ডেস্ক রিপোর্ট : বিদায়ী বছরে ব্যাংকিং খাতের পরিচালন মুনাফায় বড় ধরনের উল্লম্ফন হয়েছে। বছরটিতে দেশের সিংহভাগ সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বেড়েছে। ভালো পরিচালন মুনাফা পেয়েছে সমালোচনার মুখে থাকা নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলোও।

ব্যাংকগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বরাবরের মতো এবারো পরিচালন মুনাফায় শীর্ষে রয়েছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক। মুনাফায় ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে— পূবালী, ব্র্যাক, ডাচ্-বাংলা, সাইথইস্ট, মার্কেন্টাইল, ট্রাস্ট, এক্সিম, আল-আরাফাহ্, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ওয়ান, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ব্যাংক এশিয়া, এনসিসি, ইস্টার্নসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের। তবে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), দ্য সিটিসহ কয়েকটি ব্যাংকের মুনাফা গত বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে।

বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি ভালো পরিচালন মুনাফা করতে সক্ষম হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও। লুটপাটের শিকার রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক ও বিপর্যস্ত ফারমার্স ব্যাংকও পরিচালন মুনাফা পেয়েছে।

আয় থেকে ব্যয় বাদ দিয়ে যে মুনাফা থাকে, সেটিই কোনো ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা। পরিচালন মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) এবং সরকারকে কর প্রদান করতে হয়। প্রভিশন ও কর-পরবর্তী এ মুনাফাই হলো একটি ব্যাংকের প্রকৃত বা নিট মুনাফা।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল শেষে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড ২ হাজার ৪২০ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে। এর আগে ২০১৬ সালে ব্যাংকটি ১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করে। এ হিসাবে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ।

বিদায়ী বছরে ন্যাশনাল ব্যাংক ১ হাজার ২১৮ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। ২০১৬ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ১ হাজার ৮১ কোটি টাকা। ভালো পরিচালন মুনাফা পেয়েছে বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংকও। ব্যাংকটি ২০১৭ সালে ৯১৫ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। যদিও ২০১৬ সালে ব্যাংকটি ৬৭৩ কোটি ও ২০১৫ সালে ৭৮০ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফায় ছিল।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল হালিম চৌধুরী বলেন, প্রথম প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে পূবালী সবসময়ই কমপ্লায়েন্ট ব্যাংক হিসেবে কাজ করেছে। আমরা সবসময়ই স্থিতিশীল বিনিয়োগে বিশ্বাসী। কর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় আমরা ভালো ফল পেয়েছি।

বিদায়ী বছরে ৯০১ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে সাইথইস্ট ব্যাংক। ২০১৬ সালে ৮৫০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফায় ছিল ব্যাংকটি। গ্রাহকদের আস্থা, বিশ্বাস ও ভালোবাসাই সাউথইস্ট ব্যাংকের পুঁজি উল্লেখ করেন ব্যাংকেটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে ব্যাংকগুলোকে নতুন নতুন ধারণা নিয়ে ব্যাংকিং করতে হবে। আমরা নতুনত্বের পথেই হাঁটছি।

প্রত্যাশার চেয়েও গত দুই বছর ভালো পরিচালন মুনাফা করেছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। বিদায়ী বছরে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৭১১ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৪৪৯ কোটি টাকা।

ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মসিহুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, কয়েক বছর ধরে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ধারাবাহিক মুনাফা প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ভালো মুনাফার মাধ্যমে ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। আশা করছি, ভবিষ্যতেও মার্কেন্টাইল ব্যাংক দেশের সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

২০১৬ সালে বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়ার পরিচালন মুনাফা কমলেও বিদায়ী বছরে ভালো করেছে। ২০১৭ সালে ব্যাংকটি পরিচালন মুনাফা করেছে ৬৯৫ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে ৬১৮ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফায় ছিল ব্যাংক এশিয়া।

বিদায়ী বছরে ভালো পরিচালন মুনাফা করেছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকও। ২০১৬ সালে ব্যাংকটি ৫৫২ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলেও বিদায়ী বছরে তা ৭৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

পরিচালন মুনাফায় ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকেরও। ২০১৭ সালে ৮০৯ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে ব্যাংকটি। ২০১৬ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৭৫৭ কোটি টাকা। ইসলামী ধারার এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ (এক্সিম) ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফায়ও প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১৭ সালে এক্সিম ব্যাংক ৭১১ কোটি ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ৪৭৫ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে। ২০১৬ সালে ব্যাংক দুটির পরিচালন মুনাফা ছিল যথাক্রমে ৫৯৪ কোটি ও ৩৭২ কোটি টাকা।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ ওয়াসেক মো. আলী বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ফার্স্ট সিকিউরিটি ধারাবাহিকভাবে ভালো করছে। মুনাফায় প্রবৃদ্ধি ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। আশা করছি, ২০১৮ সালে ব্যাংকটি আরো ভালো করবে।

ধারাবাহিক মুনাফা প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে ট্রাস্ট ব্যাংক। ব্যাংকটি ২০১৭ সালে ৬৩০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। এর আগে ২০১৬ সালে ট্রাস্ট ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল ৫০১ কোটি টাকা।

পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংকটি শতভাগ কমপ্লায়েন্ট দাবি করে ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরী বলেন, কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই আমানত ও ঋণপণ্যে বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে ট্রাস্ট আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কাজ করে যাচ্ছে। মুনাফার এ ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে।

বিদায়ী বছরে বেসরকারি ইস্টার্ন ব্যাংক ৭৫০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। ২০১৬ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৬৪১ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে ৭৭৭ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলেও বিদায়ী বছরে তা ৬৯০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে দ্য সিটি ব্যাংকের। ২০১৫ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৬৬৭ কোটি টাকা। ভালো মুনাফা প্রবৃদ্ধি হয়েছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকেরও। ২০১৭ সালে ৪১৭ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে ব্যাংকটি। ২০১৬ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৩৪০ কোটি টাকা।

সম্প্রতি অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন বেসরকারি দ্য সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসাইন। বিদায়ী বছরে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম মূল্যায়ন ও নতুন বছরে প্রত্যাশা বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের জন্য এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আর্থিক সুশাসন নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের আস্থা যেন না হারায়, সেটিও দেখতে হবে।

তিনি বলেন, নির্বাচনী বছর হিসেবে ২০১৮ সালে ব্যাংকিং খাতসহ পুরো অর্থনীতির জন্য অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ থাকবে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় এ মুহূর্তে তারল্য সংকট রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে ঋণপ্রবাহ অনেক বেশি থাকলেও সে হারে আমানত আসছে না। এ কারণে নতুন বছর ব্যাংকের স্প্রেড বাড়তে পারে।

২০১৭ সালে ৫৫০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে বেসরকারি খাতের ওয়ান ব্যাংক লিমিটেড। ২০১৫ সালে ব্যাংকটির এ মুনাফার পরিমাণ ছিল ৪৩৯ কোটি টাকা। এছাড়া ২০১৭ সালে ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংক ৫৩৫ কোটি ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ৩৬০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। ২০১৬ সালে ব্যাংক দুটির পরিচালন মুনাফা ছিল যথাক্রমে ৪৭০ কোটি ও ৩২২ কোটি টাকা।

তবে প্রত্যাশার চেয়েও খারাপ করেছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)। ২০১৬ সালে ৭৬৫ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলেও বিদায়ী বছরে তা ৫৬০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

নতুন ব্যাংকগুলোও ২০১৬ সালে উল্লেখযোগ্য পরিচালন মুনাফা করতে সমর্থ হয়েছে। নতুন নয়টি ব্যাংকের মধ্যে বিদায়ী বছরে সবচেয়ে বেশি ২৩০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে ইউনিয়ন ব্যাংক। সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক ১৮২ কোটি, মধুমতি ১৫১ কোটি ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ১৬১ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে।

২০১৬ সালে ব্যাংক তিনটির পরিচালন মুনাফা ছিল যথাক্রমে— ১৫৪ কোটি, ৯২ কোটি ও ৬০ কোটি টাকা। এছাড়া মেঘনা ব্যাংক ১১০ কোটি ও মিডল্যান্ড ব্যাংক ১২০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। বিপর্যয় সত্ত্বেও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ২০১৭ সালে ২০১ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। ২০১৬ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ১৭২ কোটি টাকা। বিপর্যস্ত ফারমার্স ব্যাংক ১০ কোটি টাকার বেশি পরিচালন মুনাফা করেছে বলে জানা গেছে। তবে ব্যাংকটি নিট মুনাফার হিসাবে লোকসানে থাকবে।

বিদায়ী বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও তুলনামূলক ভালো করেছে। দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে। ব্যাংকটির এমডি মো. ওবায়েদ উল্লাহ্ আল্ মাসুদ বলেন, ২০১৬ সালের আগস্টে এমডি হিসেবে যোগদানের সময় সোনালী ব্যাংকের লোকসান ছিল ৫০০ কোটি টাকা। এরপর ডিসেম্বর শেষে ৪২৩ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফায় তুলে আনা হয়েছিল। ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রেখে ২০১৭ সালে ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছি। ভবিষ্যতে সোনালী ব্যাংক আরো শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারবে।

বিদায়ী বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক ৯৬২ কোটি ও রূপালী ব্যাংক ৫১১ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। জনতা ব্যাংকও ১ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিচালন মুনাফা করেছে বলে জানা গেছে।

লুটপাটের শিকার বেসিক ব্যাংক ২০১৬ সালে ১৫ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করে। চলতি বছর ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ৫০ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) ১০০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। ২০১৬ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৬৫ কোটি টাকা।

২০১৬ সালে ৮৮ কোটি টাকা লোকসান দেয়া রূপালী ব্যাংকের বড় অংকের পরিচালন মুনাফা প্রসঙ্গে ব্যাংকটির এমডি আতাউর রহমান প্রধান বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রূপালী ব্যাংক আর্থিক বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আর্থিক যে ভিত তৈরি হয়েছে, তার ওপর দাঁড়িয়ে রূপালী ব্যাংক ভবিষ্যতে আরো ভালো করবে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here