‘মুনাফা ও ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির অগ্রগতি হয়েছে’

0
491

ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে মো. আরফান আলী, ২০১৬ সালের আগস্ট থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে কাজ করছেন এজেন্ট ব্যাংকিং নিয়ে। ব্যাংক এশিয়ার এ উদ্যোগসহ ব্যাংকিং খাতের গতিপ্রকৃতি নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন –হাছান আদনান

  • ব্যাংক এশিয়া কেমন চলছে?

এক কথায় যদি বলি, তাহলে ভালো চলছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আমরা বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছি। এ সময়ে আমাদের মুনাফা ও ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি থেকে শুরু করে সবকিছুতেই উল্লেখ করার মতো অগ্রগতি হয়েছে। এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে চলতি বছর ব্যাংক এশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো বছর হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। ব্যাংকের মুনাফায় বড় ধরনের উল্লম্ফন হবে।

  • তার মানে ব্যাংক এশিয়া অতীতের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠেছে?

এটি ঠিক, গত কয়েক বছর ব্যাংক এশিয়ার মুনাফা প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ ছিল। এ সময়ে আমরা ব্যাংকের ব্যালান্সশিটকে শক্তিশালী করায় বেশি মনোযোগী ছিলাম। ব্যাংকের প্রভিশনিংয়ে আমরা কোনো ছাড় দিইনি। এখন আমরা মনে করছি, ব্যাংক এশিয়া যথেষ্ট শক্তিশালী একটি ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা ও মুনাফায় প্রবৃদ্ধি এখন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।

  • ব্যাংক এশিয়া অভিজাত শ্রেণীর ব্যাংক হিসেবে নিজেকে দাঁড় করাতে চেয়েছে।কিন্তু এখন এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিপরীত স্রোতে হাঁটছে বলেই মনে হচ্ছে

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আমি ব্যাংক এশিয়ায় আছি। অভিজাতের ব্যাংক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার কথাটির সত্যতাও রয়েছে। শুরুতে ব্যাংক এশিয়ার যে অবয়ব ছিল, তা থেকে কেউ কেউ মনে করেছে, আমরা ক্লাস ব্যাংকিং করছি। সত্যিকার অর্থেই ব্যাংক এশিয়া কিছু সিলেক্টেড গ্রাহক নিয়ে কাজ করেছে। কিন্তু আমাদের মিশন ও ভিশন স্টেটমেন্টে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করার প্রতিশ্রুতি ছিল।

এতদিন পরে এসে প্রযুক্তি এবং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসায়িক মডেল কিছুটা পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাংক এশিয়া সাধারণ জনগণের ব্যাংক হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। আমাদের ব্যাংকিং মডেলের এ পরিবর্তন দৃশ্যমান। খুব অ্যাক্টিভলি আমরা এটিকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজ করছি।

ব্যাংকগুলোকে ভবিষ্যতে বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে টিকে থাকতে হবে। যে ব্যাংকের ‘বটম অব দ্য পিরামিড’ দৃঢ় হবে, সে ব্যাংক শক্তিশালী হবে। যে ব্যাংকের হিসাব ও গ্রাহক সংখ্যা যত বাড়বে, সে ব্যাংক তত বেশি স্থিতিশীল হবে। এজন্যই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংক এশিয়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করেছে।

  • ব্যাংক এশিয়ার হাত ধরে দেশে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের যাত্রা। এখন এটি কোন অবস্থায় আছে?

