বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি : ৩ বছরেও শেষ হয়নি ৫৬ মামলার তদন্ত

0
115

বিশেষ প্রতিনিধি : তিন বছর হতে আর মাত্র এক মাস ৮ দিন বাকি। বেসিক ব্যাংকের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির আলোচিত ঘটনায় দায়ের করা ৫৬ মামলার তদন্ত এখনো শেষ করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

শিগগিরই তদন্ত শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই। যদিও স্বাধীন সংস্থাটির আইনে যে কোনো মামলার তদন্ত ৬ মাসের (১৮০) মধ্যে শেষ করার বিধান রয়েছে। এ নিয়ে গত ৩০ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের ডেকে নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন উচ্চ আদালত।

এ পরিস্থিতিতে দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত নিয়ে জনমনে নানা সন্দেহের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও একাগ্রতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।

২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে মোট সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণের অভিযোগ ওঠে। এরপর অনুসন্ধানে নামে দুদক।

অনুসন্ধান শেষে ২০১৫ সালের ২১, ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন ও গুলশান থানায় ১২০ জনকে আসামি করে ৫৬টি মামলা করে দুদক। এসব মামলায় বেসিক ব্যাংকের ২৭ কর্মকর্তা, ১১ জরিপকারী ও ৮২ ঋণ গ্রহণকারী ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

বেসিক ব্যাংক দুর্নীতিতে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক। এর মধ্যে রয়েছেন ৮ জন ব্যবসায়ী, একজন সার্ভেয়ার ও ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ের পাঁচজন কর্মকর্তা। ব্যাংক কর্মকর্তাদের সবাই হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন। এ ছাড়া আসামিদের মধ্যে অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে।

জানা যায়, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির মামলার কয়েকজন আসামির জামিন প্রশ্নে রুল শুনানিকালে উচ্চ আদালত গত ৩০ মে এসব মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের ডেকে নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের ও দুদক আইনজীবীর বক্তব্য শুনে হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ বলেছেন, আপনাদের কথা শুনে লজ্জায় কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকতে ইচ্ছে করছে। দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খানের বক্তব্যের মধ্যেই আদালত তাকে বলেন, চার্জশিট দিচ্ছেন না কেন? এ ধরনের মামলায় আড়াই বছর লেগে গেল কেন?

আসামিদের সঙ্গে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের যোগসাজশ প্রসঙ্গে বিচারপতি এম এনায়েতুর রহিম বলেন, আপনাদের নির্লিপ্ততার কারণে যেসব আসামি ভেতরে আছে তারাও বেরিয়ে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে আপনাদের সখ্য আছে বলে মনে হচ্ছে। চার্জশিট দিতে দেরি করছেন, যাতে আসামিরা জামিন পেয়ে যায়। আমরা তাদের জামিন দিতে বাধ্য হচ্ছি।

গত বছর জুলাই মাসে ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চু ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখতে হাইকোর্ট দুদককে নির্দেশনা দেন। এরপর বাচ্চুকে পাঁচবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। সেই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদেরও সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কিন্তু তাদের কেউই গ্রেপ্তার হননি। বরং তারা বুক ফুলিয়ে চলাফেরার পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানেও যোগ দিচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেছেন, নথিপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারা আবার পরিচালকদের জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। তিনি জানান, বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন পরিচালকদের মধ্যে বেশির ভাগই এখন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উচ্চ পর্যায়ে রয়েছেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করাও এখন দুদকের জন্য চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান স্টক বাংলাদেশকে বলেন, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় দুদকের দায়ের করা মামলার অভিযোগপত্র তিন বছরেও দিতে না পারাটা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। এটা দুদকের প্রতি মানুষের আস্থার সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে।

তিনি তদন্ত কর্মকর্তাদের পেশাগত ব্যর্থতার বিড়ম্বনা, দক্ষতার ঘাটতি, সদিচ্ছার অভাব ও সৎ সাহসিকতার ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন। তিনি বলেন, শক্তিশালী স্বাধীন সংস্থা হিসেবে দুদক কারো চেহারা দেখে তদন্ত করবে না। তাদের সেই সৎ সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে যে অবস্থা বিরাজ করছে, তাতে এই খাতে আস্থা ফেরাতে হলে এই মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলার আসামিদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দুদক সেই প্রমাণ রাখতে পারে।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার স্টক বাংলাদেশকে বলেন, ৬ মাসের জায়গায় তিন বছরেও চার্জশিট দিতে না পারাটা খুবই হতাশার।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এসব মামলার আসামির মধ্যে তো অনেক ক্ষমতাবানরা রয়েছেন। যদি তাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের কারণে সময়ক্ষেপণ হয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে দুদক তার সঠিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা দূর করতে মামলাগুলোর দ্রুত চার্জশিট দিয়ে বিচার ত্বরান্বিত করা দুদকের দায়িত্ব। আশা করি, প্রতিষ্ঠানটি তাদের সেই দায়িত্ব আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫৩ শতাংশ (৭ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা), যা যে কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হারের চেয়ে বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বেসিক ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের মার্চে তা দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। ওই চার বছর তিন মাসে ব্যাংকটি ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়, যার প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকাই নিয়ম ভেঙে দেয়া হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here