মার্জিন ঋণ থেকে মুক্তি কিভাবে?

0
2898

১৯৯৬-১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে প্রথম ধস শুরু। এ সময় ধসের অনেকগুলো কারণ ছিল। তার মধ্যে- যথাযথ নিয়ম কানুন এবং প্রযুক্তির অভাব ছিল প্রকট। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অনেক নিয়ম-কানুনের মাধ্যমে মূল সমস্যার সমাধান করে। যার মাধ্যমে মার্কেটে অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরে আসে। ধীরে ধীরে ১৯৯৬-১৯৯৭ সালের ধস কাটিয়ে উঠেন বিনিযোগকারীরা। ভুলতে থাকেন পুরনো শোক-ব্যথা।

এরপরে মার্কেট যখনই স্বাভাবিক গতিতে চলতে শুরু করল। ফের শুরু হলো নতুন করে সংকট। সে সঙ্কটে পড়ে অনেকে মার্জিন ঋণ গ্রহণ করেন। সেই ঋণ এখন গলার কাটা। তবে এটাকে সরিয়ে ফেলা যাবে সম্মিলিত চেষ্টা এবং কিছু নিয়মের মাধ্যমে। সে নিয়েই কিছু বলার চেষ্টা।

১৯৯৬-৯৭ সালে প্রথম বিপর্যয় শুরু। এরপরে ২০০৯-২০১০ সালে আবার মার্কেট বাবলআপ (বেলুন) হলো। সুস্থ্য পুঁজিবাজার দাবিতে প্রতিদিন চলে বিক্ষোভ-মিছিল আন্দোলন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে মানবপ্রাচীর তৈরি। চলে সরকারের শীর্ষ স্থানীয়দের বৈঠক-আলোচনা, অন্যদিকে বাজারে ধস। অবশেষে পুঁজি ঠেকাতে না পেরে হতাশায় কয়েকজন বিনিয়োগকারী করলেন আত্মহত্যা।

সমস্যার সমাধানে শুরু হলো বিশ্লেষণ। এবার আগের মতো প্রযুক্তি কিংবা রেগুলেটরের আইন-কানুন নিয়ে সমস্যাগুলো চিহিৃত হলো না। চিহ্নিত হলো মার্জিন লোন। যদিও এর পেছনে রেগুলেটর এবং প্রযুক্তিগত সমস্যা আংশিকভাবে দায়ী ছিল।

বেরিয়ে এলো তথ্য- ২০১০ সালে বিও একাউন্টের সংখ্যা বেড়ে ছিল দ্রুত গতিতে। সক্রিয় লাখো বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা আকাশ ছোঁয়া। মার্কেট এবং ইনডেক্স বাড়ছে প্রতিদিন। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এর সঙ্গে যোগ হলো।

আরো যোগ হলো ব্যাংকগুলোর ১:২ মার্জিন লোন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের পোর্টফোলিওর মাধ্যমে অধিক পরিমাণে  বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করলো। বাজার আরো ফুলে-ফেঁপে দ্রুত বাড়তে থাকে। রোজ বাড়ছে আকাঙ্খা, সূচক এবং বাজার।

monzurual alam (1)
মনজুরুল আলম, পোর্টফোলিও ম্যানেজার

সূচকের বৃদ্ধিতে বাজারে দেখা দিলো যোগান সংকট, চাহিদা তখন তুঙ্গে। রেগুলেটর পর্যাপ্ত পরিমাণ আইপিও বা শেয়ার ছাড়তে উৎসাহিত করতে গিয়ে প্লেসমেন্ট শেয়ারের অনুমোদন দিল। এসময় কিছু মধ্যসত্ত্ব ভোগী অল্পেই ফেঁপে উঠে।

চারদিকে প্রচুর ব্যবসা। দিকে-দিকে সুষম স্বপ্নের হাতছানি। এ সময় প্রচুর ব্যাংক, লিজিং কোম্পানি, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং ব্রোকারেজ হাউস লাইসেন্স গ্রহণ করে। তারাও বাজারে অবাধে বিনিয়োগ করতে থাকে। পরিণতিতে মার্কেট ইনডেক্স ওঠে যায় ৮৫০০ পয়েন্টে।

