ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাংলাদেশের কারখানা বন্ধ করছে জিএসকে

0
5315

ডেস্ক রিপোর্ট : প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমতে থাকায় বাংলাদেশে ওষুধ কারখানা বন্ধের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন বাংলাদেশ লিমিটেড (জিএসকে বিডি)। এ বছরের মধ্যেই ফৌজদারহাটে জিএসকের প্লান্টটি বন্ধের পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত। এখন পর্ষদ সভায় সিদ্ধান্ত ও ঘোষণার অপেক্ষা। এ মাসের শেষ দিকে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় পর্ষদ সভায় এ সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বৈশ্বিক নীতির অংশ হিসেবেই এ পরিকল্পনা বলে কোম্পানির একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, মানবসম্পদে কোম্পানির বিনিয়োগ প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেক বেশি। সেই সঙ্গে কঠোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জিএসকের উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছে। বিক্রি ও বাজার শেয়ার যথেষ্ট বাড়াতে না পারলে এগুলো যেকোনো ব্যবসাকেই চাপে ফেলতে বাধ্য। জিএসকের জন্য এখন বাংলাদেশে ওষুধের বিক্রি ও বাজার শেয়ার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয়ভাবে ওষুধ উৎপাদন অব্যাহত রাখা হবে কিনা, তা নিয়ে কোম্পানির নীতিনির্ধারকদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব চলছে।

চলতি মাসের শেষ দিকে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় কোম্পানির পর্ষদ সভায় স্থানীয় উৎপাদন বন্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যেতে পারে বলেও জানান ওই কর্মকর্তারা। তারা বলেন, উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে কোম্পানির কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যাবে এমন নয়। জিএসকের আমদানিকৃত কিছু ওষুধের ভালো চাহিদা আছে দেশের বাজারে। এগুলোর জন্যও কার্যক্রম চালু রাখার সম্ভাবনা আছে।

এ বছরের মধ্যে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটের উৎপাদন কারখানাটি বন্ধের পরিকল্পনাও নিশ্চিত করেছেন কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা। কার্যক্রম বন্ধ হলে কারখানার প্রায় ২০০ কর্মী কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবেন, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এজন্য বিভিন্ন বিভাগের কর্মীদের নিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা চাকরি হারাতে যাওয়া কর্মীদের পক্ষ থেকে কোম্পানির সঙ্গে দর কষাকষি করছেন।

কমিটির একজন সদস্য বলেন, ২২ অথবা ২৬ জুলাই এ বিষয়ে ঢাকায় কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক হবে। বৈঠকে দেশীয় কর্মকর্তারা ছাড়াও কর্মী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিদেশী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আলোচনা করবেন। এর পরই জিএসকের বাংলাদেশের কার্যক্রম বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

কোম্পানি ও খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক ওষুধ জায়ান্ট গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের বৈশ্বিক পোর্টফোলিওতে ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত বিভিন্ন পণ্যের আধিপত্য। তবে ভারতীয় উপমহাদেশে চিত্রটি পুরোই উল্টো।

গত চার বছরের বিক্রয় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, জিএসকে বিডির বিক্রি এক জায়গাতেই আটকে আছে। ২০১৪ সালে কোম্পানিটির বিক্রি ছিল ৭১৮ কোটি টাকার বেশি। এরপর টানা দুই বছর তা কমে ৬২৮ কোটির ঘরে নেমে আসে। নানামুখী প্রচেষ্টায় গত বছর বিক্রি বাড়তে শুরু করলেও তা ৬৮০ কোটি টাকা ছাড়ায়নি।

বাংলাদেশে তাদের বার্ষিক বিক্রির ৭০ শতাংশের বেশি হেলথ ফুড ড্রিংকস হরলিকসের অবদান। বাল্কে আমদানি করা এ পণ্যে এখন তাদের বাজার শেয়ার ৯২ শতাংশেরও বেশি। ব্যবসার প্রবৃদ্ধিও মন্দ নয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, জিএসকে হেডকোয়ার্টার সেনসোডাইন উৎপাদক জয়েন্ট ভেঞ্চারের অবশিষ্ট ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ার তাদের অংশীদার নোভারটিসের কাছ থেকে কিনে নিতে প্রায় ৯২০ কোটি পাউন্ডের তহবিল প্রস্তুত করছে। এ অর্থ জোগাতে হরলিকসসহ অন্যান্য হেলথ ফুড ড্রিংকস পণ্যের স্বত্ব বিক্রি করে দেয়ার চেষ্টা করছে। ডিসেম্বরের আগেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চায় তারা।

বৈশ্বিক পরিসরে হেলথ ফুড ড্রিংকস ব্যবসা বিক্রি হয়ে গেলে, বাংলাদেশে জিএসকের রাজস্বের মূল উৎসটিই হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। তখন ঢাকার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা হিসেবে অবশিষ্ট থাকবে বিভিন্ন ক্যাটাগরির ফার্মা পণ্য, গ্লুকোজ ব্র্যান্ড গ্ল্যাক্সোজ ও সেনসোডাইন টুথপেস্ট। সব মিলিয়ে তা জিএসকে বিডির বর্তমান বিক্রির এক-তৃতীয়াংশও নয়।

