্টা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। এসব লক্ষ্যার্জনে অবশ্যই দরকার হবে অভিনব চিন্তার। উপরন্তু, শ্রম আয় বাড়ানোর নতুন ও বিকল্প উপায়গুলো নিয়ে আমাদের আরো ভাবা জরুরি।

এসব উপায়ের একটি উদাহরণ হতে পারে নির্দিষ্ট ধরনের মুনাফা ভাগাভাগি। যদি কর্মরত কোম্পানিতে নিজেদের মালিকানা থাকে, তবে নতুন প্রাযুক্তিক উদ্ভাবন শ্রমিকদের উদ্বেগের উত্স হবে না। কেননা সেক্ষেত্রে মজুরির কম প্রাপ্তি বা মজুরি হারানো মূলধন আয় (ইকুইটি ইনকাম) বৃদ্ধির মাধ্যমে পোষানো যাবে।

মার্টিন ওয়েটজম্যান, রিচার্ড ফ্রিম্যান ও রবার্ট হকেটের মতো কয়েকজন অর্থনীতিবিদ ও আইনজ্ঞ এ বিষয়ে লিখেছেন। কিন্তু একে সঠিক ধারায় নিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন নব উদ্ভাবনসহ প্রচুর গবেষণা। ২০১৫ সালে আমরা যা শিখেছি তা হলো, আমাদের আসলে বিলাস করার কিছুই নেই।

  • কৌশিক বসু, বিশ্বব্যাংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ
  • লাইভমিন্ট থেকে ভাষান্তর হুমায়ুন কবির

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here