ডেস্ক রিপোর্ট : বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দরপতনের ঝুঁকিতে রয়েছে চট্টগ্রামের শেয়ারবাজার। গত ১৯ মার্চের পর ওই বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম যতটা বেড়েছিল, তা এক দিনেই কমে যেতে পারে। আর সেটি হলে বড় দরপতনে শেয়ারবাজারটির সূচক ও কোম্পানির দাম ফিরে যাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

এ কারণে চট্টগ্রামের বাজারের বিনিয়োগকারীরা শেয়ারের দামের বড় ধরনের পতনের আতঙ্কে রয়েছেন। শেয়ারের দামের সর্বনিম্ন মূল্যসীমা বা সার্কিট ব্রেকারের ভুল হিসাবের কারণে এ শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বা চট্টগ্রামের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত এই দরপতনের ঝুঁকি তৈরি করেছে শেয়ারের বেঁধে দেওয়া সর্বনিম্ন মূল্যস্তর বা ফ্লোর প্রাইস। সরকারের নির্দেশে গত ১৯ মার্চ পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এ মূল্যস্তর বেঁধে দেয়।

১৯ মার্চ থেকেই সেটি কার্যকর হয়। এর ফলে শেয়ারবাজারের কোনো কোম্পানির দাম নির্দিষ্ট একটি সীমার নিচে আর নামতে পারবে না। বেঁধে দেওয়া এ সর্বনিম্ন মূল্যস্তরের জন্যই চট্টগ্রামের বাজার বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ, চট্টগ্রামের বাজারে শেয়ারের দাম যতই বাড়ুক, এক দিনেই তা সর্বনিম্ন মূল্যস্তরে নেমে যেতে পারবে।

তালিকাভুক্ত কোম্পানির দিনের সর্বোচ্চ মূল্য ও সর্বনিম্ন ফ্লোর প্রাইসের মধ্যে আর কোনো দামের সীমা আরোপিত নেই। অথচ দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কোম্পানির শেয়ারের ফ্লোর প্রাইসের বাইরে আলাদাভাবে প্রতিদিনের জন্য দামের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করা থাকে। এ কারণে ঢাকার বাজারে কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম এক দিনে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বাড়তে বা কমতে পারবে। এর বেশি দরপতনের সুযোগ নেই ঢাকার বাজারে। কিন্তু চট্টগ্রামের বাজারে কোনো কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম এক দিনে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমার সুযোগ রয়েছে।

বিষয়টি একটু উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাক। সোমবার চট্টগ্রামের বাজারে গ্রামীণফোনের শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল ৩৩৫ টাকা। আর এটির সর্বনিম্ন মূল্যসীমা আরোপিত ছিল ২৩৮ টাকায়। সেই হিসাবে চট্টগ্রামের বাজারে গ্রামীণফোনের শেয়ারের দাম ৯৭ টাকা বা প্রায় ২৯ শতাংশ কমার সুযোগ ছিল। কারণ, সেখানকার বাজারে ফ্লোর প্রাইসই কোম্পানিটির শেয়ারের দামের সর্বনিম্ন সীমা। একইভাবে চট্টগ্রামের বাজারে সোমবার প্যারামাউন্ট ইনস্যুরেন্সের শেয়ারের দাম এক দিনেই ১৩২ টাকা থেকে ৭০ শতাংশ কমে ৩৯ টাকায় নেমে আসার সুযোগ ছিল, যেটি ছিল কোম্পানিটির ফ্লোর প্রাইস।

আবার নতুন তালিকাভুক্ত ওয়ালটনের শেয়ারের দাম যেকোনো দিন প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও মূল্যে নেমে যেতে পারে। কারণে সিএসইতে কোম্পানিটির শেয়ারের দামের সর্বনিম্ন সার্কিট ব্রেকার বা মূল্যসীমা রয়েছে ২৫২ টাকায়। যদিও সোমবার ওয়ালটনের শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল ৮৩২ টাকা।

