শাহীনুর ইসলাম ও ইমরান রহমান : ডিবিএল গ্রুপের (দুলাল ব্রাদার্স লিমিটেড) প্রতিষ্ঠান মতিন স্পিনিং মিলস কোম্পানিরপ্রায় হাজার কোটি টাকার তিনটি প্রকল্প চালু করা হয়েছে। প্রকল্পগুলোর বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিপণন শুরু হওয়ায় কোম্পানির বাৎসরিক নিট আয় বাড়বে শতকোটি টাকারও বেশি।

বৃহৎ ৩টি প্রকল্পের বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বিপণনের তথ্য শনিবার দুপুরে স্টক বাংলাদেশের কাছে নিশ্চিত করেন মতিন স্পিনিং মিলস কোম্পানির ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ।

মেগা প্রকল্পগুলো হলো- ডিবিএল সিরামিকস লিমিটেডের ফেব্রুয়ারি মাসে বাণিজ্যিকভাবে সিরামিকস উৎপাদন শুরু, আইপিও এবং কোম্পানির অর্থ ব্যয়ে দৈনিক ৫১ টন সুতা উৎপাদন ও ব্যবহার এবং ৩ মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যয়ে ২৮ মার্চ নতুন প্রজেক্টে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করেছে।

একই সঙ্গে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ায় ৩০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ৭৫ হেক্টর জমির ওপর পোশাক কারখানায় বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিবিএল গ্রুপের আরো একটি বৃহৎ অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ডিবিএল সিরামিকস লিমিটেড প্রায় ৬০০ কোটি টাকা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাণিজ্যিকভাবে টাইলস উৎপাদন শুরু করেছে। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজার দখলে গাজীপুরের শ্রীপুরে ১৭টি ইউনিটে একযোগে টাইলস উৎপাদন শুরু করেছে।

মতিন স্পিনিং কোম্পানির অর্থে প্রাথমিকভাবে সিরামিকস কোম্পানির ‘ক’ ইউনিটের উৎপাদন শুরু হয়েছে বলেন ডিবিএল গ্রুপের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা (সিএফও) এ এইচ এম আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, আগামী মাসে ‘খ’ ইউনিট এবং এরপরে ‘গ’ ইউনিটের উৎপাদন শুরু হবে। গ্যাস সংকটের কারণে সব ইউনিটের একযোগে উৎপাদন শুরু করা যাচ্ছে না।

বাজার বিপণন সম্পর্কে তিনি বলেন, মান ভালো হওয়ায় বাজারে ডিবিএল সিরামিকসের ব্যাপক চাহিদা। তবে চাহিদার তুলনায় আমাদের সিরামিকস উৎপাদন অনেক কম হচ্ছে। এজন্য তিনি সরকারকে গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

সিরামিকস কোম্পানি থেকে নিট আয় মতিন স্পিনিং কোম্পানির আয়ের সঙ্গে যোগ হবে বলেন সিএফও আরিফ।

‘ডিসেম্বর থেকে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু’ এবং ‘৬ টি কোম্পানির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি’ সম্পর্কে তথ্য নিশ্চিত করেন মতিন স্পিনিং কোম্পানির সেক্রেটারি শাহ আলম। তিনি স্টক বাংলাদেশ বলেন, ৬টি কোম্পানির সঙ্গে আমরা ২ বছরের জন্য বাণিজ্য চুক্তি করেছি। আসলে এসব কোম্পানি আমাদের ডিবিএল গ্রুপের কোম্পানি।

ডিএসইর প্রকাশিত তথ্য

আলোচনার মাধ্যমে শাহ আলম কোম্পানির উৎপাদন সম্পর্কে বিস্ময়কর তথ্য প্রকাশ করে বলেন, আমাদের দৈনিক চাহিদা ১২০ টন সুতা। সেখানে আমাদের উৎপাদন হচ্ছে দৈনিক মাত্র ৫১ টন (সিনথেটিক সুতা)। এরমধ্যে আগের উৎপাদন ছিল ২৫ টন, আইপিও’র ১২১ কোটি ১৭ লাখ টাকা দিয়ে ১০ টন এবং কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়নে আরো ১৬ মিলে ৫১ টন সুতা আমরা উৎপাদন করছি। (ডিএসইর প্রতিবেদনে দৈনিক ১৬টন উৎপাদন উল্লেখ করা হয়েছে)

ডিএসইর প্রতিবেদন

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত (২মাস) কর পরবর্তী প্রায় ৫ কোটি টাকার আয় হয়েছে। সে হিসেবে সুতা বিক্রি করে প্রকল্প থেকে বছরে প্রায় ১৮ কোটি টাকা নিট আয়ের আভাস মেলে। এছাড়া ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে আরো একটি প্রকল্পের উৎপাদন শুরু হয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধিতে চুক্তি অনুযায়ী ইউনাইটেড পাওয়ার (ইউপিজিডিসিএল) কোম্পানি লিমিটেড ৩ মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ প্রদান করছে।