ব্যাংক এশিয়া দেশে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের পাইওনিয়ার। আমরাই প্রথম মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলায় সেবাটির পাইলট প্রকল্প শুরু করি। এরপর ডাচ্-বাংলা ব্যাংকসহ অন্যরা এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করেছে। আমাদের এজেন্ট ব্যাংকিং মডেলটা এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে লম্বা সময় ধরে এটি সাপোর্ট দিতে পারে। এতদিন এজেন্ট সংখ্যা বাড়ানো ও অবকাঠামো নেটওয়ার্ক তৈরিতে আমরা অনেক ব্যয় করেছি। এর ফলে লম্বা সময় ধরে এ থেকে উপকৃত হব।

দেশের ৬৩টি জেলার ৩৫৫টি উপজেলায় আমাদের এজেন্ট ব্যাংকিং সম্প্রসারিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৯৩৬টি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। এসব ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে ৩০২ কোটি টাকার আমানত। এছাড়া ৫ হাজার ৭৫১ জন গ্রাহককে আমরা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১১৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছি। চালু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোট ৯ হাজার ২৬১ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।

বর্তমানে এর মাধ্যমে দিনে ২ হাজার ৫০০ হিসাব খোলা হচ্ছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের জন্য এটি বড় ধরনের সফলতা। আমাদের লক্ষ্য হলো দিনে ১০ হাজার ব্যাংক হিসাব চালু করা। বিদ্যমান নেটওয়ার্ক দিয়েই এটি সম্ভব।

  • এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ কী?

ইউএনডিপির সহযোগিতায় সরকারের এ-টু-আই প্রকল্পের অধীনে দেশব্যাপী ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি) চালু করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের সেবা দেয়া হচ্ছিল। এর মধ্যে ব্যাংকিং সেবাটি অনুপস্থিত ছিল। আমরা এ সেন্টারগুলোয় ব্যাংকিং সেবা যুক্ত করছি। এরই মধ্যে ১ হাজার ৮০০ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে আমরা পৌঁছে গেছি। সব মিলিয়ে ব্যাংক এশিয়া ১ হাজার ৯৯১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট চালু করেছে। এর মধ্যে ৩০৭টি ব্যক্তিগত ও ৫৭টি প্রতিষ্ঠানিক। বাকি সব আউটলেট ইউডিসিতে চালু করা হয়েছে।

ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেয়ার কারণে সেখানকার মানুষকে বাইরে যেতে হচ্ছে না। ইউডিসিতে গেলেই আমানত জমা রাখা কিংবা তোলা, রেমিট্যান্স সার্ভিস, পাসপোর্টের টাকা জমা দেয়া, ইউটিলিটি সার্ভিস, ফান্ড ট্রান্সফারের মতো ব্যাংকিং সেবা পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকে টাকা পাঠানো হলে ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং সেন্টারে গিয়ে টাকা তোলা যাবে।

আগামী দিনে ইউডিসিগুলো ই-কমার্সের হাব হিসেবে কাজ করবে। ভূমি কর বা খাজনা পরিশোধের মতো সরকারি অর্থ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করা যাবে। এছাড়া বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, দুস্থ ভাতার মতো সরকারি সমাজসেবাগুলো এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। এক্ষেত্রে সেবাটির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে।

  • এজেন্ট টাকা নিয়ে পালিয়ে গেলে কিংবা অন্য কোনো ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে গ্রাহকেরটাকা আত্মসাতের মতো অপরাধ ঘটালে তার দায়ভার কার?

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তার দিকটি যথেষ্ট শক্তিশালী। এজেন্টের অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকলে সে কোনো লেনদেন করতে পারে না। লেনদেন না হলে গ্রাহককে কোনো প্রিন্টেড রিসিট দেয়াও সম্ভব হবে না। গ্রামের গ্রাহকদের লেনদেনসংক্রান্ত বিষয়ে সচেতন করার জন্য প্রত্যেকটি আউটলেটে বোর্ড দিয়ে রাখি। এছাড়া প্রত্যক আউটলেটে আমাদের একজন কর্মী আছে। পৃথিবীর এজেন্ট ব্যাংকিং মডেলে এটি না থাকলেও নিরাপদ লেনদেনের স্বার্থেই এটি আমরা করেছি। এর মাধ্যমে লেনদেনের ক্ষেত্রে বহুস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

  • তার মানে এজেন্ট ব্যাংকিংকে শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত বলছেন?

