ব্যাংকের সুদহার নিয়ে নয়ছয়

0
436

বিশেষ প্রতিনিধি : বিশেষ বিশেষ সুবিধা নিয়ে, নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েও দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোতে সুদহারের নৈরাজ্য এখনো কাটেনি। সর্বশেষ গত বছরের আগস্ট মাসের শুরুতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে বৈঠক করে গত ৯ আগস্ট থেকে সব ধরনের ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয় ব্যাংকের মালিক ও প্রধান নির্বাহীরা।

দ্বিতীয় দফায় দেয়া প্রতিশ্রুতির পর টানা কয়েক মাস কমলেও নভেম্বরে এসে আবার বেড়েছে। ব্যাংক সুদের হার নয়-ছয় যেন কাগজেই থেকে গেল। একই সঙ্গে বেশি মুনাফা করতে স্প্রেড নির্ধারণেও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে এসব ব্যাংক। অথচ স্প্রেডহার ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশনা আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। মূলত আমানতের সুদহার বৃদ্ধির প্রভাবে ঋণের সুদহারও বেড়েছে। নতুন বছরে সুদহার আরও বাড়তে পারে বলে আভাস দেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত নভেম্বরে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো গড়ে ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। আর সরকারি ব্যাংকগুলো সুদ নিয়েছে গড়ে ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আগের মাস অক্টোবরে বেসরকারি ব্যাংকে ঋণের গড় সুদহার ছিল ১০ দশমিক ২২ শতাংশ। সরকারি ব্যাংকে ছিল ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ শতাংশের ওপরে সুদহার রেখেছে ২৮টি ব্যাংক। আর ৯ শতাংশের ওপরের সুদহার এমন ব্যাংকের সংখ্যা ১২টি। ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান। ঋণ বিতরণে তার ব্যাংকই কথা রাখেনি, সুদ নিচ্ছে ১০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। আর স্প্রেড (আমানত গ্রহণ ও ঋণ বিতরণে সুদহারের মধ্যে পার্থক্য) ৫ শতাংশকে ছাড়িয়েছে ১৩ বাণিজ্যিক ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংক ঋণ বিতরণ করে ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ হারে, দি সিটি ব্যাংক বিতরণ করে ১০ দশমিক ১৬ শতাংশ, আইসিবি ব্যাংক বিতরণ করে ১০ দশমিক ৩৩ শতাংশ, সীমান্ত ব্যাংক বিতরণ করে ১১ দশমিক ৫৫ শতাংশ, ইস্টার্ন ব্যাংক বিতরণ করে ১০ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং এনসিসি ব্যাংক বিতরণ করে ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ হারে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যাংকগুলোর আমানতে সুদহার কমলেও সঞ্চয়পত্রের হার অপরিবর্তিত থাকায় গ্রাহকরা এখন ব্যাংকের তুলনায় সঞ্চয়পত্রে টাকা রাখছে বেশি। এতে করে আশানুরূপ আমানত পাচ্ছে না অধিকাংশ ব্যাংক। নির্বাচনের আগে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণে বিভিন্ন পক্ষের চাপ থাকলেও পরে থাকবে না, এমন ধারণা বাজারে রয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকে তারল্যের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

সুদহার বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ইব্রাহীম খালেদ বলেন, সরকার বিএবির বিভিন্ন দাবি মেনে নিয়েছে। তারপরও কেন সুদহার কমানো হলো না, এটা অর্থনীতির জন্য খুব খারাপ। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি দরকার।

বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের নেতা ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহাবুবুর রহমান। এমডিদের নেতার ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের সুদহার ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের বিতরণ করে ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ, ডাচ-বাংলা ব্যাংক বিতরণ করে ১০ শতাংশ, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সুদহার ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ওয়ান ব্যাংকের বিতরণ ঋণের সুদহার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সুদহার ১০ দশমিক ৩৩ শতাংশ, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১১ দশমিক ১৪ ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের সুদহার ১১ দশমিক ৫০, ব্যাংক এশিয়া ১০ শতাংশ, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ, যমুনা ব্যাংকের ১০ দশমিক ৪৮ ব্যাংক ১২ দশমিক ২৯, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ১২ দশমিক ৮৯ শতাংশ, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচারাল ব্যাংক ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ, মেঘনা ব্যাংকের ১১ দশমিক ৯৪ শতাংশ, মিডল্যান্ড ব্যাংকের ১২ দশমিক ১ শতাংশ, ফারমার্স ব্যাংক বিতরণ করে ১২ দশমিক ৩৮ শতাংশ, ইউনিয়ন ব্যাংকের ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ, এনআরবি ব্যাংক ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ১৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ, মধুমতি ব্যাংক বিতরণ করে ১২ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং ব্যাংক মালিকদের নেতা নজরুল ইসলাম মজুমদারের এক্সিম ব্যাংকের বিতরণ ঋণের সুদহার ১০ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের শুরু থেকেই ঋণ বিতরণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ব্যাংক এমডিরা। উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, সুদহার বেশি হওয়ার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন।

২০২১ সাল নাগাদ দেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্য আছে তা বাস্তবায়ন করতে হলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। আর বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে ব্যাংক ঋণের সুদহার কমিয়ে আনতে হবে। দেশে বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করতে সরকার কম সুদের আমানত পাওয়ার ব্যবস্থা করে। আগে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত ২৫ শতাংশ পেত, বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করে।

ঋণ বিতরণের জন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলো বাড়তি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পেয়ে যায়। ব্যাংকগুলোর বিধিবদ্ধ জমার হার কমিয়ে আনা হয়। এর ফলে আমানত সংগ্রহ করে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করত তার পরিমাণ বেড়ে যায়। বেড়ে যায় ঋণ বিতরণযোগ্য টাকার পরিমাণও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here