মিথুন নিটিংয়ে পালাবদল

0
2177

স্টাফ রিপোর্টার : মিথুন নিটিং অ্যান্ড ডায়িং লিমিটেডে হঠাৎ ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ৮ মাসের মধ্যে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালনায় পরিবর্তন করা হয়েছে। যদিও কোম্পানির নতুন বাণিজ্য পলিসির পরিবর্তন করা হয়নি।

চট্টগ্রাম রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলে (সিইপিজেড) অবস্থিত কারখানায় ১৯৯৩ সাল থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে কোম্পানিটি। অ্যাকর্ড সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণে ইউরোপের প্রতিষ্ঠানগুলোয় মিথুন নিটিংয়ের পণ্য রফতানি বন্ধ হয়ে যায়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কোম্পানির ব্যবসায়।

তবে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষদিকে কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পালাবদল ঘটে। হঠাৎ করেই মিথুন নিটিংয়ের পাঁচ উদ্যোক্তা পরিচালক— রাবেয়া খাতুন, মাহবুব-উল-হক, মোজাম্মেল হক, রফিকুল হক ও আতিকুল হক পর্ষদ ছাড়ার ঘোষণা দেন। এর মধ্যে রাবেয়া খাতুন চেয়ারম্যান ও মাহবুব-উল-হক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

পুনর্গঠিত পর্ষদে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডার একেএম শাহাবুব আলম এফসিএ, শওকত মাহমুদ, নয়ন মাহমুদ, রোজি আক্তার খান ও একেএম ফারুক পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। এর মধ্যে একেএম শাহাবুব আলম চেয়ারম্যান ও শওকত মাহমুদ ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মনোনীত হন। আর একেএম ফারুক ও রোজি আক্তার খান মাহমুদ ইকুইটি লিমিটেড কর্তৃক মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে মিথুন নিটিংয়ের পর্ষদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। কোম্পানির পর্ষদের এ পালাবদল ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) অনুমোদন করেন বিনিয়োগকারীরা।

মিথুন নিটিংয়ের উদ্যোক্তা হিসেবে এত দিন পর্ষদে ছিলেন চুয়াডাঙ্গা-২ আসন থেকে তিন মেয়াদে নির্বাচিত বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মো. মোজাম্মেল হক, তার স্ত্রী রাবেয়া খাতুন, মোজাম্মেল হক ও রাবেয়া খাতুনের তিন ছেলে আতিকুল হক, মাহবুব-উল-হক ও রফিকুল হক। আর মোজাম্মেল হক ও তার পরিবার কর্তৃক পর্ষদ ত্যাগের পরে পুনর্গঠিত পর্ষদের দায়িত্বে আসেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক সদস্য একেএম শাহাবুল আলম এফসিএ, তার ছেলে শওকত মাহমুদ ও নয়ন মাহমুদ।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্যানুসারে ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত মুনাফার ধারায় ছিল কোম্পানিটি।

এদিকে পর্ষদের পালাবদলের মধ্যেই ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড অন ফায়ার সেফটি ইন বাংলাদেশ কারখানার সংস্কারকাজে সন্তোষজনক অগ্রগতি না থাকায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মিথুন নিটিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে।

রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের পোশাক খাতের কর্মপরিবেশের উন্নয়নে গঠিত অ্যাকর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ রয়েছে এইচঅ্যান্ডএম, সিঅ্যান্ডএ, নেক্সট, ম্যাঙ্গো, ইন্ডিটেক্স, টেসকোসহ বিশ্বখ্যাত দুই শতাধিক ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান। যেসব কারখানার সঙ্গে অ্যাকর্ড ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, তারা জোটের চুক্তিবদ্ধ ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের পোশাক তৈরির ক্রয়াদেশ পাবে না।

অ্যাকর্ড সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণে ইউরোপের প্রতিষ্ঠানগুলোয় মিথুন নিটিংয়ের পণ্য রফতানি বন্ধ হয়ে যায়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কোম্পানির ব্যবসায়। তবে বিকল্প হিসেবে অ্যাকর্ড জোটের বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোয় রফতানির মাধ্যমে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে কোম্পানিটি।

