‘বিদেশীরা বিনিয়োগের আগে দেখেন রিটার্ন ও নিরাপত্তা’

0
648

 প্রতি বছর কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ দেশগুলোর সীমান্ত অতিক্রম করে এক অর্থনীতি থেকে অন্য অর্থনীতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। বাংলাদেশও সেই অর্থ ব্যবহারের অংশীদার, তবে ছোট অংশীদার বটে। আমরা তো কত সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা বলি, কিন্তু বাস্তবতা হলো বাংলাদেশ বিদেশী বিনিয়োগ বেশি পাচ্ছে না। অর্থের কোনো দেশ নেই, বাউন্ডারি নেই। অর্থ দেখে দুটি বিষয়, এক. রিটার্ন, দুই. নিরাপত্তা। বিদেশীরা বিনিয়োগের আগে দেখেন রিটার্ন ও নিরাপত্তা।

বাংলাদেশ মনে হবে এই দুটি ক্ষেত্রেই এগিয়ে, তবুও সত্য হলো অতি কম বিদেশী বিনিয়োগ পাচ্ছে। অন্য যে বিষয়টি বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলো বিনিয়োগ করে যে পণ্য বা সেবা উৎপাদন করা হবে তার বাজার। বিনিয়োগকারীরা বাজার খোঁজেন দেশে ও বিদেশে। দেশের বাজার বড় হলে বিনিয়োগ আসে, আবার দেশের বাজার ছোট হলেও ক্ষতি নেই, যদি ওই দেশে বিনিয়োগ করে অন্য দেশের বাজারগুলোয় বিক্রি করা যায়।

শুধু সস্তায় শ্রমিক বা মানবসম্পদ পাওয়া যায়, এজন্যই বিদেশী বিনিয়োগ আসবে, সেই দিন এখন আর নেই। মজুরি আর বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হলো মোট ব্যয়ের একটি অংশ মাত্র। অন্য ব্যয় বেশি থাকলে সেখানে বিদেশী বিনিয়োগ পারতপক্ষে আসতে চায় না। অন্য ব্যয়গুলোর মধ্যে বেশি অসুবিধাজনক হলো কথিত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং কাজ করিয়ে নিতে ঘুষ বা বাড়তি ব্যয়। বাংলাদেশ এই দুই ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে ফলে অনেকে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে মাঝপথে বিনিয়োগ পরিকল্পনা ত্যাগ করেন।

অন্য অনেক দেশ ভালো বিদেশী বিনিয়োগ পেয়েছে, তাদেরই লোকদের থেকে যারা বিদেশী নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা বিদেশে কাজ করেন। বাংলাদেশও এ ক্ষেত্রে সৌভাগ্যবান। তবে ওই বাংলাদেশীরাও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং গণপ্রশাসনের ওপর সন্তুষ্ট নয়। তাদেরও ভোগান্তি শুরু হয় বিমানবন্দর থেকেই, তারপর যতই ভেতরে আসে, তাদের মনে হবে বাংলাদেশও বদলে গেছে শুধু বদলায়নি কাজের বাধা দেয়ার ক্ষেত্রে এবং কাজ করানোর ক্ষেত্রে বাড়তি অর্থ দেয়ার ক্ষেত্রে।

অন্য সমস্যা হলো বাংলাদেশ থেকে তারা ভালো পার্টনার্স বা অংশীদার পান না। যৌথ মালিকানায় কোনো প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি করে তারা শান্তি পাননি। স্থানীয় অংশীদার তাদেরকে শুধু ঠকিয়েছেই। তারা তো বিদেশ ফেলে সর্বক্ষণ বাংলাদেশে এসে বসে থাকবেন না। কিন্তু তাদের জন্য ভেতরে নির্ভরযোগ্য অংশীদার কই! তবে তাদের জন্য ঝামেলাবিহীন বিনিয়োগ হতে পারে আমাদের শেয়ারবাজার। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো আমাদের শেয়ারবাজারটা এখনো ছোট।