সময় বুঝে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ তুলে নিতে থাকেন। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংক এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি একসঙ্গে মাকের্টের লাগাম টেনে ধরে। বিএসইসি মার্জিন লোনের হার কমিয়ে ১:২ থেকে .৫০ তে নিয়ে আসে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্যাপিটাল মার্কেট এক্সপোজার ঠিক করে দেয় ২৫ শতাংশ। মার্কেট ভারসাম্য হারাতে শুরু করে। রোজ মার্কেট পড়তে থাকে। প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠেন সাধারণ বিনিয়োগকারী। এসময় তবুও অবিচল থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা। প্রতিবাদী কণ্ঠে চারদিকে চলছে বিক্ষোভ-মিছিল।

এ সময় সর্বসান্ত হন সাধারণ অনেক বিনিয়োগকারী। এতে ব্যাংকগুলো ক্ষতির থেকে বাঁচলেও অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী হাপাতে থাকেন। ইতোমধ্যে আটকে আটকে যায় ২০০০ কোটি টাকার মার্জিন লোন। ফুরাতে থাকে স্বপ্ন-সাধনার অর্থ।

ব্যাংকগুলো তাদের দেয়া মাজিন ঋণ এবং ঋণের সুদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনা। সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসময় কিছু প্রতিষ্ঠান ২০১৩ সালের দিকে ফোর্স সেলের কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। ফোর্স সেলের কারণে ওই বছরে অনেক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আবার অনেকে ক্ষতি থেকে বেরিয়ে আসেন।

শুধু মাত্র রেগুলেটরদের সঙ্গে সমন্বয়ে অভাবে সবাই এমন সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। যদিও এ পদ্ধতি মার্কেটের জন্য ক্ষতিকারক ছিল। এরই অনেক সময় বয়ে যায়, তবুও ঝড় থামেনি। অনেক সময় পরে বাংলাদেশ ব্যাংক ফোর্স সেল থেকে ভীত বিনিয়োগকারীদের বাঁচাতে এগিয়ে আসে এবং নতুন ধারণার তৈরি করে। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক্সপোজারের সজ্ঞা পরিবর্তন করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তে নতুন করে পথ চলা শুরু হলো। এতে ব্যাংকগুলোর ফোর্স সেল বন্ধ হয় কিন্তু মার্জিন ঋণের সুদের চাকা সচল থাকলো। এতে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলো মার্জিন লোন দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন নিয়ম-কানুন তৈরি করে। নির্দেশনা দেয়া হলো- প্রতিষ্ঠানগুলোর লভ্যাংশের প্রভিশনের ওপর। অন্যদিকে ক্ষুদ্র তহবিলের মাধ্যমে ৯% হারে আইসিবি নতুন ফন্ডের যোগান দিল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের।

monjurul
মনজুরুল আলম

এতে কিছুটা মলমের কাজ হলো। উপশম হলো পুঁজি হারানো অনেক বিনিয়োগকারীর। কিন্তু যেহারে ক্ষতি হলো লাভের অংশে তার সিকিভাগও পূরণ হলো না। সর্বশেষে যুক্ত হলো Dividend take over at margin loan Account. এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আবারো ক্ষতিগ্রস্থ হলো। অন্যদিকে লাভবান হলো মার্জিন লোন দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো। যা দিয়ে অর্থ ফেরত আর কোনভাবে সম্ভব নয়।

মার্জিন লোনের ফাঁদ থেকে বের হতে আমরা সবাই বিচ্ছিন্নভাবে চেষ্টা করছি কিন্তু বিচ্ছিন্ন চেষ্টা কোন ফল আসছে না। আমাদের উচিত সম্মিলিতভাবে পরিত্রানের চেষ্টা করা। প্রথমত আমাদের মার্জিন ঋণের ওপর ইন্টারেস্ট বন্ধ করতে হবে, তা হলো আমাদের ইকুইটি নেগেটিভ কোডগুলোতে। সেটা যেকোন উপায়ে-ই হোক।

