ব্যাংক লুটের কারিগর!

2
2818

বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মো. শাহাবুদ্দিন আলম। ভাগ্যগুণে দেশের দুই ডজন ব্যাংক থেকে ঋণ পেয়েছেন। ব্যাংকগুলোও বাছবিচার ছাড়াই প্রায় জামানতবিহীন ঋণ দিয়েছে এ ব্যবসায়ীকে। ঋণের অর্থে তিনি গড়ে তুলেছেন দেড় ডজন কোম্পানি।

প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণের ভারে নিমজ্জিত এসএ গ্রুপের এ কর্ণধার এখন চূড়ান্ত উদ্যোগ নিয়েছেন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডোবানোর। যদিও তিনি নিজেই একটি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক এবং তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে শতাধিক মামলা রয়েছে পাওনাদার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের।

এসব মামলার বেশ কয়েকটিতে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। এমনকি দেশ ত্যাগের নিষেধাজ্ঞাও আছে এসএ গ্রুপের কর্ণধারের বিরুদ্ধে।

শাহাবুদ্দিন আলমের এসএ গ্রুপের অধীন অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান ‘সামান্নাজ ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রডাক্টস লিমিটেড’। ঋণের দায়ে নিমজ্জিত হয়ে কোম্পানিটি অবসায়ন বা বিলুপ্তির জন্য আদালতে আবেদন করেছেন তিনি। তবে এর বিরুদ্ধে আপিল করেছে ঋণদাতা অধিকাংশ ব্যাংক।

এসএ গ্রুপকে ঋণদাতা অধিকাংশ ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রত্যেকেই জানান, গ্রুপটিকে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকের বড় ধরনের ত্রুটি ছিল। নামমাত্র জামানত, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জামানত ছাড়াই শাহাবুদ্দিন আলম ঋণ পেয়েছেন। ঋণের এ অর্থ আদায়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ব্যাংকের নির্বাহীরা।

জানা গেছে, বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে এসএ গ্রুপের ঋণ রয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। গ্রুপটির কাছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ঋণের পরিমাণ ৪৮১ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ৪২৩ কোটি ও ব্যাংক এশিয়া সিডিএ শাখার ৩৩৮ কোটি টাকা। ব্যাংক এশিয়ার বড় অংকের এ ঋণের বিপরীতে জামানত রয়েছে নামমাত্র।

পর্যাপ্ত জামানত ছাড়া গ্রুপটিকে কেন ঋণ দেয়া হয়েছে— জানতে চাইলে ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী বলেন, আপনি ব্যাংকার না হয়েও আমাকে এ প্রশ্ন করছেন। অথচ ব্যাংকার হয়েও আমরা নিজেকে প্রশ্নটি করতে পারিনি। এসএ গ্রুপকে ঋণ দেয়া প্রতিটি ব্যাংকই বিপদে আছে। কোম্পানি অবসায়ন আবেদনের বিরুদ্ধে ব্যাংক এশিয়া আপিল করেছে। আপিল আদেশ আমাদের পক্ষে এসেছে।

এসএ গ্রুপের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ঋণের পরিমাণ ২২১ কোটি টাকা। এছাড়া গ্রুপটির কাছে জনতা ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ঋণের পরিমাণ ২০০ কোটি, রূপালী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ১৫১ কোটি, অগ্রণী ব্যাংক লালদীঘি শাখার ১১৮ কোটি ও কৃষি ব্যাংক ষোলশহর শাখার ১০০ কোটি টাকা। পূবালী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখারও ২৮৮ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে এসএ গ্রুপের কাছে।

এসএ গ্রুপের কাছে পূবালী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় এরই মধ্যে গ্রুপটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে জানান ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল হালিম চৌধুরী।

তিনি বলেন, গ্রুপটির কাছে ব্যাংকের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে জামানত রয়েছে মাত্র ২০-২৫ কোটি টাকার সম্পদ। এজন্য আদালতে কোম্পানি অবসায়নের আবেদনের বিরুদ্ধে পূবালী ব্যাংকের পক্ষে আপিল করা হয়েছে। আদালতের আদেশ পূবালী ব্যাংকের পক্ষে এসেছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখা এসএ গ্রুপকে ঋণ দিয়েছে সাড়ে ৫৩ কোটি টাকা। এছাড়া গ্রুপটিতে উত্তরা ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ঋণ রয়েছে ৫২ কোটি, প্রাইম লিজিংয়ের ৩৬ কোটি ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ১৪ কোটি টাকা। ঢাকা ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখারও ২৪৭ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে এসএ গ্রুপের কাছে।

এসএ গ্রুপকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা ছিল বলে জানান ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, এটা দুর্ভাগ্য যে, ব্যাংকিং খাতেরই একজন উদ্যোক্তা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করে কোম্পানি অবসায়নের জন্য আদালতে আবেদন করেছেন।

গ্রুপটির কাছে ঢাকা ব্যাংকের পাওনা প্রায় ২৫০ কোটি টাকা আদায়ে এরই মধ্যে মামলা করা হয়েছে। এসএ গ্রুপ কোম্পানি অবসায়নের যে আবেদন জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধেও আপিল করা হয়েছে। আপিল আদেশ ব্যাংকের পক্ষে এসেছে। কোম্পানিটির যে পরিমাণ ঋণ আছে, সে অনুপাতে সম্পদ নেই বললেই চলে। অবসায়ন হলে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হবে।

এসএ গ্রুপের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে কয়েক বছর ধরেই আইনি প্রক্রিয়া চালাচ্ছে ঋণদাতা অধিকাংশ ব্যাংক। এর মধ্যে ২০১৫ সালে কয়েকটি ব্যাংক থেকে ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধাও গ্রহণ করে গ্রুপটি। তবে নির্দিষ্ট সময় পরও প্রতিষ্ঠানটি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেনি। এতে আবারো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো আদালতের দ্বারস্থ হয়।

