বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের চোখে ‘শঙ্কা ও স্বপ্নের বাজেট’

0
735

রাহেল আহমেদ শানু : অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বৃহস্পতিবার সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের সর্বোচ্চ ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন। বাজেট কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, বাজেট উন্নয়নে কতটা ভূমিকা রাখবে সে বিষয়ে স্টক বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা।

ড. ফরাস উদ্দিন আহমেদ

বাজেট ইতিবাচক : ড. ফরাস উদ্দিন আহমেদ
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেট উচ্চবিলাসী। তবে ইতিবাচক। এ বাজেট উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করবে। তাই বাজেটে ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত করা খুবই জরুরি ছিল। তা ছাড়া দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য বাজেটের আকার বড় হতে হবে। কেননা, দেশের লোক সংখ্যা বাড়ছে। এখনো দেশে অনেক দরিদ্র ব্যক্তি রয়েছে, এখনো বহু মানুষ বেকার রয়েছে।

তাই ঘাটতি বাজেট হবে, এতে কোনো দোষ নেই। কর্মসংস্থান বাড়ান এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে বাজেট তো একটু উচ্চাকাক্সক্ষী হবেই। তিনি বলেন, ঘাটতি পুরণের জন্য অর্থমন্ত্রী বাজেটে যে আয়ের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।

ড. ফরাস উদ্দিন আহমেদ বলেন বলেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার দুর্নীতি কমাতে হবে, তা না হলে বাজেটের সুফল পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া বাজেট বাস্তবায়নের হার আরো বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্তত ৮৫-৯০ শতাংশ বাজেট বাস্তবায়ন করার ওপর জোর দেন তিনি।

ড. সালেহউদ্দিন

বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয় : ড. সালেহউদ্দিন
২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।

তার মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে শুধু গাণিতিক হিসাবই প্রাধান্য পেয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য ধার্যকৃত ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাজেটের যে গাণিতিক হিসাব রয়েছে, তা থেকে এবারের বাজেটও ভিন্ন কিছু নয়। এ বাজেট হচ্ছে সরকারের আয়ের বাজেট। সরকার টাকা আয় করবে আর সরকারই তা ভোগ করবে।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগের কোনো ক্ষেত্র তৈরির দিক নির্দেশনা নেই। শিল্পোন্নয়নে কোনো উদ্যোগ নেই। এক পোশাক শিল্পের ওপরেই বাজেটে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এতে অন্য শিল্প গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। শিল্প-বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থানের বাড়বে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশাল বাজেটের জন্য সাধারণ মানুষের পকেট কেটে টাকা আদায় করা হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে বাজেটে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।

ড. মির্জা আজিজুল ইসলাম

বাজেট অতি উচ্চবিলাসী : ড. মির্জা আজিজুল ইসলাম
২০১৭-১৮ সালের প্রস্তাবিত বাজেটকে নিতান্তই উচ্চবিলাসী ও অবাস্তব বাজেট বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্ঠা ড. এ বি মির্জা আজিজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ৪ লাখ ২৬৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন বৃহৎ আকারের বাজেট এর আগে আর ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু বাজেটে অর্থ সংগ্রহের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই।

তিনি বলেন, গত বছরে মূল বাজেটের আকার ছিল ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। অবশ্য পরে সেটি সংশোধন করে বাজেটের আকার নির্ধারিত হয় ৩ লাখ ১৭ হাজার কোটি। যেখানে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা কাটছাট করা হয়। প্রতি অর্থ বছরেই বাজেটে শেষের দিকে এ ধরনের বড় কাটছাট করে দেখানো হয় বাজেট সফলতা অর্জন করেছে।

তিনি বলেন, বাজেটে এত বড় ঘোষণা না করে প্রথমেই ঘোষনার সময় চিন্তা ভাবনা করে আসলে কত টাকা বাস্তবায়নযোগ্য সে হিসেবে বাজেট প্রস্তাবনা করা প্রয়োজন। আর এত বিশাল অঙ্কের টাকা কোথা থেকে আসবে তারও পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। ভ্যাট ও ট্যাক্স বাড়িয়ে এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টার কথা বললেও গত কয়েক বছরে তা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, গত বাজেটই কিন্তু আমরা বাস্তবায়ন করতে পানিনি। এর মাত্র ৭৮ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। সুতরাং আমরা যত বড় বাজেটই পেশ করি না কেন, তা বাস্তবায়নের হার আশানুরূপ নয়। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে ৯৪ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়। পরের বছর থেকে বাস্তবায়নের হার কমে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা ৭৮ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। তাই বলা যায়, আমাদের দেশে বাস্তবায়নের সক্ষমতা বেশ দুর্বল।

