নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিশ্বে কি জনপ্রিয়?

0
4304
নতুন বিনিয়োগকারীদের প্রধান সমস্যা হলো তথ্যের অভাব ও জ্ঞানের সল্পতা। গুজব ও ভুল তথ্যের ওপর তারা নির্ভর করেন। এ রকম অনেক কিছু ব্যাপার নিয়েই আজকের আলোচনা। আশা করি সবাই উপকৃত হবেন।

নতুনদের পাশাপাশি শেয়ার বাজারের অনেক পুরনো বিনিয়োগকারীও সাধারণ শেয়ার, মিউচ্যুয়াল ফান্ড, জিরো কুপন বন্ড, বন্ড ইত্যাদির পার্থক্য বোঝেন না। ফলে সবগুলোকেই এক (কোম্পানির শেয়ার) মনে করেন। অবশেষে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন।

মিউচ্যুয়াল ফান্ড : ধরুণ, আপনার বন্ধু করিম অনেক দিন ধরেই শেয়ার বাজারে ব্যবসা করেন। ছোট বড় ধাক্কা খেয়ে স্বশিক্ষিত হয়েছেন। মানে ব্যবসাটা বেশ ভালই বোঝেন তিনি। তাই নতুন বিনিয়োগকারী বন্ধুরা মিলে ঠিক করলেন- একা ধাক্কা না খেয়ে সবার পুঁজি করিমকে দেয়া হোক। সে ব্যবসায় বুদ্ধি খাটিয়ে ভাল লাভ করার পরে এবং অর্জিত মুনাফা সবার সঙ্গে শেয়ার করবে।

বলতে পারেন- এক ধরনের সমবায় সংঘ পরিচালনার ভার পড়েছে আপনার ওই বন্ধুর কাঁধে। ঠিক এমন কাজটিই করে মিউচ্যুয়াল ফান্ড ম্যানেজার। ফান্ডের ইউনিট হোল্ডারদের কাছ থেকে পুঁজি তুলে টাকা বিনিয়োগ করা হয়- শেয়ার বাজার ও আর্থিক বাজারে (এফডিয়ার, ট্রেজারি বন্ড, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদি)। বিনিয়োগের লাভ-লোকশানের অংশিদার হল ফান্ডের ইউনিট হোল্ডাররা।

সুতরাং মিউচ্যুয়াল ফান্ড কোন কোম্পানির শেয়ার নয় এবং এর আয়-রোজগার সম্পূর্ণ নির্ভর করে অর্থ বাজার ও শেয়ার বাজারের খারাপ-ভাল অবস্থার ওপর।

ধরুণ, মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে এর মোট মূলধন ১০,০০০ টাকা এবং ইউনিট সংখ্যা ১০০ অর্থাৎ ফেস ভ্যালু ১০ টাকা। এই টাকায় শেয়ার ১,২ ও ৩ কেনা হয়েছিল। শুরুতে যার বর্তমান বাজার মূল্য ১২,৫০০ টাকা। মানে মিচুয়াল ফান্ডের বেসিক NAV ১০ টাকা এবং চলতি NAV ১২.৫ টাকা।

ধরুণ, বছর শেষেও একই অবস্থা অতএব প্রতি ইউনিটে আয় ২.৫ টাকা যার ১ টাকা বোনাস দেয়া হল এবং বাকি ১.৫ আগের ১০ টাকার সাথে যোগ করে পুনরায় বিনিয়োগ করা হলো। এভাবে ৩-৪ বছর পর দেখা গেল মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বেসিক NAV ১৪ টাকা এবং চলতি NAV ১৭.৫ টাকায় দাড়িয়েছে।
এখন প্রশ্ন হল- আপনি এই মিচুয়াল ফান্ডের ইউনিট কিনতে গেলে কত টাকায় কিনবেন ?

আইডিয়াল সিচুয়েশনে ১৪ টাকা এবং রিয়েল সিচুয়েশনে ১৭.৫ টাকা বড় জোর ১৮-২০ টাকা। কিন্তু আমাদের বাজারে এই মানের ইউনিট এখন বিক্রি হয় ৩০-৫০ টাকায়। পৃথিবীর সব মার্কটে মিউচ্যুয়াল ফান্ড ইউনিটের দাম তার চলতি NAV এর কাছে হয়।

জিরো কুপন বন্ড বা বন্ড : এটা অনেকটা সরকারী সঞ্চয়পত্রের মত। পার্থক্য হল- এ থেকে আপনি কোন ইন্টারেস্ট পাবেন না। কিন্তু মেচিউরিটিতে যে মূল্য পাওয়া যাবে তা থেকে ডিসকাউন্টে এই বন্ড কিনতে পারবেন। আবার অনেক জিরো কুপন বন্ড মেয়াদ শেষে সাধারণ শেয়ারে কনভার্ট করার সুযোগ দেয়।

ধরুণ, কোম্পানি ‘খ’ ৫ বছর মেয়াদি ১,৫০০ টাকার বন্ড ছাড়ল। যা ১০০০ টাকায় বিক্রি হবে এবং এর ১০% শেয়ারে কনভার্ট করা হবে। এখন আপনি এই বন্ড ১০০টা কিনলেন।

