বিপুল বিনিয়োগে ইউনিক হোটেল

0
1611

স্টাফ রিপোর্টার : হোটেল ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেড। এর মধ্যে ঢাকায় তিনটি হোটেল প্রকল্পে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে ৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬৫ শতাংশ শেয়ারহোল্ডার হিসেবে আরো ২ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি।

সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার বেশি এ বিনিয়োগ আগামীতে কোম্পানির রাজস্ব ও মুনাফা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন কোম্পানির কর্মকর্তারা। কোম্পানির নিজস্ব তহবিলের পাশাপাশি এজন্য  ঋণের অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকায় যে তিনটি হোটেল নির্মাণ করা হচ্ছে এর দুটি পাঁচ তারকা ও একটি সাত তারকা মানের হোটেল। এর মধ্যে রাজধানীর গুলশানে কোম্পানির বিদ্যমান পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিনের পাশেই নির্মাণ করা হচ্ছে সাত তারকাবিশিষ্ট সেন্ট রেজিস হোটেল অ্যান্ড সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্ট। এটি স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

রাজধানীর বনানীতে পাঁচ তারকা মানের শেরাটন ঢাকা বনানী হোটেলটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০০ কোটি টাকা। গত বছর হোটেলটির নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে হোটেলটির ইন্টেরিয়রের কাজ চলছে বলে জানা গেছে। এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই হোটেলটির কাজ শেষ করার নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) ইউনিক হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নূর আলী শেয়ারহোল্ডারদের জানান, ‘শেরাটন ঢাকা বনানী’ হোটেল একটি বড় প্রকল্প। এর জমি নেয়া হয়েছে ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে। নিয়মকানুনসহ বিভিন্ন জটিলতায় সময়মতো হোটেলটি চালু করা সম্ভব হয়নি।

আন্তর্জাতিক মানের পাঁচ তারকা এই হোটেলে দেশী-বিদেশী সেবাগ্রহীতাদের সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে কমপক্ষে ১৭টি দেশ থেকে যাবতীয় সরঞ্জাম আনতে হয়েছে। ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে এ কাজটি করতেও সময় কিছুটা বেশি লেগেছে। তবে সব কাজ শেষ করে ২০১৯ সালের মধ্যে হোটেলটি চালু করা যাবে। গুলশানে আরেকটি পাঁচ তারকা মানের হোটেল হায়াত সেন্ট্রিক, ঢাকা নির্মাণে ব্যয় করা হচ্ছে ৪০০ কোটি টাকা। এর নির্মাণকাজ শেষ হবে ২০২১ সালে।

হোটেল প্রকল্পের সম্ভাব্য রেভিনিউ ও মুনাফার প্রক্ষেপণ অনুসারে, নির্মাণাধীন তিন হোটেল থেকে আগামী ৫ বছরে কোম্পানির ২ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা রাজস্ব আসবে, যা থেকে কর-পূর্ববর্তী মুনাফা আসবে ১ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২০ সালে কোম্পানির রেভিনিউ আসবে ৩২৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা ও কর-পূর্ববর্তী মুনাফা দাঁড়াবে ১২১ কোটি ১০ লাখ টাকায়।

২০২১ সালে রেভিনিউ হবে ৪২৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা আর মুনাফা দাঁড়াবে ১৫৮ কোটি ৮০ লাখ টাকায়। ২০২২ সালে রেভিনিউ হবে ৪৮১ কোটি ৪০ লাখ টাকা আর মুনাফা আসবে ১৮০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২৩ সালে রেভিনিউ দাঁড়াবে ৫৫৬ কোটি ৯০ লাখ টাকায় আর মুনাফা হবে ২০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে রেভিনিউ আসবে ৯৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা ও মুনাফা আসবে ৩৬৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

এছাড়া, গত বছরের ২৫ জুলাই বিল্ড ওন অ্যান্ড অপারেট (বিওও) শর্তে নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছ থেকে এলওআই পায় ইউনিক হোটেলের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়াম। প্রকল্পের ৬৫ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ শেয়ার থাকবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ভ্রমণ-অবকাশ কোম্পানিটির হাতে।

গ্যাস/আর-এলএনজিভিত্তিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ প্রকল্পটির ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকবে বিদেশী কারিগরি অংশীদার গুয়াইয়ামা পিআর হোল্ডিংস বিভি (বর্তমানে জিই গ্লোবাল এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট বিভি, যা জেনারেল ইলেকট্রিকের একটি সাবসিডিয়ারি) এবং বাকি ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ শেয়ার ধারণ করবে স্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজিক ফিন্যান্স লিমিটেড।

কোম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫২ কোটি ২০ লাখ ডলারের (প্রতি ডলার ৮৩ টাকা ৯৫ পয়সা হিসেবে ৪ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা) এ প্রকল্পের ২৫ শতাংশ ইকুইটি এবং বাকি ৭৫ শতাংশ অর্থ সিন্ডিকেটেড ঋণের আওতায় দেশী-বিদেশী বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করবেন উদ্যোক্তারা। অর্থাৎ ইকুইটি হিসেবে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করছেন উদ্যোক্তারা।

এ হিসাবে ইউনিক হোটেলের বিনিয়োগ সাড়ে ছয়শ কোটি টাকা ছাড়াবে। মেঘনাঘাট এলাকায় নিজেদের প্লট থেকে বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য এরই মধ্যে ২৫ একর জমি দিয়েছে ইউনিক হোটেল কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পে কারিগরি অংশীদার জিই গ্লোবাল এনার্জি প্লান্টের সব যন্ত্রপাতি সরবরাহ করবে। এগুলোর মূল্যমানই তাদের ইকুইটিতে রূপান্তর হবে।

এলওআই অনুসারে, জ্বালানি খরচের বাইরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য সরকারের কাছ থেকে লিভারেজ ট্যারিফ হিসেবে ২ দশমিক শূন্য ২৩৬ সেন্ট পাবে প্লান্ট কর্তৃপক্ষ। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর ২২ বছর সরকার এ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনবে। পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (পিপিএ) চূড়ান্ত হওয়ার পর ৩৬ মাসের মধ্যে বিদ্যুকেন্দ্রটির উৎপাদনে আসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

কর্মকর্তাদের হিসাবনিকাশ অনুসারে, উৎপাদন শুরুর পর এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে বছরে ৪০০ কোটির টাকার মুনাফা আসবে। প্রথম দফায় ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কাজ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় আরো ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরো একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে ইউনিক হোটেল উদ্যোক্তাদের।

এদিকে বেসরকারি খাতের একাদশ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসাবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছ থেকে ২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট প্রাকযোগ্যতা সনদ পায় ইউনিক গ্রুপের ‘সোনারগাঁও ইকোনমিক জোন’।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মেঘনাঘাটে ৪৫০ একর জায়গার ওপর নির্মিতব্য এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে এলপিজি সিলিন্ডার, মোবাইল হ্যান্ডসেট, পেট্রোকেমিক্যাল ও মোটরবাইক নির্মাণ কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ইকোনমিক জোনে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টসের ১০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here