মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্পের আগামী কি?

0
315

স্টাফ রিপোর্টার : কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ থেকে সরে আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। এর মধ্যেই ২০১৫ সালে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রকল্প নেয়া হয়। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নপুষ্ট প্রকল্পটির বিষয়ে গত সপ্তাহে জাপানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরেরও কথা ছিল।

তবে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এমন প্রকল্পে অর্থায়নে বিরোধিতা রয়েছে দেশটির মধ্যে। এ কারণে শেষ মুহূর্তে মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি থেকে সরে আসে জাপান। এর মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তায় পড়ল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় প্রকল্পের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে জাইকার। এ নীতিমালা অনুযায়ী, পরিবেশ ও সমাজের ওপর প্রভাব বিবেচনায় প্রকল্পগুলোকে চারটি শ্রেণী—এ, বি, সি এবং এফআইয়ে ভাগ করা হয়। জাইকার সরাসরি অর্থায়ন করা প্রকল্পগুলোকে এ, বি ও সি শ্রেণী এবং তৃতীয় কোনো সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা প্রকল্পগুলোকে ভাগ করা হয় ফিন্যান্সিয়াল ইন্টারমিডিয়ারি (এফআই) শ্রেণীতে।

পরিবেশ ও সমাজের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এমন প্রকল্পগুলোকে ‘এ’ শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছে নীতিমালায়। মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পটিও রয়েছে ‘এ’ শ্রেণীতে। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক জাপান সফরকালে চারটি প্রকল্পের উন্নয়নসহায়তা চুক্তি সই হলেও পরিবেশের ওপর প্রভাব বিবেচনায় বাদ পড়েছে মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প।

তবে প্রকল্পটিতে জাইকার অর্থায়ন পাওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানান বিদ্যুৎ সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস। তিনি বলেন, মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে জাপান এখনো নেতিবাচক কিছু জানায়নি। এছাড়া অর্থায়নের বিকল্প আরো উৎস রয়েছে। ফলে জাপান অর্থায়ন না করলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি নেয় ২০১৫ সালে। প্রাথমিকভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০২২ সালের জুনের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা সংশোধন করে ২০২৪ সালের জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়। যদিও গত চার বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১৯ শতাংশ। ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৯০ কোটি টাকা, যা মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ১৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

প্রধানমন্ত্রীর সদ্য সমাপ্ত জাপান সফরে মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ মোট পাঁচটি প্রকল্পে ২৫০ কোটি ডলারের উন্নয়নসহায়তা বা ওডিএ সই হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক দল থেকে চাপ আসতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে টোকিওতে এটি সই থেকে কৌশলে বিরত থাকে জাপান। তবে চলতি মাসে ঢাকায় প্রকল্পটি নিয়ে ওডিএ সই হতে পারে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।

আর জাপানের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, পরিবেশ ইস্যুতে জাপানের নীতির কারণে চুক্তিটি টোকিওতে সই হয়নি। জাপান এমন কিছু সই করবে না, যাতে পরিবেশ ইস্যুতে দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে চাপ আসতে পারে। তবে এটি বাতিল হয়নি। ঢাকায় চুক্তিটি সই হতে পারে বলে জানিয়েছে সূত্রটি।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারাও বলছেন, মাতারবাড়ী আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে পরিবেশের ওপর ক্ষতির বিষয়ে উদ্বিগ্ন জাপান। দেশটির পরিবেশ আইন বেশ শক্ত। ফলে এমন কোনো চুক্তি তারা নিজ দেশে সই করবে না, যাতে পরবর্তী সময়ে বিতর্কের সৃষ্টি করে। এ কারণে এটি ঢাকায় সই হতে পারে।

মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তির বিষয়ে সম্ভাবনার কথা বললেও নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি কোনো পক্ষই, যা জাপানি অর্থায়নে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিদ্যুৎ খাত বিশেষজ্ঞ ও পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমাতুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, শিল্পোন্নয়নের তাগিদে একসময় কয়লার বিপুল ব্যবহার হয়েছে। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধের প্রক্রিয়ায় সব দেশই এখন এটি থেকে সরে আসছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতও কয়লার ব্যবহার কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। জাপানে পরিবেশের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। এ ধরনের প্রকল্পে অর্থায়ন নিয়ে দেশটিতে বিরোধিতা রয়েছে। পরিবেশের বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে আমাদেরও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরে আসা প্রয়োজন।

মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ হবে আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে।  মাতারবাড়ী ইউনিয়নে ১ হাজার ৪১৪ একর জমির ওপর এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ঋণসহায়তা হিসেবে জাপান সরকারের দেয়ার কথা ২৮ হাজার ৯৩৯ কোটি ৩ লাখ টাকা। বাকি ৭ হাজার ৪৫ কোটি ৪২ লাখ টাকার জোগান দিচ্ছে সরকার। সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে বাস্তবায়নাধীন যে ১০টি প্রকল্প রয়েছে, তার মধ্যে ব্যয়ের বিবেচনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরই রয়েছে মাতারবাড়ীর এ প্রকল্প।

দরপত্র প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই ২০১৬ সালের জুলাইয়ে গুলশানের হলি আর্টিজান হামলায় জাপানি প্রকৌশলীসহ ১৭ বিদেশী নিহত হওয়ায় সেই দরপত্র প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। পরে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানি কনসোর্টিয়াম সুমিতোমো করপোরেশন, তোশিবা করপোরেশন ও আইএইচআই করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল)।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here