তিনি বলেন, তা ছাড়া মনে রাখতে হবে- আমাদের বৈদেশিক ঋণ পাইপ লাইনেই রয়েছে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। সে কারণে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর ভরষা করাও কঠিন। ব্যাংকগুলো বিভিন্ন কারণে সরকারকে ঋণ দিতে অনাগ্রহী। সরকার এর পরে সঞ্চয়পত্রের ওপর টার্গেট করে। সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার একটা বড় অর্থ আনছে। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে আরো অধিক সংখ্যক মানুষকে আয়করের আওতায় এনে রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটা নিশ্চয় দেশের পক্ষে ভাল, কিন্তু তা কতটা সম্ভব হবে তা বলা মুশকিল। আমাদের পরিসংখ্যান ততটা আশানুরূপ নয়। তাই গতবারের বাজেট যদি ‘উচ্চভিলাসী’ বলে থাকি এবারের বাজেটকে বলব ‘অতি উচ্চভিলাসী’।

গোলাম মোয়াজ্জেম

বাজেটের গুনগত দিকের ঘাটতি রয়েছে : গোলাম মোয়াজ্জেম
সিপিডির সিনিয়র ফেলো ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, এটি বড় আকারের বাজেট। সরকার উন্নয়নের জন্য ব্যয় করতে চাইছে, যা ভালো দিক। কিন্তু বড় বাজেটে আয়ের যে দিকনির্দেশনা থাকা উচিত সেই গুনগত দিকের ঘাটতি রয়েছে।

ড. মোয়াজ্জেম বলেন, সরকার বড় বাজেট প্রস্তাব করে যে ব্যয় করার চেষ্টা রয়েছে তাকে সাধুবাদ জানাই। তবে এ ব্যয় করতে গিয়ে অর্থ সংস্থানের প্রশ্ন উঠতেই পারে। কেননা, এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৩৬ শতাংশ, যা বর্তমানে গড় রয়েছে ১৯ শতাংশের মত। তাই এক লাফে এতটা বাড়বে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তা ছাড়া বাজেটে বৈদেশিক অর্থের আশা করছে সরকার। কিন্তু মনে রাখতে হবে বৈদেশিক অর্থ যথেষ্ট ঋণ হিসেবে আমরা গ্রহণ করেছি। যার সুদ দিতেই বাজেটের একটা বিরাট অংশ চলে যাচ্ছে। যদি বিদেশি সহায়তা না আসে তা হলে সরকার কিভাবে অর্থ ম্যানেজ করবেন তা বোঝা মুশকিল। কেননা, সুদজনিত ব্যয়ের কারণে এবং বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ চলে যাচ্ছে। যা কমানো দরকার।

তা ছাড়া বড় প্রকল্পগুলোর ধীর গতির কারণে ব্যয় বাড়ছে, যার জন্য অর্থ বরাদ্দ করতে হচ্ছে। বাজেটের অনেকাংশই অবকাঠামো ও অনুন্নয়ন খরচ হচ্ছে। উন্নয়ন খরচ কমে যাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ক খাতগুলো উপযুক্ত অর্থ বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সুতরাং বাজেটের ব্যয় কিভাবে আসবে সে দিকে আরো নজর দেয়া দরকার।

আনু মোহম্মদ

বাজেটে সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা নেই : আনু মোহম্মদ
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মোহম্মদ বলেছেন, এটি সরকারের অতি উচ্চবিলাসী বাজেট। নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার এ ধরনের বড় আকারের বাজেট পেশ করছে। কিন্তু বাজেট বাস্তবায়নের কোন লক্ষ্যমাত্রা অর্থমন্ত্রী দিতে পারেননি। এ ছাড়া বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক খাত যেমন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, দারিদ্র দূরীকরণসহ কর্মসংস্থানের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা নেই।

বড় বড় প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দিনের পর দিন করে যাচ্ছে, যা লুটপাট করতে সহজ হয়। সরকার দরিদ্রদের কথা চিন্তা না করে ধনীক শ্রেণির জন্য বাজেট বরাদ্দ করছে। এটি কতটা বাস্তবায়ন যোগ্য, এর ব্যয় কিভাবে কোথা থেকে আসবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here