গ্রাহকদের ঝুঁকির বেশির ভাগের দায়ই আমরা নিয়েছি। তার পরও দু-একটি অভিযোগ আসছে না, বিষয়টি এমনও নয়। তবে তার সংখ্যা খুবই কম। এটিকে আমরা অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষা হিসেবেই গ্রহণ করছি।

  • কোনো এজেন্ট ভুয়া রিসিপ্ট ছাপিয়ে গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ করলে তার দায়ভার কার?

এ ধরনের কোনো প্রতারণার ঘটনা ঘটলে তার দায়দায়িত্ব ব্যাংকের। আমরা গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করে দেব। তবে এ টাকা আমরা এজেন্টের কাছ থেকে আদায় করব। ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে যেকোনো লেনদেন শতভাগ নিরাপদ। গ্রাহকদের নিরাপদ ব্যাংকিং সেবা দেয়া ব্যাংক এশিয়ার দায়িত্ব। এ দায়িত্ব আমরা আনন্দের সঙ্গেই গ্রহণ করছি।

  • দেশের প্রায় সব ব্যাংকই করপোরেট ব্যাংকিং থেকে সরে এসে এসএমই  রিটেইলে ঝুঁকছে।ব্যাংক এশিয়ার ক্ষেত্রেও কি তাই?

উন্নত প্রযুক্তির অভাব এবং ব্যবসায়িক মডেল না থাকায় এতদিন ব্যাংকগুলো এসএমই ও রিটেইল ব্যাংকিংয়ে যেতে পারেনি। এক্ষেত্রে যুগোপযোগী কোনো ব্যবসায়িক মডেলও আমরা তৈরি করতে পারিনি। ফলে ব্যাংকগুলো গতানুগতিক করপোরেট ব্যাংকিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন ইন্টারনেটের গতি বৃদ্ধি, উন্নত সফটওয়্যার, দক্ষ জনবলসহ দেশ সবক্ষেত্রে এগিয়েছে।

এ মুহূর্তে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির চাকা দ্রুত ঘুরছে। আমাদের সমাজে একটি মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে উঠেছে। তার পরও দেশের ৬০ শতাংশ মানুষের এখনো কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। এ অবস্থায় ব্যাংকিং সেবা যদি সব মানুষের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা পূর্ণ হবে না।

ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যাংকঋণের ৭০ শতাংশ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ায় পুরো ব্যাংকিং খাত ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বড় বড় শিল্প গ্রুপকে সব ব্যাংক মিলে ঋণ দেয়ায় এ ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। অনেক ব্যাংকই গুটি কয়েক গ্রাহকের ভাগ্যের ওপর নিজেকে সঁপে দিয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান পরিস্থিতিও ব্যাংকারদের চোখ খুলে দিতে বাধ্য করেছে। উপলব্ধিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হওয়ায় ব্যাংকগুলো এসএমই ও রিটেইল ব্যাংকিংয়ে জোর দিতে বাধ্য হচ্ছে। বেঁচে থাকার জন্য এটিই সর্বোত্কৃষ্ট পন্থা। এছাড়া সামনের দিনে টেকসই হওয়া সম্ভব হবে না। আমরাও একই পথে হাঁটছি।

  • ব্যাংক এশিয়া পরিবারের প্রতি আপনার বার্তা কী?

ব্যাংক এশিয়া শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ানো প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যাংক। অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় আমাদের ব্যালান্সশিট এ মুহূর্তে শক্তিশালী। জনগণের ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ব্যাংক এশিয়া উপস্থিত হবে। সবার কাছ থেকে আমরা সহযোগিতা চাই। ডিজিটাল বাংলাদেশ ও তার সঙ্গে সবার জন্য একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট— এটি আমাদের স্বপ্ন। এ স্বপ্ন বস্তবায়নের জন্য আমরা সবার কাছ থেকে সমর্থন চাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here