আপনার বিনিয়োগ: ১০০০*১০০ =১,০০,০০০ টাকা
এখন ৫ বছর পর মেচিউরিটিতে  আপনি পাবেন –
১৫০০*৯০ =১,৩৫,০০০ টাকা এবং কম্পানির ১০টি শেয়ার।

উল্লেখ্য, ৫ বছরে কোম্পানি আপনাকে কোন লভ্যাংশ দেবে না। পাঁচ বছরে আপনার লাভ হবে বন্ড প্রতি ৫০০ টাকা। কারণ আপনি ১৫০০ টাকার বন্ড ৫ বছর আগে ১০০০ টাকায় কিনেছেন। আর আপনি যেহেতু ১০০ টি বন্ড কিনেছিলেন তাই ১০% হারে ১০ টি সাধারণ শেয়ার আপনি পাবেন।

সুতরাং, বুঝতেই পারছেন এটা সাধারন শেয়ারের মত নয়। মূলত দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগের জন্যই বন্ড কেনা উচিত।

বন্ড ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড মূলত সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সারা বিশ্বে জনপ্রিয়। কারণ এগুলোর দাম খুব বেশি ওঠা-নামা করে না অর্থাৎ বাজার স্থিতিশীল রাখতে কাজ করে । অথচ আমাদের দেশে বিনিয়োগকারীদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে বেশি দামে  তাদের গছিয়ে দেয়া হয়। যা বাজারকে স্থিতিশীল করার পরিবর্তে আরো অস্থিতিশীল করে। সুতরাং বন্ড ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করার আগে ভালভাবে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আপনাদের বোঝার জন্য ২ টা উদাহরণ তুলে ধরা হল-

DBH1STMF
On the close of operation on March 25, 2010, the Fund has reported Net Asset Value (NAV) of Tk. 10.36 per unit on the basis of current market price and Tk. 10.35 per unit on the basis of cost price against face value of Tk. 10.00

-ফেব্রুয়ারি ২০১০ তারিখে এই কম্পানির ১০ টাকায় যাত্রা শুরু করা ইউনিটের বর্তমান নিট মূল্য ১০.৩৫ টাকা। আর এই ১০.৩৫ টাকায় কেনা শেয়ার সমূহের চলতি বাজার মূল্য ১০’৩৬ টাকা। মানে তাদের পোর্টফলিটি লাভে পরিচালিত হচ্ছে এবং এর পরিমাণ ০.১% (বেজ ১০.৩৫)।

GRAMEEN1
On the close of operation on March 25, 2010, the Fund has reported Net Asset Value (NAV) of Tk. 54.98 per unit at current market price basis and Tk. 27.80 per unit at cost price basis against face value of Tk. 10.00 whereas Net Assets of the Fund stood at Tk. 934,625,271.00.

-মার্চ ২৫, ২০০৫ তারিখে, ১০ টাকায় যাত্রা শুরু করা ইউনিটের নিট মূল্য দাঁড়িয়েছে ২৭.৮০ টাকা (অর্থাত বিগত বছর সমূহে বোনাস দেয়ার পর ইউনিট প্রতি ১৭.৮ টাকা নতুন করে বিনিয়োগ করা হয়েছে)। আর এই ২৭.৮ টাকায় কেনা শেয়ারসমূহের বর্তমান বাজার মূল্য ৫৪.৯৮ টাকা। মানে তাদের পোর্টফলিও লাভে পরিচালিত হচ্ছে এবং এর পরিমাণ ৯৭.৫% (বেজ ২৭’৮০)।

বর্তমানে GRAMEEN1 এর বাজার মূল্য ৯০ টাকা (যদিও একটু বেশি, আমার মতে সর্বোচ্চ ৭০ হওয়া উচিত। তবে আমাদের বাজারের নেচার অনুযায়ী ৮০-৮৫ )। এখন যারা মনে করছেন GRAMEEN1 এর ১০ টাকা ফেস ভ্যালুর ইউনিট যদি ৯০ টাকা হয়, তবে DBH1STMF এর ১০ টাকা ফেস ভ্যালুর ইউনিট ৩০-৪০ টাকা হবে।

এখন ওপরের ব্যাখ্যাগুলি বোঝার পর আপনিই বলুন- ওই রকম ঘটনা ঘটার কি আদৌ কোন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আছে? হুজুগ আর মার্কেট ম্যানুপুলেশন হয়ত ক্ষণিকের জন্য এই অসম্ভবকে সম্ভব করবে (আমাদের বাজারে প্রায়ই করে)। কিন্তু তা কতদিন স্থায়ী হবে?

মনে রাখা উচিত মার্কেট ম্যানুপুলেশন হয়ত ক্ষণিকের জন্য কোন শেয়ারের দাম আকাশে উঠিয়ে বা পাতালে নামিয়ে দিতে পারে কিন্তু অবশ্যই তা ক্ষণস্থায়ী সময়ের জন্য। তাই ভাল মৌল ভিত্তির শেয়ার কিনুন, লাভ বেশি না হলেও ক্ষতির শিকার হবেন না।

 লেখক :  মোহাম্মদ হাসান শাহারিয়ার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here