সর্বশেষ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওষুধ ছাড়া বাকি দুটি পণ্যে কোম্পানির মার্কেট শেয়ার ও প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক হলেও ভলিউম বিবেচনায় তা যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে উৎপাদনসহায়ক নীতি, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় ২০৩২ সাল পর্যন্ত ওষুধের স্বত্ব পরিপালনে ছাড়সহ নানা কারণে স্থানীয় ওষুধ শিল্পের লক্ষণীয় উত্থানে বাংলাদেশে ওষুধের বাজারেও হিমশিম খাচ্ছে জিএসকে। তাদের ওষুধের মান ভালো হলেও এর উৎপাদন ব্যয় প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেক বেশি।

জিএসকে বিডির ওষুধ বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত বছর কোম্পানির ফার্মা ব্যবসায় ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও এর মুনাফা মার্জিন নিয়ে হেডকোয়ার্টার খুবই হতাশ। চীনে বিক্রি বাড়াতে অনৈতিক কৌশল নেয়ার ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর গত কয়েক বছরে জিএসকে তাদের বিপণনচর্চায় আমূল পরিবর্তন এনেছে, যা বাংলাদেশের মতো বাজারগুলোয় ওষুধ বিক্রি বাড়ানো প্রায় অসম্ভব করে দিয়েছে।

নৈতিকতার বিষয়ে বহুজাতিক কোম্পানিটি এখন এমন কঠোর অবস্থান নিয়েছে যে, আমাদের ওষুধ বিক্রয়কর্মীরা কোনো ফিজিশিয়ান স্যাম্পলও বিতরণ করতে পারেন না। একই সঙ্গে বিক্রয়কর্মীদের মাসিক টার্গেটও তুলে দেয়া হয়েছে। বাস্তবতা হলো, তিন বছর ধরে ফার্মা ব্যবসা থেকে আমরা কোম্পানিকে মুনাফা দিতে পারছি না।

কারখানা বন্ধের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত জিএসকে বিডির শেয়ারহোল্ডারদের কেউ কেউ। ঢাকায় তাদের অনেকে বলেন, কোম্পানির কাছ থেকে কিছু জানা না গেলেও বিভিন্ন সূত্রে খবর আসছে, বাংলাদেশে জিএসকের মূল ব্যবসা হরলিকস বিক্রি হয়ে যেতে পারে। রেভিনিউর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎস ফার্মার মুনাফা মার্জিন ভালো নয়। উৎপাদন বন্ধ করে শুধু আমদানিনির্ভর ওষুধ নিয়ে কোম্পানি আগামীতে কতদূর যেতে পারবে, এটিও প্রশ্নসাপেক্ষ। অন্যান্য পণ্যের যে ভলিউম, তা শেয়ারহোল্ডারদের লাভবান করার জন্য যথেষ্ট নয়। তার পরও আমরা আশা করব, বহুজাতিক কোম্পানিটির ম্যানেজমেন্ট যে সিদ্ধান্তই নিক, তাতে শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সমুন্নত থাকবে।

২০১৭ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, জিএসকে বিডির প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের মালিক যুক্তরাজ্যভিত্তিক সেটফার্স্ট লিমিটেড। সরকারের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের হাতে ১৩ শতাংশ, স্থানীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের হাতে ২, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ২ ও বাকি ১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সাধারণ বীমা করপোরেশনের হাতে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সর্বশেষ ১ হাজার ৪৩৯ টাকায় জিএসকে বিডির শেয়ার হাতবদল হয়। ২০১৭ সালে এ কোম্পানির শেয়ারহোল্ডাররা ৫৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ পেয়েছেন। বছর শেষে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয় ৫৫ টাকা ৫৬ পয়সা ও শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দাঁড়ায় ২১৮ টাকা ৩৫ পয়সা।

পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে জিএসকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের নিয়োগ করা গণসংযোগ প্রতিষ্ঠান ফোরথট পিআর এক ই-মেইল বার্তায় জানিয়েছে, ২০১৭ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত জিএসকে গ্লোবাল বিজনেস আপডেটের ঘোষণা অনুসারে, বিকাশমান বাজারগুলোয় ফার্মা ব্যবসা পরিচালনায় একটি সমন্বিত মডেল প্রয়োগ করবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানিটি। টেকসই প্রবৃদ্ধির উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে বাজারগুলোয় যথাযথ ও কার্যকর ব্যবসা কাঠামো নিশ্চিত করা হবে।

বাংলাদেশসহ বিকাশমান বাজারগুলোয় পরিচালন কর্মকাণ্ড মসৃণ করতে দেশে দেশে জিএসকের ব্যবসা পর্যালোচনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বাংলাদেশের বিষয়ে এখনো কিছু সিদ্ধান্ত হয়নি। সুতরাং এ বিষয়ে আমরা জল্পনা-কল্পনা করতে পারছি না।

এ মুহূর্তের মন্তব্যে আমরা এর চেয়ে বেশি বলতে পারছি না। তবে এটি বলতে পারি, জিএসকে বিকাশমান বাজারগুলোয় টেকসই ব্যবসা পরিচালনা ও বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সূত্র : বণিক বার্তা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here