বুক বিল্ডিং `পাতানো ম্যাচ’, তাই ‘পদ্ধতির সংশোধন প্রয়োজন’

0
1341

সিনিয়র রিপোর্টার : বিদ্যমান বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারের কাট-অফ প্রাইস নির্ধারণে ‘পাতানো ম্যাচ’ খেলা হয়। এখানে কারসাজি করা সম্ভব হওয়ায় অনেকে সেদিকেই ঝুঁকছেন। এমতাবস্থায় পদ্ধতিটি পুঁজিবাজারে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই পুঁজিবাজারের স্বার্থে পদ্ধতিটির সংশোধন প্রয়োজন বলে মনে করেন নীতি নির্ধারকরা।

এছাড়া পদ্ধতিটির অপব্যবহার নিয়ে ইতোমধ্যে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনেও (বিএসইসি) আলোচনা শুরু হয়েছে। এরই আলোকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পদ্ধতিটির সংশোধনী করতে পারে বলে জানা গেছে।

প্রিমিয়ামসহ শেয়ারবাজারে আসতে চাইলে পাবলিক ইস্যু রুলস-২০১৫’তে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই পাবলিক ইস্যু রুলস জারি করা হয়। এই পদ্ধতিতে বিডিংয়ে অংশ নেয়া সবাই কাট-অফ প্রাইসে শেয়ার পাওয়ার অধিকারী। যা একটি কোম্পানির কাট-অফ প্রাইসের যোগ্যতা সঠিকভাবে মূল্যায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

বুক বিল্ডিংয়ের সংশোধনী চেয়ে বিএসইসিতে সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ)। এ লক্ষ্যে আগামী ২২ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার বিএমবিএর একটি বৈঠক হবে। যেখানে বিএমবিএর বিভিন্ন সদস্য বুক বিল্ডিংয়ের সংশোধনীর জন্য প্রস্তাব করবেন। যা পরবর্তীতে বিএসইসিতে জমা দেয়া হবে।

বিডিংয়ের অপব্যবহার বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেনকে বিভিন্ন সময় সমালোচনা করতে দেখা গেছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বুক বিল্ডিং পদ্ধতির অপব্যবহার হচ্ছে। আর এই অপব্যবহার রোধে বিএসইসি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। প্রয়োজনে বুক বিল্ডিং পদ্ধতি স্থগিত বা বন্ধ করা হবে বলেও হুশিয়ারি দিয়েছেন।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) আয়োজিত এক সেমিনার ও ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ’ এর উদ্বোধনীতে তিনি এসব কথা বলেন।

বিএসইসি সাবেক চেয়ারম্যান এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সঠিক কাট-অফ প্রাইস নির্ধারনে সর্বোচ্চ দর নিয়ন্ত্রক সংস্থার ঠিক করে দেওয়া উচিত। বিডিংয়ে ওই দরের উপরে কাট-অফ প্রাইস হবে না। এক্ষেত্রে নিলামে অংশগ্রহণকারীদের দর প্রস্তাবে কাট-অফ প্রাইস নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওই নির্ধারিত দরের মধ্যে হবে।

তিনি বলেন, সর্বোচ্চ দর নির্ধারনে নিয়ন্ত্রক সংস্থা শেয়ারপ্রতি সম্পদকে (এনএভিপিএস) বিবেচনায় নিতে পারে। এছাড়া স্টেকহোল্ডারদের সহযোগিতা নিতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, যাদের ইলিজিবল বা যোগ্য বিনিয়োগকারী বলা হচ্ছে, তারা আসলে যোগ্য না। বিডিংয়ে তারা পাতানো ম্যাচ খেলে। তাই সবার আগে যোগ্য বিনিয়োগকারী খুঁজে বের করতে হবে। একইসঙ্গে বিডিংয়ে তাদের জন্য বরাদ্দকৃত কোটা কমিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে তাদের কোটা ৫০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ করা যেতে পারে। আর এইসব বিনিয়োগকারীদের শেয়ারে কমপক্ষে ১ বছরের লক-ইন রাখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, যোগ্য বিনিয়োগকারীদের ম্যানুপুলুশন কিভাবে খুঁজে বের করা যায়, তা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তাদের প্রস্তাবিত দরের যথার্থতা যাছাই করা যায়।

