ভোটের মাঠে ঋণখেলাপি

0
214

সিনিয়র রিপোর্টার : আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে হলে প্রার্থীদের ঋণ নিয়মিত থাকা বাধ্যতামূলক। প্রার্থীদের বেশির ভাগই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ও ব্যাংক ঋণ রয়েছে। নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী প্রার্থীরা ঋণ পুনঃতফসিলে ঝুঁকছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে যাদের ঋণখেলাপি হয়ে গেছে, তারা ব্যাংকগুলোতে প্রতিনিয়ত ভিড় করছেন।

এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সঙ্গে দেখাও করেছেন কেউ কেউ। নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঋণের হালনাগাদ তথ্য জমা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু প্রার্থীদের মধ্যে যাদের ঋণখেলাপির তালিকায় নাম আছে তাদের পক্ষ থেকে সেভাবে পুনঃতফসিলের প্রস্তাব আসেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে।

এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঋণখেলাপিদের প্রার্থিতা ঠেকাতে তিন স্তরে পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

স্তরগুলো হলো- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআইবি থেকে, দ্বিতীয় পর্যায়ে তফসিলি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে এবং তৃতীয় পর্যায় ব্যাংকগুলোর শাখা থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, খেলাপিদের ঠেকাতে তিন স্তরে ঋণের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হবে। এ ব্যাপারে একটি চিঠি ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। আজ-কালের মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে পাঠানো হবে।

যারা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দেননি তারা প্রার্থী হতে পারবেন না। প্রার্থী হতে ব্যাংকের দায় ঋণ পরিশোধ কিংবা পুনঃতফসিল করতে হবে। ঋণখেলাপি নন বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন সনদ মিললে তবেই হতে পারবেন প্রার্থী। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এ নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। সে মোতাবেক কোনো ব্যক্তির যদি এক টাকাও ঋণ থাকে তার রিপোর্ট পাঠাতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। ফলে ছোট বড় আকারের যে ঋণই থাকুক না কেন, তা নিয়মিতকরণ করতে হবে।

এবারই প্রথম নিয়ম করা হয়েছে, ব্যাংকে যে কোনো পরিমাণের দায়ে আটকে যেতে পারে প্রার্থিতা। আগে নির্ধারিত শাখা অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে ম্যানেজ করে ছাড়পত্র নিলেই প্রার্থী হওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু এবার প্রার্থী হতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ছাড়পত্র নিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুনে ঋণ পুনঃতফসিলের পরিমাণ ছিল প্রায় এক হাজার ৪৫৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। আগস্ট মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৮৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। সেই হিসেবে তিন মাসের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় চার হাজার ৪২০ কোটি টাকা বা ৩০৩ শতাংশ।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময় সবচেয়ে বেশি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে মোট ৮৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে দেশের ব্যাংকিং খাতে।

জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ব্যাংকগুলো থেকে ঋণখেলাপিদের তালিকা নিয়ে সিআইবি হালনাগাদ করতে শুরু করেছে। তথ্য চাওয়া হয়েছে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরির আওতায় থাকা ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের খেলাপি গ্রাহকেরও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিজিএমইএ-এর বর্তমান সহসভাপতি এস এম মান্নান কচি নির্বাচন করতে চান ঢাকা-১৬ আসন থেকে। তিনি এরই মধ্যে ব্যাংকে যোগাযোগ করেছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আসলামুল হক ঋণখেলাপি হয়েছেন। তার নর্থ পাওয়ার ইউটিলিটির কাছে শুধু ন্যাশনাল ব্যাংকেরই পাওনা এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা। যার বড় অংশই খেলাপি হয়ে গেছে।

একইভাবে রাজশাহীর সংসদ সদস্য এনামুল হকের নর্দান পাওয়ার সল্যুশন শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায়। প্রার্থী হতে হলে তাকে ঋণ পরিশোধ করে নিতে হবে সিআইবি সনদ। এই দুই প্রার্থীই ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য ব্যাংকে যোগাযোগ করছেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে এনামুল হকের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার কাছে ব্যাংক কোনো টাকা পায়না। আমি ঋণখেলাপি নই।