১৯ মার্চের পর থেকে ডিএসই ও সিএসই ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রতিদিনের শেয়ারের দামের সর্বনিম্ন মূল্যসীমা হিসাব করে এলেও বিষয়টি এত দিনেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে আসেনি।

ঢাকার বাজারে ভিন্ন হিসাব

এবার দেখা যাক ঢাকার বাজারে উল্লেখিত তিনটি কোম্পানির ক্ষেত্রে কী ছিল সর্বনিম্ন দামের ব্যবধান। ঢাকার বাজারে সোমবার গ্রামীণফোনের শেয়ারের সর্বনিম্ন মূল্যসীমা ছিল ৩০৬ টাকা। আর প্যারামাউন্ট ইনস্যুরেন্সের সর্বনিম্ন মূল্যসীমা বা লোয়ার সার্কিট ব্রেকার ছিল ১৪৪ টাকায়।

একইভাবে ওয়ালটনের দিনের সর্বনিম্ন সার্কিট ব্রেকার ছিল ৭৬৮ টাকায়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির বেঁধে দেওয়া ফ্লোর প্রাইসের বাইরে ডিএসই প্রতিদিনই আলাদাভাবে প্রতিটি শেয়ারের জন্য সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল্যসীমা বেঁধে দেয়। এ কারণে সাধারণত এক দিনে কোনো শেয়ারের দাম ওই সীমার বেশি বাড়তে বা কমতে পারে না।

এদিকে গত কয়েক দিনে সিলেট, ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে একাধিক বিনিয়োগকারী টেলিফোনে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজারের মধ্যে বেশ কিছু কোম্পানির দামের তারতম্যের অভিযোগ করেন। বিনিয়োগকারীদের ওই উদ্বেগ প্রকাশের পর প্রথম আলোর পক্ষ থেকে গত কয়েক দিনে বিষয়টি নানাভাবে খতিয়ে দেখা হয়। তাতে চট্টগ্রামের বাজারে বড় ধরনের দরপতনের ঝুঁকির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।

কেন এ তারতম্য

১৯ মার্চ জারি করা বিএসইসি শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণসংক্রান্ত আদেশে বলা হয়েছিল, একটি কোম্পানির সর্বশেষ পাঁচ কার্যদিবসের (১৯ মার্চের আগের ৫ কার্যদিবস) সমাপনী মূল্যের গড়ই হবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস। আর এই ফ্লোর প্রাইসই হবে শেয়ারের দামের সর্বনিম্ন সীমা।

একই আদেশে আরও বলা হয়েছিল, শেয়ারের দামের ঊর্ধ্বসীমা বা আপার সার্কিট ব্রেকারসহ ২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর জারি করা এ–সংক্রান্ত বিএসইসির অপর আদেশটি অপরিবর্তিত থাকবে। কিন্তু সিএসই কর্তৃপক্ষ ফ্লোর প্রাইসকেই যেকোনো কোম্পানির সর্বনিম্ন মূল্যসীমা হিসেবে ব্যবহার করছে প্রতিদিন। এতেই বড় ধরনের দরপতনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গত মার্চে শেয়ারের দামের ফ্লোর প্রাইস বেঁধে দেওয়ার সময় এ কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বিএসইসির এমন কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফ্লোর প্রাইসকে শেয়ারের দামের প্রতিদিনের সর্বনিম্ন সার্কিট ব্রেকার হিসেবে ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। সিএসই যদি সেটি করে থাকে, তাহলে তা ভুল করছে।

সিএসইর সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বড় ধরনের পতন হলে বা কোনো শেয়ারের ক্রেতা না থাকলে সে ক্ষেত্রে হয়তো দাম সর্বনিম্ন সীমায়নেমে যেতে পারে। অন্যথায় সাধারণ বাজারে এ আশঙ্কা কম। তবে কেউ চাইলে খারাপ উদ্দেশ্যে তাৎক্ষণিকভাবে শেয়ারের দামের বড় পতন ঘটাতে পারবে।