এখানে মরিচাধরা কোম্পানির সংখ্যাই বেশি। কিছু কথিত শিল্প উদ্যোক্তা জনগণের কাছে শেয়ার বিক্রি করে অর্থ নিয়ে নিজেদের ব্যবসাকে বছরের পর বছর লোকসান দেখিয়েই চলেছে। অথচ তারা ধনী হয়েছে ওইসব তালিকাভুক্ত কোম্পানির মাধ্যমে, যাদের শেয়ার জনগণ কিনেছে। আফসোস! তারা ধনী হয়েছে; ধনী হয়নি কেবল তারা, যারা তাদের কোম্পানির শেয়ার কিনেছে!

বাংলাদেশে এসবই সম্ভব হচ্ছে। শেয়ার বেচার নামে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তারা ধনী হচ্ছে। অথচ তাদের কারণেই অনেকে বলেন, শেয়ারবাজারটা আজো অবিশ্বাসের কেন্দ্রস্থল। যা-ই হোক, বলছিলাম বিদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পণ্য বা সেবার বাজার ন্যায্যতা নিয়ে। কেন আমাদের অর্থনীতিতে কোনো বিদেশী ২-৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবেন, তিনি যদি পণ্য বা সেবা বেচতে না পারেন। আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজার এক অর্থে বড়, এক অর্থে ছোট। ভোগ্যপণ্য বিবেচনায় আমাদের বাজার বড় ।

আমাদের বাজার কি বড় প্রযুক্তি নির্ভর বিনিয়োগের মাধ্যমে তৈরিকৃত পণ্যের যথেষ্ট চাহিদা তৈরি করতে পারে? এক্ষেত্রেও বাধা অতিক্রম করা যায়। কিন্তু সত্য হলো, বাংলাদেশ সেই পথে কমই হাঁটছে। সেই পথ হলো অন্য বড় অর্থনীতির সঙ্গে জোটভুক্ত হওয়া। অন্য বড় অর্থনীতিতে আমরা যাতে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে উৎপাদিত পণ্য নিয়ে সহজে প্রবেশ করতে পারি, তার ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে নিজে কিছু অর্জন করেছে বলে মনে হয় না।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন রফতানির ক্ষেত্রে যে সুযোগ বাংলাদেশকে দিয়েছে, সেই একই সুযোগ তারা অন্য চল্লিশেরও অধিক স্বল্পোন্নত দেশগুলোরও (এলডিসি) দিয়েছে। বাংলাদেশ কোনো দেশ বা কোনো অর্থনৈতিক জোট থেকে আলাদা করে বাড়তি সুযোগ পাইনি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তো বাংলাদেশ বৈষম্যের শিকার! সে দেশের বাজারে গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশকে পণ্য রফতানি করতে হয়, যেটা অন্য অনেক এলডিসিভুক্ত দেশকে দিতে হয় না।

বাংলাদেশের বড় ব্যর্থতা হলো, বাংলাদেশ এযাবৎ একটিও দ্বিপক্ষীয় ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) সই করতে পারেনি। যেখানে ভিয়েতনাম বিশ্ববাণিজ্যের ক্ষেত্রে পরে যাত্রা করেও এক ডজনের বেশি এফটিএ সই করেছে। ভিয়েতনাম অতিদ্রুত বড় অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যেটা বাংলাদেশ পারেনি। বাংলাদেশকে সন্দেহ ও ইতস্ততা যেন পেছনে টেনে ধরে রেখেছে। না হলে এতদিনে তো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের সঙ্গে একটা এফটিএ বা রফতানির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রাপ্তির জন্য একটা চুক্তি সই হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তুরস্ক, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ এফটিএ করবে শুনেছি। শোনা পর্যন্তই।