বিকল্প ধারার মেজর (অব.) আবদুল মান্নান বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি থেকে নামে বেনামে ঋণ নিয়েছেন। নির্বাচনে প্রার্থী হতে তাকেও সিআইবির মুখোমুখি হতে হবে। আকিজ গ্রুপের কর্ণধার ও যশোর-১ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি শেখ আফিল উদ্দিন এবারো ওই আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে পারেন। তাদের গ্রুপের একটি কোম্পানির নামে খেলাপি ঋণ ছিল। সেটি ইতোমধ্যেই নবায়ন করে নেয়া হয়েছে।

বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও মুন্নু গ্রুপের কর্ণধার প্রয়াত হারুনার রশিদ খান মুন্নুর মেয়ে আফরোজা খানম রিতা বিএনপির পক্ষে মানিকগঞ্জ থেকে প্রার্থী হতে পারেন। তাদের প্রতিষ্ঠান মুন্নু ফেব্রিক্স সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয়ে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৩০ কোটি টাকা। গ্রুপের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে এই ঋণ নবায়ন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ঋণ নবায়নের জন্য এককালীন ডাউন পেমেন্ট বাবদ ১১ কোটি টাকা সোনালী ব্যাংকে জমা দেয়া হয়েছে।

বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী মোর্শেদ খানের মালিকানাধীন প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকমের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা। গ্রুপের পক্ষ থেকে ঋণ নবায়নের বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। তারা বিদেশি উদ্যোক্তাদের কাছে শেয়ার বিক্রি করে ঋণ শোধ করার উদ্যোগ নিয়েছেন।

নীলফামারী-৪ আসনে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য শওকত চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান যমুনা এগ্রো লিমিটেড বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের বংশাল শাখায় একটি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান। তিনি খেলাপি ঋণ নবায়নের জন্য ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘ সময় ধরে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনে কে প্রার্থী হতে পারবেন বা পারবেন না সেটি নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার। আমরা কমিশন থেকে যে তালিকা পাব সেটি যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ঋণখেলাপি কিনা সেই রিপোর্ট দেব।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক বিবেচনায় এবং ব্যাংকারদের যোগসাজশে যেসব ঋণ দেয়া হয়, সেগুলোর অধিকাংশই খেলাপি হয়ে যায়। ঠিক একই কৌশলে গ্রাহকরা তা আবার পুনঃতফসিল করে নেয়। সাধারণত দুটো কারণে ঋণ পুনঃতফসিল করে গ্রাহকরা। যেমনÑ ঋণখেলাপি থাকলে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবে না। এ ছাড়া পুনরায় ঋণ নেয়ার জন্য আগের নেয়া ঋণ পুনঃতফসিল করে বলে মনে করেন সাবেক এই গভর্নর।

এদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বচন উপলক্ষে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঋণের তথ্য ১০ নভেম্বরের মধ্যে জমা দেয়ার নির্দেশনা ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রার্থীরা তাদের ঋণের হালনাগাদ তথ্য জমা দিয়েছেন। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সিআইবি সনদ পাওয়া গেলে তা জমা দিতে হবে নির্বাচন কমিশনে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্বাচনের সময় কাছাকাছি হলেও তেমন কোনো চাপ তাদের নেই। এখন পর্যন্ত তেমন কেউ ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আসেননি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কয়েকজন এলেও বিএনপি থেকে তেমন কোনো সাড়া পাননি বলে জানান এই কর্মকর্তা। মনোনয়ন পেলেই হয়তো ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আসতে পারেন বলে মনে করেন তিনি।

এই কর্মকর্তা বলেন, অনেকেই আছেন বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণ নিয়ে আর না দেয়ার পরিকল্পনা করেন। মনোনয়ন না পেলে শুধু ১০ কোটি টাকা খরচ করতে আগ্রহী নন কেউ। এ জন্যই হয়তো এখনো রাজনীতিবিদরা ঋণ নবায়ন করতে আসছেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here