  • অনেকে ইতোমধ্যে সাবসিডিয়ারীকে দেয়া মার্জিন ঋণ paid up capital -এ convert করে Interest charge বন্ধ করে দিয়েছে।
  • অনেক প্রতিষ্ঠান সাবসিডিয়ারীকে দেয়া মার্জিন লোনের Interest rate শূন্য করে দিয়েছে।
  • অনেক প্রতিষ্ঠান Equity negative Client code -এ Interest charge বন্ধ করেছে।
  • অনেক প্রতিষ্ঠান Equity negative Margin A/C এর Interest charge Accrued করে রাখছে।
  • অনেক প্রতিষ্ঠান Equity negative Client -এর সুদ মওকুফ করে দিচ্ছে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক এগিয়ে আসলে কাজটা আরো অনেক সহজে হবে। যেমন- কম সুদে একটা ফান্ড দেয়া যেতে পারে। যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো Equity negative Client code -গুলোতে Interest charge বন্ধ করতে পারে। যেকোন ভাবেই হোক Existing Equity negative A/C -এর Interest charge বন্ধ করতে হবে।

এরপরে Margin A/C -এর Existing Equity negative Recovery করার চেষ্টা। এ জন্য যা করা যেতে পারে-

  • যে সব কোম্পানি ভাল লভ্যাংশ দেয় বা Dividend Yield বেশি, সেসব কোম্পানির শেয়ার Equity negative Portfolio তে কেনা যেতে পারে। যেমন- মিউচুয়াল ফান্ড ও ব্যাংক।
  • Equity negative Portfolio গুলোতে Close End Mutual Fund কিনে রাখা যেতে পারে। যেসব ফান্ডের এনএভি ভালো। কারণ নির্দিষ্ট সময় শেষে ফান্ডগুলো আপনাকে এনএনভি হিসেবে অনেক বেশি আপনাকে ফেরত দেবে।
  •  মার্কেট প্রাইস এবং এনএভি প্রাইসের Difference ভাল এবং ভাল লভ্যাংশ দেয়, সে কোম্পানির শেয়ার কেনা যেতে পারে।
  • Equity negative Portfolio -এর জন্য আইপিও কোটা বরাদ্দ করা যেতে পারে। যাতে এ ফান্ড দিয়ে আইপিও আবেদন করে লাভবান হওয়া যায়। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কোটা বরাদ্দ রয়েছে।
  • Equity negative Portfolio -এর টাকা দিয়ে প্লেসমেন্ট শেয়ার কিনে রাখা যেতে পারে। অন্যদিকে আইপিওতে পাওয়া কোম্পানিগুলোর শেয়ার প্রথমে দ্বিগুণ-তিন গুণ দামে বিক্রি করে টাকা উঠানো যেতে পারে।
  • Equity negative Portfolio -এর বিনিয়োগ ভাল কোম্পানিতে করা যেতে পারে। যাদের শেয়ার মূল্য ভবিষ্যতে দ্বিগুণ বা তিনগুণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ বিষয়ে অনেক ভাল কিছু এনালিস্ট আছেন, প্রয়োজনে তাদের সহযোগিতাও নেয়া যেতে পারে।

সর্বশেষে কথা বা সারাংশ। No Risk no gain, সবাইকে Margin Loan -এর দুষ্টচক্র থেকে বের হতে হলে সদিচ্ছার প্রয়োজন। একই সঙ্গে Portfolio Manager কে Risk নেয়ার ক্ষমতা প্রদান করতে হবে। তা ছাড়া মার্জিণ ঋণ থেকে মুক্তি অসম্ভব।

  • মনজুরুল আলম, পোর্টফোলিও ম্যানেজার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here