এএফসি ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাহবুব এইচ মজুমদার বলেন, কোন কোম্পানির বিডিংয়ে যদি যোগ্য বিনিয়োগকারীদের তার প্রস্তাবিত দরেই শেয়ার নিতে হয় এবং কাট-অফ প্রাইসের নিচে প্রস্তাবকারীদের শেয়ার দেয়া না হয়, তাহলে যৌক্তিক দর মূল্যায়ন হবে। এছাড়া বিডিং চলাকালীন দর প্রস্তাবের তথ্য গোপন রাখতে হবে।

তিনি বলেন, ধরুণ একটি কোম্পানির নিলামে ৬০ টাকা থেকে ২০ টাকা দর প্রস্তাব হয়েছে। আর কাট-অফ প্রাইস হয়েছে ৩৫ টাকা। এক্ষেত্রে যদি বিডিংয়ে ৬০ টাকায় দর প্রস্তাবকারীকে শেয়ার নিতে বাধ্য করা হয়, তাহলে সে ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবে যৌক্তিক দর প্রস্তাব করবে। কারণ অন্যরা তার চেয়ে কম দরে শেয়ার পাবে।

এদিকে কাট-অফ প্রাইসের নিচে দর প্রস্তাবকারীকে শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া না হলে সেও যৌক্তিক দরে প্রস্তাব করতে চাইবে বলে মনে করেন মাহবুব এইচ মজুমদার। অন্যথায় সে শেয়ারটি পাবে না। আর শেয়ার পেতে চাইলে যৌক্তিক দর প্রস্তাব করতে হবে।

বিডিংয়ের ৭২ ঘণ্টা দর প্রস্তাবের তথ্য গোপন রাখা উচিত বলে মনে করেন মাহবুব এইচ মজুমদার। তাহলে বিডাররা প্রভাবিত হবেন না এবং নিজেদের মূল্যায়িত দর প্রস্তাব করবেন।

অন্যদিকে কোম্পানি কর্তৃপক্ষও দর প্রস্তাবের অবস্থা দেখতে না পেলে বিডিং চলাকালীন যোগ্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আঁতাত করা থেকে নিরুৎসাহিত হবে। কারণ তারা বুঝতে পারবে না কাট-অফ প্রাইস কি হতে চলেছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও কারসাজি থেকে নিজেদের দুরে সরিয়ে নেবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম (এফসিএমএ) বলেন, চলমান বুক বিল্ডিংয়ে বুক বিল্ডিং সিস্টেমটাই নষ্ট হয়ে গেছে। এটি সংশোধন করা না হলে ভবিষ্যতেও অতিমূল্যায়িত কাট-অফ প্রাইস নির্ধারিত হবে। তাই শেয়ারবাজারের স্বার্থে অবশ্যই এটি সংশোধন করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, বিডিংয়ের কাট-অফ প্রাইস যে সঠিক হয় না, তা বোঝার আরেকটি সহজ উপায় হল কাট-অফ প্রাইসের চেয়ে ১০ শতাংশ কমে আইপিওতে শেয়ার ইস্যু। এক্ষেত্রে সহজেই বোঝা যায় কাট-অফ প্রাইস ফেয়ার না। যদি তাই হয়, তাহলে আইপিওতে কেনো ১০ শতাংশ কমে শেয়ার ইস্যু করা হবে।

অনেক বিতর্কের মুখে ২০১১ সালে এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেডের পরে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কোন কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসেনি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই পদ্ধতিটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতি চালুর পরে এ পর্যন্ত ৬টি কোম্পানির বিডিং সম্পন্ন হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে- আমরা নেটওয়ার্ক, বসুন্ধরা পেপার মিলস, আমান কটন ফাইবার্স, এ্যাসকোয়ার নিট কম্পোজিট, রানার অটোমোবাইলস এবং এডিএন টেলিকম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here