ব্যবসার সক্ষমতা হারিয়েছে পিপলস লিজিং, অবসায়নের প্রস্তাব

0
347

সিনিয়র রিপোর্টার : ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের পুঞ্জীভূত লোকসান ২ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটির মূলধন ঘাটতি।

২৮৫ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিটির বিতরণকৃত ঋণের ৫২ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে পিপলস লিজিং। এমন অবস্থায় পিপলস লিজিংকে অবসায়ন করার প্রস্তাব দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত চাইলেও এখনো মন্ত্রণালয় থেকে কোনো মতামত আসেনি বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

নিরীক্ষক পিনাকী অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কোয়ালিফাইড অপিনিয়নেও পিপলস লিজিংয়ের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছে। ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০১৮ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাবসিডিয়ারি কোম্পানি পিএলএফএস ইনভেস্টমেন্টসহ ২০১৮ হিসাব বছরে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান হয়েছে ১৫৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা। আর তাদের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩২৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।

তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটির চলতি সম্পদের তুলনায় দায়ের পরিমাণ ৩ দশমিক ১১ গুণ বেশি। এ দুরবস্থার কারণে প্রতিষ্ঠানটি গোয়িং কনসার্ন হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেছে নিরীক্ষক।

এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটিকে পুনর্গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন পিপলস লিজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামি হুদা। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটিকে পুনর্গঠনের জন্য তিন বছর ধরে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ৬০০ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহের প্রস্তাব দিয়েছি। এটি বন্ড কিংবা ইকুইটি যেকোনোভাবেই হতে পারে। এমনকি নতুন করে যারা নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে, তারা চাইলে আমাদের প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিনে বিনিয়োগ করতে পারে। আমরা এমন বেশ কয়েকটি প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দিয়েছি।

তারা একবার আমাদের এখানে অডিট করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে আবারো এ বিষয়ে অধিকতর যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠানো হয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারো আমাদের প্রতিষ্ঠানে অডিট করছে। অডিট শেষে তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠাবে। আমরা এখন অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মানুসারে বিনিয়োগের বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণ করেনি পিপলস লিজিং। নিরীক্ষক পিপলস লিজিংয়ের আর্থিক প্রতিবেদনে এমফাসিস অব ম্যাটারে জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের ২০১১ সালের ২৮ ডিসেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপন এবং প্রুডেনশিয়াল গাইডলাইনস অন ক্যাপিটাল অ্যাডেকুয়েসি অ্যান্ড মার্কেট ডিসিপ্লিনস (সিএমএডি) ফর ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনসের নিয়ম অনুসারে, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ শেষে প্রতিষ্ঠানটির মোট মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিএআর) হয়েছে ঋণাত্মক ১১৭ দশমিক ৭১ শতাংশ।

প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা বলেন, পিপলস লিজিং অনেক আগে থেকেই গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। এ বিষয়ে আমাদের কাছে অনেক অভিযোগ জমা হয়েছে। বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকদের আমানত পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এমন অবস্থায় পিপলস লিজিংকে অবসায়ন করার প্রস্তাব দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো মন্ত্রণালয় থেকে কোনো মতামত আসেনি।

জানা গেছে, বিপর্যয়ের শিকার পিপলস লিজিং প্রায় দুই বছর ধরে আমানতকারীদের টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন অনেক আমানতকারী। পিপলস লিজিংকে কলমানি ও মেয়াদি আমানত হিসেবে ধার দেয়া টাকা আটকে গেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বেশকিছু ব্যাংকের। প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মীকে এরই মধ্যে ছাঁটাই করা হয়েছে। নিয়মিত বেতন-ভাতা না পেয়েও চাকরি ছেড়েছেন কিছু কর্মী।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, পিপলস লিজিংয়ের অন্যতম বড় ঋণগ্রহীতা ক্যাপ্টেন (অব.) এম মোয়াজ্জেম হোসেন পিপলস লিজিংকে সম্প্রতি ১১৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছেন। এ অর্থে বেশকিছু ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীর অর্থ পরিশোধ করেছে পিপলস লিজিং। ক্যাপ্টেন (অব.) এম মোয়াজ্জেমের কাছে প্রতিষ্ঠানটির আরো ৭ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।

এর আগে আরেফিন সামসুল আলামিন, নার্গিস আলামিন ও হুমায়রা আলামিন শেয়ার বিক্রি করে পিপলস লিজিংয়ের পাওনা পরিশোধ করেছেন। গেল বছর প্রতিষ্ঠানটি নতুন কোনো বিনিয়োগ করেনি। শুধু ঋণ আদায় ও  আমানতের অর্থ ফেরত দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এর কার্যক্রম।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুসন্ধানে ২০১৫ সালের শুরুর দিকে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে জালিয়াতির মাধ্যমে ৫০০ কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের ঘটনা ধরা পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছর প্রতিষ্ঠানটির পাঁচ পরিচালক মতিউর রহমান, খবির উদ্দিন মিয়া, আরেফিন সামসুল আলামিন, নার্গিস আলামিন ও হুমায়রা আলামিনকে অপসারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর পিপলস লিজিং থেকে পদত্যাগ করেন চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন (অব.) এম মোয়াজ্জেম হোসেন। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) প্রতিষ্ঠানটির অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি অনুসন্ধান করছে।

বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে পিপলস লিজিংয়ের পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। এনন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মনোনীত পরিচালক হিসেবে পর্ষদ চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আসেন উজ্জ্বল কুমার নন্দী। তিনি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত পাট খাতের কোম্পানি নর্দান জুটেরও চেয়ারম্যান এবং বস্ত্র খাতের কোম্পানি সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের স্বতন্ত্র পরিচালক। তাছাড়া র‌্যাডিসন ব্লু কক্সবাজারেরও তিনি চেয়ারম্যান।

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন মেঘনা গ্রুপের পরিচালক মো. নিজামুল আহসান। তাছাড়া এনন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মনোনীত পরিচালক হিসেবে পর্ষদে রয়েছেন নোয়াং চৌ মঙ ও নেই আই চিং। আর স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে রয়েছেন একিউ সিদ্দিকি, শেখর কুমার হালদার, মো. ইকবাল সাইদ, সুকুমার মৃধা ও প্রকৌশলী অমিতাভ অধিকারী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here