এদিকে এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুন উর রশীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্টক এক্সচেঞ্জটির বাজার কার্যক্রমের (মার্কেট অপারেশনস) সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা বিএসইসির আদেশ মেনেই শেয়ারের দামের সর্বনিম্ন মূল্যস্তর নির্ধারণ করেছি।

তবে ওই কর্মকর্তা এই প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেন ফ্লোর প্রাইসকে সর্বনিম্ন মূল্যসীমা ধরার কারণে বড় ধরনের দরপতনের আশঙ্কা রয়েছে, এ কথা সত্য। তবে যেহেতু স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে প্রতিমুহূর্তের লেনদেন তদারকি করা হয় তাই ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ কোনো শেয়ারের দাম ফেলে দিতে চাইলে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

কোনটি ঠিক

ডিএসই-ও বলছে, তারা ফ্লোর প্রাইসের পাশাপাশি বিএসইসির নির্দেশনা মেনে প্রতিদিনের জন্য বিভিন্ন শেয়ারের দামের ওপর আলাদা সার্কিট ব্রেকার দিচ্ছে। আবার সিএসইও বলছে, তারা বিএসইসির আদেশ মেনেই ফ্লোর প্রাইসকে সর্বনিম্ন মূল্যসীমা নির্ধারণ করেছে। এ অবস্থায় তাই বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ডিএসই নাকি সিএসইর হিসাব—কোনটি ঠিক?

সার্কিট ব্রেকার কেন

নির্দিষ্ট একটি দিনে একটি শেয়ারের দাম ও সূচকের যাতে খুব বেশি উত্থান–পতন না ঘটতে পারে, সে জন্য প্রতিদিনই শেয়ারের দামের উত্থান–পতনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দাম বেঁধে দেওয়া হয়। বেঁধে দেওয়া দামের এ সীমা শেয়ারবাজারে সার্কিট ব্রেকার হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। বাজারের বড় ধরনের পতন রোধেই এ সার্কিট ব্রেকারের বিধান। কিন্তু ফ্লোর প্রাইসের বাইরে শেয়ারের দামের ক্ষেত্রে আলাদা কোনো সর্বনিম্ন সীমা না থাকায় বড় ধরনের পতনের সেই ঝুঁকিই তৈরি হলো।

বিএসইসির নিয়ম অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে যেসব কোম্পানির শেয়ারের বাজারমূল্য ২০০ টাকার কম, সেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম এক দিনে ১০ শতাংশ কমবেশি হতে পারে। আগের দিনের সমাপনী মূল্যের ওপর ভিত্তি করে উত্থান–পতনের এ সীমা নির্ধারিত হয়। আর ২০০ থেকে ৫০০ টাকা দামের শেয়ারের বাজারমূল্যের ব্যবধান হতে পারবে এক দিনে পৌনে ৯ শতাংশ।

৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা দামের ক্ষেত্রে এ সীমা সাড়ে ৭ শতাংশ। ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা দামের শেয়ারের ক্ষেত্রে এ সীমা সোয়া ৬ শতাংশ। ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার দামের ক্ষেত্রে এ সীমা ৫ শতাংশ। আর কোনো শেয়ারের বাজারমূল্য ৫ হাজার টাকার বেশি হলেও সেটির ক্ষেত্রে উত্থান–পতনের সীমা পৌনে ৪ শতাংশ।

জানতে চাইলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম গতকাল সোমবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, শেয়ারের দামের সর্বনিম্ন মূল্যস্তর বা ফ্লোর প্রাইসের নির্দেশনাটি দুই স্টক এক্সচেঞ্জের জন্য একই ছিল। তাই সেটির হিসাবের ক্ষেত্রেও দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মধ্যে ভিন্নতা থাকার কথা নয়। কিন্তু কেন দুই স্টক এক্সচেঞ্জে ভিন্নতা রয়েছে, সেটি খতিয়ে দেখা হবে। এ ক্ষেত্রে কারও কোনো ভুল থাকলে সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তথ্য সূত্র : প্রথম আলো

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here