স্টাফ রিপোর্টার : বিসমিল্লাহ গ্রুপের প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি, মানিলন্ডারিং ও দুর্নীতির অভিযোগে দুদুকের করা ১২ মামলার মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। মামলার আসামিদের কেউ কেউ এখনো ব্যাংকের চাকরিতে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। আবার কেউ পদোন্নতি পেয়েছেন। তবে বিগত ৫ বছরেও মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ হয়নি। বড় ঋণ জালিয়াতির হোতারা এখনো অধরা।

সূত্র জানায়, বিসমিল্লাহ গ্রুপের জনতা ব্যাংক ভবন কর্পোরেট শাখা থেকে ফান্ডেড ৩০৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ও নন-ফান্ডেড ২৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, মগবাজার শাখা থেকে ১৭৭ কোটি ১০ লাখ ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড এক কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং এলিফ্যান্ট রোড শাখা থেকে ফান্ডেড ১৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে।

এ ছাড়া প্রাইম ব্যাংক মতিঝিল শাখা থেকে ফান্ডেড ২৬৫ কোটি ৪০ লাখ ও নন-ফান্ডেড টাকা ৬১ কোটি ৮ লাখ, প্রিমিয়ার ব্যাংক মতিঝিল শাখা থেকে ফান্ডেড ২৩ কোটি ২২ লাখ ও নন-ফান্ডেড ৩৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যমুনা ব্যাংক লিমিটেডের দিলকুশা শাখা থেকে ফান্ডেড ১০৮ কোটি ৪৪ লাখ ও নন-ফান্ডেড ৪৬ কোটি দুই লাখ টাকা এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের ইস্কাটন শাখা থেকে ৯৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা ফান্ডেড ও ১০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা নন ফান্ডেড হিসেবে অর্থ আত্মসাৎ করে।

২০১৩ সালের ৩ নভেম্বরে দায়ের করা এসব মামলায় আসামি করা হয় গ্রুপটির এমডি খাজা সোলেমান আনোয়ার চৌধুরী, চেয়ারম্যান নওরিন হাসিব, প্রাইম ব্যাংকের ডিএমডি মো. ইয়াছিন আলীসহ ৫৪ জনকে। এদের মধ্যে গ্রুপের এমডি, চেয়ারম্যানসহ ১৩ জনকে সবকটি মামলার আসামি করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে অন্য ৪১ জন বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের তিনটি শাখার ১২ জন, প্রাইম ব্যাংকের ৯ জন, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৭ জন, যমুনা ব্যাংকের ৫ জন এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ৮ কর্মকর্তা রয়েছেন।

দুদকের দায়ের করা মামলায় বিসমিল্লাহ গ্রুপের এমডি খাজা সোলেমান ও তার স্ত্রী নওরীন হাবিব দুবাইয়ে, আবুল হোসেন মালয়েশিয়ায় ও মইনউদ্দিন জার্মানিতে রয়েছেন। বাকি আসামিরা দেশেই পলাতক রয়েছে।

মামলায় আসামির তালিকায় প্রাইম ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্যাংকটির ডিএমডি মো. ইয়াছিন আলী, মতিঝিল শাখার দুই সাবেক ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) মো. মোজাম্মেল হোসেন ও খোন্দকার ইকবাল হোসেন, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসভিপি) ও ফরেন এক্সচেঞ্জের ইনচার্জ ইব্রাহিম হোসেন গাজী, দুই এসিস্টেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি) এবিএম শাহ জাহান ও কাজী খাইরুল ইসলাম, তিন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার মোহাম্মদ ইকবাল আজিম কাদরী, মো. আবুল কালাম এবং এ কে এম জান-ই আলম।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে মামলার আসামিরা হলেন- মতিঝিল শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) মুহাম্মদ শাহীনুর রহমান, সাবেক সহকারী ব্যবস্থাপক (ডেপুটি ম্যানেজার) জিএম শাহাদৎ হোসেন, এফএভিপি (ফার্স্ট এসিস্টেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট) এম এ রহীম, ভিপি ও ডেপুটি ম্যানেজার শাহাবুদ্দিন সরদার, এফএভিপি (বর্তমানে বরখাস্ত) তানজিবুল আলম ও সাবেক এক্সিকিউটিভ অফিসার আবু সালেহ মো. আরিফুর রহমান।

যমুনা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন সাবেক ডিএমডি মোজাম্মেল হোসেন, দিলকুশা শাখার চার এসইভিপি রফিকুল হাসান, মুহম্মদ মোর্শেদুর রহমান, এসএম জাহিদুল ইসলাম এবং এএসএম মাশুক। আর শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন ইস্কাটন শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা ব্যবস্থাপক মো. আসলামুল হক, সাবেক ডেপুটি ম্যানেজার এ এস এম হাসানুল কবীর, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার শহীদুল ইসলাম, জুনিয়র এসিস্টেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মান্নাতুল মওলা, সাবেক এস ই ভি পি মোহাম্মদ গোলাম ওহাব, এফ এ ভি পি মো. মুনির হোসেন, এস ভি পি মো. দুলাল হোসেন এবং এস ই ভি পি মো. আনিসুল কবির।

মামলায় জনতা ব্যাংকের তিনটি শাখার ১২ জন আসামির মধ্যে রয়েছেন জনতা ব্যাংক ভবন করপোরেট শাখার মহাব্যবস্থাপক ও শাখা ব্যবস্থাপক আবদুস সালাম আজাদ, একই শাখার ডিজিএম আজমুল হক, উপমহাব্যবস্থাপক এস এম আবু হেনা মোস্তফা কামাল, দুই এজিএম (রফতানি) অজয় কুমার ঘোষ ও ফায়েজুর রহমান ভূঁইয়া, রপ্তানি বিভাগের কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার, জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা (এসইও) সৈয়দ জয়নাল আবেদীন, জনতা ব্যাংক মগবাজার শাখার ম্যানেজার রফিকুল আলম, দুই এস ই ও খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও আতিকুর রহমান, ব্যাংকটির এলিফ্যান্ট রোড শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোস্তাক আহমদ খান এবং এস ই ও এস এম শোয়েব-উল-কবীর।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ব্যাংক কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে দুদক। তবে অন্য আর্থিক কেলেঙ্কারির মতো এ ঘটনায়ও জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও অর্থ উদ্ধার সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিসমিল্লাহ গ্রæপের মামলা পরিচালনাকারী দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, আর্থিক খাতের এ কেসগুলো অর্থঋণ আদালতে মামলা হয়। ফলে মামলা নিষ্পত্তি করতে করতে ১০ টাকার জিনিসের মূল্য ১ টাকায় নেমে আসে।

দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বলেন, ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যেসব কর্মকর্তা দুর্নীতি করছেন, দুদক কর্মকর্তারা তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসছেন। কমিশনের বক্তব্য হচ্ছে, কেউ জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নেবেন কিন্তু সে ঋণ ফেরত দেবেন না, তা হতে দেয়া হবে না। দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ হিসেবে ব্যাংকিং খাতের যে কোনো অপরাধই নিয়ন্ত্রণ করতে দুদক সচেষ্ট রয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকের সুশাসনের অভাব, কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণেই নামে-বেনামে ঋণ নিতে পেরেছে কিছু প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন পরে হলেও খেলাপিদের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এখন টাকা আদায়ের উদ্যোগ নিতে হবে। ঋণ আদায়ে মামলাসহ সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। যে সব ব্যাংক জামানত ছাড়া ঋণ দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here