কয়েক বছরে এসএ গ্রুপের কর্ণধারদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে এ পর্যন্ত ১০০-এর বেশি মামলা দায়ের করেছে পাওনাদার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এগুলোর বেশির ভাগই চেক-সংক্রান্ত ও অর্থঋণ মামলা। এসব মামলার বেশ কয়েকটিতে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। এমনকি দেশ ত্যাগের নিষেধাজ্ঞাও আছে এসএ গ্রুপের কর্ণধারের বিরুদ্ধে।

২০১৫ সালে ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা পাওয়া ১১ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এসএ গ্রুপও রয়েছে। ওই সময় এসএ গ্রুপের এসএ অয়েল রিফাইনারি ও সামান্নাজের পক্ষে ৯২৮ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠন করে ছয়টি ব্যাংক।

এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৯৯ কোটি টাকা পুনর্গঠন করে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে কিস্তি পরিশোধের কথা থাকলেও আর কোনো অর্থই পরিশোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। ফলে বেশির ভাগ ব্যাংক আবারো আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। অনেক ব্যাংকের কাছে ঋণের বিপরীতে কোনো বন্ধকি সম্পত্তিও নেই।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ব্যবসার জন্য ঋণ নিলেও দীর্ঘদিনেও ঋণের টাকা ফেরত দেননি এসএ গ্রুপের কর্ণধার। এরই মধ্যে আমরা চেক-সংক্রান্ত ও অর্থঋণ মামলা দায়ের করেছি। একটি মামলায় প্রতিষ্ঠানটির দুই কর্ণধার শাহাবুদ্দিন আলম ও তার স্ত্রী ইয়াসমিন আলমের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু করেছেন আদালত। এ মামলায় শাহাবুদ্দিন জামিনে থাকলেও তার স্ত্রী পলাতক।

পাওনাদার ব্যাংকগুলোর ক্রমাগত চাপ ও আইনি ঝামেলায় পড়ে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার দায় এড়াতে নতুন কৌশল নিয়েছেন শাহাবুদ্দিন আলম। কোম্পানির অবস্থা ভালো না হওয়ায় সামান্নাজ ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রডাক্টস লিমিটেড অবসায়নের আবেদন করেছে।

কোম্পানি অবসায়নের আবেদন, ব্যাংকঋণ পরিশোধ ও ব্যবসার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে তিনদিন ধরে এসএ গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন আলমের সঙ্গে চেষ্টা করা হয়। এসব বিষয়ে তিনি তার বক্তব্য দেবেন বলেও দেননি। অবশেষে রাত ১১টার দিকে টেলিফোনে তার বক্তব্য পাওয়া যায়।

কোম্পানি অবসায়নের আবেদনের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর অসহযোগিতার কারণেই সামান্নাজ ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রডাক্টস লিমিটেডকে অবসায়নের জন্য আদালতে আবেদন করেছি। কোম্পানির বিলুপ্তির জন্য পৃথিবীব্যাপী এটি স্বীকৃত পন্থা। এখন এটি আদালতের বিষয়। আমি এ নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না। আমার কাছে ব্যাংকগুলো যে অর্থ দাবি করছে, তা সুদের টাকা।

কিছু ব্যাংক ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের শিল্প ধ্বংস করছে বলেও অভিযোগ করেন শাহাবুদ্দিন আলম। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর অন্যায়, অবিচার ও জুলুমের শিকার হয়ে বাংলাদেশের শিল্পগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমি পরিশ্রম করে ১৮টি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলেছি। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছি। এক টাকাও বিদেশে পাচার করিনি। বৈষয়িক ও দেশের ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে এসএ গ্রুপের ভোজ্যতেলের কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমার কনডেন্সড মিল্ক, পেপার ইন্ডাস্ট্রি, ট্যানারিসহ অন্য ইন্ডাস্ট্রিগুলো ভালোভাবেই চলছে।

এসএ গ্রুপের কর্ণধার শাহাবুদ্দিন আলমকে শৈশব থেকেই চেনেন এমন একজন ব্যাংকার বলেন, ব্যবসায়িক শৃঙ্খলার অভাবে শাহাবুদ্দিন আলম সব শেষ করে দিয়েছেন। ব্যাংকের টাকা সঠিক খাতে ব্যয় না করে জমি কেনা, বাড়ি তৈরি ও ভোগ-বিলাসে উড়িয়েছেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামে তার বিপুল পরিমাণ জমি, বহুতল ভবন, বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। এ সম্পদের বড় অংশই ব্যাংকের জামানতের বাইরে। শাহাবুদ্দিন আলম নিজে ডুবেছেন, ব্যাংকারদেরও ডুবিয়েছেন।

চট্টগ্রাম নগরীর অভিজাত এলাকার খুলশীতে চার একর জমিতে শাহাবুদ্দিনের বর্তমান বাড়ি। তার আত্মীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, খুলশীতে চার একর জমিতে অবস্থিত এ প্রাসাদ কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকার সম্পত্তি। ইপিজেড এলাকায় রয়েছে তাদের পুরনো বাড়ি।

2 COMMENTS

  1. A good news report indeed. But without direct help and blessings of concerned authorities like Banking Division of Finance Ministry, Bangladesh Bank and Duduk how he can continue these misdeeds unabetedly for such a long time ? That is why a highly proficient Chartered Accountant like Saifur Rahman have repeatedly refused to give wholesale permission to set up banks ignoring high pressure from his own party’s stalwarts.

Tawfik Sattar শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন Cancel reply

Please enter your comment!
Please enter your name here