ভুয়া ঋণপত্রে নজরদারীতে আইএফআইসির ডজনখানেক কর্মকর্তা

0
867

নিহাল হাসনাইন : ভ্যাট নিবন্ধন থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা সবই ভুয়া। অস্তিত্বহীন এ ধরনের দুই প্রতিষ্ঠানের নামে ১৭টি ঋণপত্র (এলসি) খুলেছে বেসরকারি আইএফআইসি ব্যাংক। এর মাধ্যমে পণ্য আমদানির নামে প্রতিষ্ঠান দুটিকে জালিয়াতির সুযোগ করে দিয়েছে ব্যাংকটি। জালিয়াতির এ ঘটনায় আইএফআইসি ব্যাংকের ডজনখানেক কর্মকর্তাকে নজরদারিতে রেখেছেন শুল্ক গোয়েন্দারা।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অনুসন্ধান বলছে, অনেক দিন ধরেই ব্যাংকটি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে এলসি খুলে জালিয়াতির সুযোগ দিয়ে আসছে। শুধু এগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি ও হেনান আনহুই এগ্রো নামে দুই প্রতিষ্ঠানকেই ৯০ কনটেইনার পণ্য আমদানিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জালিয়াতির সুযোগ করে দিয়েছেন আইএফআইসি ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এর বিনিময়ে ওইসব কর্মকর্তা পেয়েছেন মোটা অংকের কমিশন। সূত্র : বণিক বার্তা।

পণ্য আমদানির নামে এগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি ও হেনান আনহুই এগ্রো নামে দুই প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতির অনুসন্ধান শেষে গত সোমবার রাজধানীর পল্টন থানায় একটি মামলা করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। তাতে প্রতিষ্ঠান দুটির এ জালিয়াতিতে সহায়তাকারী হিসেবে আইএফআইসি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নাম এসেছে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, জালিয়াতির ঘটনায় আইএফআইসি ব্যাংক ও চট্টগ্রাম বন্দরের আরো অনেকে জড়িত থাকতে পারে। তদন্তকালে অন্য কারো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাও আমলে নেয়া হবে।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, এগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি ও হেনান আনহুই এগ্রোর স্বত্বাধিকারী আবদুল মোতালেব আইএফআইসি ব্যাংকের শান্তিনগর ও নয়াপল্টন শাখায় চলতি হিসাব খোলেন। পরে ব্যাংকটির নয়াপল্টন শাখা থেকে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য মোট ১৭টি এলসি উন্মুক্ত করেন।

ভুয়া ঠিকানা ও স্বাক্ষরে এলসি খোলায় তাকে সহায়তা করেন আইএফআইসি ব্যাংকের নয়াপল্টন শাখার ইনচার্জ নওশাদ উজ-জামান, ব্যাংক কর্মকর্তা মেহেদী হোসেন, আজিজা বেগম, রিজিভা আক্তার, আবুল কালাম আজাদ ও প্রিন্সিপাল অফিসার ফরহাদ হোসেন।

আইএফআইসি ব্যাংকের নয়া পল্টন শাখার কর্মকর্তাদের যোগসাজশে আবদুল মোতালেবের ব্যাংক হিসাব ও এলসি খোলার তথ্য উঠে এসেছে শুল্ক গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানেও। তারা বলছেন, অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংক হিসাবে ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ ব্যবসা করছিল প্রতিষ্ঠান দুটি। অর্থের বিনিময়ে এ কাজে সহায়তা করে আসছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ওই শাখার কর্মকর্তারা। তাদের সব তথ্য-প্রমাণও এরই মধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্র। তারা মূলত বিভিন্ন সময় ভুয়া নাম-ঠিকানা ও ছবি ব্যবহার করে আইএফআইসি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে এলসি করেন। চক্রটির সঙ্গে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাও জড়িত থাকতে পারেন। তাদের নির্দেশে ব্যাংকের শাখা থেকে প্রতিষ্ঠান দুটির নামে বিভিন্ন সময় এলসি খুলে নিষিদ্ধ পণ্য আমদানির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মইনুল খান এ প্রসঙ্গে বলেন, আইএফআইসি ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তার যোগসাজশে এ ঘটনা ঘটেছে, তাদের প্রত্যেকের গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। তাদের বিষয়ে সব ধরনের তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে। তথ্যগুলো যাচাই-বাছাইয়ের পর ওইসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইএফআইসি ব্যাংকের কমিউনিকেশন অ্যান্ড ব্র্যান্ডিং বিভাগের প্রধান মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মামলার বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এখনো অবগত নয়। তাই এখনই এ বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অনুসন্ধান অনুযায়ী, পোলট্রি ফিডের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঘোষণায় চীন থেকে আনা হেনান আনহুই এগ্রো ও এগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপির ১২টি কনটেইনার গত ৫ ও ৬ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে জব্দ করেন গোয়েন্দারা। কনটেইনারগুলো থেকে ১৬ হাজার ১৭০ বোতল মদ, ৩ কোটি ৮৪ লাখ শলাকা সিগারেট, ৪ হাজার ৭৪টি এলইডি টেলিভিশন ও ২৮১টি আমদানি নিষিদ্ধ পুরনো ফটোকপি মেশিন পাওয়া যায়। ১২টি কনটেইনারে আনা এসব পণ্যের ঘোষিত মূল্য ছিল ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু আটককৃত পণ্যের প্রকৃত মূল্য ৩৫ কোটি টাকা।

ঘটনায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বিজয় কুমার রায়ের করা মামলায় প্রতিষ্ঠান দুটি, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের স্বত্ব্বাধিকারীসহ মোট সাতজনকে আসামি করা হয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দারা বলছেন, এ ঘটনায় আইএফআইসি ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সরাসরি আসামি করা না হলেও নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তদন্তসাপেক্ষে তাদেরও মামলায় আসামি করা হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here