উৎপাদন সম্পর্কে শাহ আলম বলেন, কোম্পানির ব্যয় কমাতে তিন মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ প্রদানে ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ইউপিজিডিসিএল) সঙ্গে চুক্তি করা হয়। সার্বক্ষণিক (২৪ ঘণ্টা) উৎপাদন অব্যহত রাখতে এই চুক্তি করা হয়েছে। তবে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা হবে।

আগামীতে আমাদের আরো অনেক মেগা প্রজেক্ট আসছে বলেন তিনি।

আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ায় তৈরি পোশাক উৎপাদন সম্পর্কে সিএফও আরিফুল ইসলাম আরো বলেন, যুুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইথিওপিয়া থেকে পোশাক রপ্তানী করা হবে। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী এবং কাঁচামাল রপ্তানী হবে। ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবার পাশের শহর মেকেলেতে ৭৫ হেক্টর জমির ওপর গড়ে উঠছে কারখানা।

তবে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হওয়ায় কোম্পানির বাৎসরিক নিট আয় শতকোটি টাকার বেশি বৃদ্ধির কথা এড়িয়ে যান। তবে শতকোটি টাকার কম-বেশি হওয়ার আভাস প্রদান করেন তারা।

কোম্পানির নিট আয় বৃদ্ধি পেলে বাড়তে থাকবে কোম্পানির ইপিএস এবং ন্যাভ। এর সঙ্গে ভর করে বাড়তে থাকবে দেশের প্রথম সারির কোম্পানিটির শেয়ার মূল্য।

আইপিও থেকে উত্তোলন করা ১২১ কোটি ১৭ লাখ টাকা উৎপাদন বৃদ্ধি ও ব্যবসা সম্প্রসারণের কাজে অনেক আগে ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন করে উৎপাদন বৃদ্ধিতে আরো ১৫১ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এরমধ্যে ৮৬ কোটি টাকা হংকং এন্ড সাংহাই করপোরেশনের (এইচএসবিসি) ব্যাংক ঋণ, প্রায় ৬৭ কোটি টাকা কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়ন এবং অন্য খাত থেকে ব্যয় করা হয়েছে। এসব কথা বলেন কোম্পানির এ্যাসিটেন্ট সেক্রেটারি (শেয়ার বিভাগ) জিয়াউর রহমান।

আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ায় বাংলাদেশের দুলাল ব্রাদার্স লিমিটেড (ডিবিএল) গ্রুপের তৈরি পোশাক কারখানা ভবনের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। দেশটির রাজধানী আদ্দিস আবাবার পাশের শহর মেকেলেতে ৭৫ হেক্টর জমির ওপর গড়ে উঠা কারখানায় আগামী সেপ্টেম্বর মাসে উৎপাদন শুরু হবে।

ইস্পাতের কাঠামোর নির্মিত ভবনের নির্মাণকাজ গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে শেষ এবং চলতি এপ্রিল মাসে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে  বৃষ্টির কারণে নির্মাণ কাজ পিছিয়েছে।

ইথিওপিয়ার কারখানায় সব মিলিয়ে ৪ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে। উৎপাদন শুরুর পর দ্বিতীয় বছরে কারখানাটি থেকে ৩ কোটি মার্কিন ডলার বা ২৪০ কোটি টাকার পোশাক রপ্তানির সম্ভাবনা আছে। তারপরের বছর পোশাক রপ্তানি দাঁড়াবে ৪ কোটি ডলার।

ডিবিএল কর্তৃপক্ষ জানায়, সম্প্রতি ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলে দেশটির স্পিকারসহ একটি প্রতিনিধি দল বিজিএমইএ ভবনে ডিবিএল গ্রুপের প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করেন।

ইথিওপিয়ায় পোশাক কারখানা স্থাপনের জন্য রপ্তানি প্রত্যাবাসন কোটার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৯৫ লাখ ডলার সেখানে নেওয়ার অনুমতি পেয়েছে তারা। নির্মাণকাজের জন্য গত বছর ৩০ লাখ ডলার ছাড় করিয়ে ইথিওপিয়ায় নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া বিনিয়োগের বাকি অর্থ বিদেশি ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০১৪ সালে ইথিওপিয়া সরকার পাঁচ বছরের মধ্যে সাতটি শিল্পপার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা করে। তাদের লক্ষ্যমাত্রা, ১০ বছরের মধ্যে ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা।

উল্লেখ্য, মতিন স্পিনিং ২০১৪ সালে ২৫ শতাংশ নগদ, ২০১৫ সালে ২৭ শতাংশ নগদ এবং ২০১৬ সালে ২৩ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here