এদিকে অ্যাকর্ড সম্পর্ক ছিন্ন করায় ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও ২০১৬-১৭ হিসাব বছরের অর্ধবার্ষিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এবং তৃতীয় প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করার কারণে কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে অন্ধকারে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনা অনুসারে, জীবন বীমা কোম্পানি ছাড়া অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রথম প্রান্তিক শেষ হওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রান্তিক শেষ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিএসইসি, দুই স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

তবে মিথুন নিটিং বিএসইসির নির্দেশনা লঙ্ঘন করে অর্ধবার্ষিক শেষ হওয়ার ১৫০ দিন এবং তৃতীয় প্রান্তিক শেষ হওয়ার ৬০ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো পর্যন্ত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। এর মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারির ৩০ তারিখে অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন-সংক্রান্ত পর্ষদ আহ্বান করেও পরবর্তীতে তা স্থগিত করা হয়। সেই থেকে অদ্যাবধি নতুন করে পর্ষদ সভার তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।

পর্ষদ থেকে পদত্যাগের পরে কোম্পানির তিনজন উদ্যোক্তা আতিকুল হক, মাহবুব-উল-হক ও রফিকুল হক ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ দফায় মোট ৩০ লাখ ৯০ হাজার শেয়ার বিক্রি করেছেন।

এদিকে কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের পর্ষদ ত্যাগ, নতুন পর্ষদের দায়িত্বগ্রহণ, অ্যাকর্ডের সম্পর্ক ছিন্ন করার ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে অনুষ্ঠিত একাধিক পর্ষদ সভায় নতুন দায়িত্ব নেয়া পাঁচ পরিচালক— একেএম শাহাবুব আলম এফসিএ, শওকত মাহমুদ, নয়ন মাহমুদ, রোজি আক্তার খান ও একেএম ফারুক রহস্যজনক কারণে পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেন। এর বদলে আবারো পর্ষদে ফিরে আসেন কোম্পানিটির পাঁচ উদ্যোক্তা পরিচালক। এ দফায় কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে রাবেয়া খাতুন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মো. রফিকুল হক দায়িত্বগ্রহণ করেন।

কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় দ্রুততম সময়ের দুই দফা পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে মিথুন নিটিংয়ের পরিচালক আতিকুল হক জানান, নতুন দায়িত্বে আসা পর্ষদ সদস্যরা আগে থেকেই বিনিয়োগকারী হিসেবে কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। কোম্পানির অবস্থার উন্নতির জন্য উভয়পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতেই পর্ষদে পালাবদল ঘটে। তারা কোম্পানির উন্নতির জন্য উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তবে পরবর্তীতে কোনো কারণে তাদের মনোভাব পরিবর্তন হয়ে যায় এবং তারা কোম্পানির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইছিলেন।

তিনি বলেন, এমন অবস্থায় আমরা কোম্পানির দায়িত্ব পুনরায় গ্রহণ না করলে একটা অচলাবস্থা তৈরি হতো এবং উৎদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতো। যেহেতু কোম্পানিটি আমরাই প্রতিষ্ঠা করেছি, তাই এর প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ ও দুর্বলতা রয়েছে। তাই আমরা আবারো পর্ষদে ফিরে এসেছি। এখন বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে আমরা আলোচনা করছি। অর্থ পাওয়ার নিশ্চয়তা পেলেই আমরা কারখানার সংস্কার ও আধুনিকায়নের  কাজ শুরু করব।

এদিকে, স্বল্প সময়ের জন্য মিথুন নিটিংয়ের পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একেএম শাহাবুব আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো কথাই বলতে চাননি।

প্রসঙ্গত, কোম্পানিটির উত্পাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে সিঙ্গেল জার্সি, ইন্টারলক, রিব, ফরাসি টেরি, ফ্লাট নিট, কলার অ্যান্ড কাফ, রিব উইথ লাইক্রা প্রভৃতি। তাছাড়া কোম্পানিটি সব ধরনের শর্টসের নিটওয়্যার তৈরি ও রফতানি করে থাকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here