পণ্য আমদানির মিথ্যা ঘোষণায় পাচার হচ্ছে টাকা : সিপিডির সন্দেহ

0
107

সিনিয়র রিপোর্টার : কয়েক বছর ধরে দেশের আমদানি ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। দেশে পণ্য আমদানির নামে বিদেশে অর্থ পাচার করা হচ্ছে। আমদানির নামে বিভিন্ন প্রকারের মিথ্যা ঘোষণায় পাচার হচ্ছে এই টাকা। ‘বাংলাদেশের উন্নয়নে স্বাধীন পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে গতকাল এসব কথা বলেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

দেশের আমদানি ব্যয় বাড়াকে ‘যথেষ্ট সন্দেহজনক’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। মহাখালির ব্র্যাক সেন্টারে গতকাল রবিবার দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ইদানিং আমাদের সামগ্রিক বাণিজ্যিক লেনদেনের ঘাটতি বেড়েছে। একইসঙ্গে চলতি হিসাবেও বৈদেশিক লেনদেনে ঘাটতি বেড়েছে।

রপ্তানি, রেমিটেন্স ও বৈদেশিক সাহায্য বাড়লেও ঘাটতি থাকছে। এরপর বড় কারণ হলো আমদানি। রেমিটেন্স, রপ্তানি ১৭ দশমিক ৪ ও ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে আমদানি ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এটা এক প্রকার ছাদ ফুড়ে চলে যাওয়ার মতো।

সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০১৭-১৮’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিডিপির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন সিডিপির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, সিনিয়র গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। অনুষ্ঠানে তারা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বিভিন্ন দিক ছাড়াও দেশের ব্যাংকিং খাত, পুঁজিবাজার, মুদ্রানীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যনীতিও তুলে ধরেন।

দেবপ্রিয় বলেন, আমরা আগেই বলেছি, আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং যদি পর্যবেক্ষণ না করা হয়, তাহলে বাংলাদেশে অর্থনীতি সম্পর্কে বিকৃত চিত্র উপস্থাপন করা হবে, তা না। লেনদেন ঘাটতি হবে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস- টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। আমদানির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকারের মিথ্যা ঘোষণায়। এটি যেকোনো নির্বাচনের আগে বাড়ে এবং আমরা বার বার এটা জানিয়েছি।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরো বলেন, বৈদেশিক লেনদেনের মধ্যে যদি আমরা আসি, আমরা প্রথমেই বলেছি আর্থিক খাতের লেনদেন উদ্বেগজনক থাকলেও তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কিন্তু বৈদেশিক লেনদেনের পরিস্থিতি খুব আশঙ্কাজনক অবস্থায়। এটার ফলে টাকার মূল্যমান বাড়তে থাকবে। এতে রপ্তানিকারকরা একটু খুশি হবেন কিন্তু দেশে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশে এক কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করতে কত টাকা ব্যয় হয়, সেটা আমাদের জানা আছে। যেটা নিউইয়র্কের চেয়েও অনেক বেশি ব্যয়। বাংলাদেশে আরও বড় বড় ৩-৪টা মেগা প্রকল্প চলছে, তার ব্যয় বিশে¬ষণ করলেও একই তথ্য পাওয়া যাবে।

দেশের উন্নয়ন ব্যয় নিয়ে তিনি বলেন, আমরা যতটা না উন্নয়ন ব্যয় নিয়ে চিন্তিত থাকি, তার চেয়ে বেশি চিন্তার বিষয়- এর গুণমান সম্পর্কিত। যে ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে- তা দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়নের ফলে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দেবপ্রিয় বলেন, দেশের ব্যাংকিংখাত, পুঁজিবাজার খুবই বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে রয়েছে। বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের জন্য স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করতে হবে। রোগের চিকিৎসা করার পরিবর্তে উপসর্গের পেছনে দৌড়াচ্ছি।

ব্যাংক খাতে যে তারল্য-সংকটের কথা বলা হচ্ছে, আসলে তো রোগ নয়। সমস্যা এটি নয়। সমস্যা হলো- সুশাসনের অভাব। তিনি বলেন, ব্যাংকব্যবস্থার দেখভাল করার কথা বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের। তারাই নষ্টভ্রষ্টদের জন্য কাজ করছে। প্রথমেই রাজনৈতিক অর্থনীতির শৃঙ্খলা আনতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ টাকা উন্নীত করার সুপারিশ করেছে। বর্তমান আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক করমুক্ত থাকে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি করার তাগিদ দিয়েছে গবেষণা সংস্থাটি।

এ ছাড়া সর্বনিম্ন করহার ১০ শতাংশ থেকে নামিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সিপিডি বলেছে, তাড়াহুড়া করে করপোরেট করহার কমানো ঠিক হবে না। করপোরেট কর কমালে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে, এটা ঠিক নয়। সার্বিকভাবে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হলেই বিনিয়োগ বাড়বে। সার্বিকভাবে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থাকবে ৫০ হাজার কোটি টাকা।

রাজস্ব খাত সম্পর্কে সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচনের বছরে রাজস্ব খাতে জোরালো সংস্কার হবে না। বিগত বছরগুলোতেও বড় ধরনের সংস্কার হয়নি। মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট, আয়কর ও শুল্ক এই তিন নতুন আইন হওয়ার কথা। তবে এবার না হলেও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, ভ্যাট আইনটি বাস্তবায়নের শেষ সময়ে এসে বলা হয়েছিল, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব আছে।

সামষ্টিক অর্থনীতির চারটি খাতে ঝুঁকি ও দুর্বলতা আছে বলে মনে করে সিপিডি। এগুলো হলো আর্থিক ও বাজেট কাঠামো, মুদ্রানীতি ও ব্যাংক খাতের পারফরম্যান্স, শেয়ারবাজার ও বৈদেশিক লেনদেন পারফরম্যান্স।

সিপিডি আরও বলছে, বাজেট বড়, এটা বলা হচ্ছে না। এবারের বাজেটে মাথাপিছু বরাদ্দ ৩০ হাজার টাকা। বাংলাদেশের মতো অর্থনীতিতে এই সংখ্যা বড় নয়। বাস্তবতার নিরিখে বাজেট প্রণয়ন করা উচিত।

সিপিডি আরও বলছে, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হলেও কর্মসংস্থান বাড়ছে না। কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি কমছে। আঞ্চলিক বৈষম্যও বাড়ছে। খুলনা ও বরিশালের কিছু এলাকায় দারিদ্র্য বাড়ছে। রংপুর এলাকায় দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।

কালোটাকা প্রসঙ্গে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, আমরা কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া সমর্থন করিনা। এতে সৎ করদাতাদের ওপর অন্যায় করা হয়। সুযোগ দিলেও খুব বেশি টাকা ঘোষণায় আসে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here