বাস্তবে বাংলাদেশ কোনো এফটিএ সই করেনি। যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্ব বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরো উদারীকরণের পথ থেকে সরে গেছে। দেশটি এখন এক ধরনের সেই পুরনো ‘সংরক্ষণবাদ’ নীতি গ্রহণ করছে। ওই নীতি তাদের জন্য ক্ষতি হতে পারে, তবে সেটা তাদের ব্যাপার এবং সেটা তাদের জন্য মানায়ও। যুক্তরাষ্ট্র এখন যেটা চাইছে, তাহলো গ্লোবাল ট্রেড ইনভেস্টমেন্ট লিভারালাইজেশনের পথ থেকে সরে গিয়ে শুধু তাদের একনিষ্ট বন্ধুদের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করা।

‘সংরক্ষণবাদ’ একটা পুরনো ধারণা। সাধারণত এ ধরনের নীতি থেকে বিশ্বে যুদ্ধ-সংঘাত শুরু হয়। পুরনো ইতিহাস তাই বলে। এখন বিশ্ব যেদিকে এগোচ্ছে, তা হলো নিজদের পছন্দের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক জোট গঠন করা। সেই জোট দ্বিপক্ষীয় হতে পারে; আবার বহুপক্ষীয়ও হতে পারে। তবে বিশ্বের যেসব দেশ একবার এফটিএর সাধ পেয়েছে, আমার মনে হয় তারা এ এজেন্ডা নিয়ে সামনে এগোবে। তবে সেই এগোনোর ধরন আপাতত বদলে গেছে।

এখন বন্ধুদের মধ্যে জোট হতে পারে অর্থনৈতিক জোট শেষ পর্যন্ত সামরিক জোটের দিকে নিয়ে যায় অনেক দেশ! বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা এখন বড় হয়েছে। যত দিন অতি দরিদ্র ছিল, ততদিন আকাঙ্ক্ষাটাও ছোট ছিল। এখন বাংলাদেশ দুর্বলভাবে হলেও গ্লোবাল সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত। তবে এ যুক্ততাকে আরো প্রসারিত করে বিদেশীদের কাছে বার্তা দিতে হবে— তারা যদি এ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করে, তাহলে অন্য অর্থনীতিতে অবাধে পণ্য-সেবা বেচতে পারবে। আর সেই অবস্থায় বাংলাদেশ পৌঁছতে পারলেই কেবল দেশ থেকে পুঁজি পাচার অনেক কমে যাবে।

নিজেদের অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন রেখে আমরা পুঁজিকে যতই নিজ দেশে রাখতে চাই, রাখতে পারব না। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে আরো দুটো উপাদান গুরুত্বপূর্ণ— এক হলো ট্যাক্স রেট এবং কত ধরনের ট্যাক্স। এগুলো বিদেশীরা এমনকি স্বদেশীরাও দেখেন এজন্যই যে, তাদের উৎপাদন ব্যয় ও লাভ হিসাব করার জন্য। অন্য অনেক দেশে এমনকি এশিয়ার অনেক দেশেও ট্যাক্স হার বাংলাদেশের চেয়ে কম। বিশ্ব তখন ট্যাক্স কমানোর দৌড়ে নেমে পড়েছে। বাংলাদেশ কি দেয়ালের লেখাগুলো পড়ছে! আমরা আশা করি করপোরেট করহারকে হ্রাস করার একটা উদ্যোগ বাংলাদেশ হাতে নেবে।

বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে একটা সমস্যা হচ্ছে, যারা ট্যাক্স দিচ্ছে, তারা সবটাই দিচ্ছে। আর যারা দিচ্ছে না, তারা কিছুই দিচ্ছে না। যারা ট্যাক্স দিচ্ছে, রেয়াতি সুবিধা তাদেরকেই দেয়া উচিত। ট্যাক্স নীতির অন্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ট্যাক্স কমালে বা কোনো রকম ট্যাক্স হলিডে দিলে তার উপকারভোগী কারা হচ্ছে, তা দেখা। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে সামান্য ট্যাক্স কমালে তার উপকার পাবে হাজার হাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী। এমন কি কম ট্যাক্স হারে সরকারও বেশি রাজস্ব পাবে। আমরা আমাদের ট্যাক্স হারকে যদি প্রতিযোগিতামূলক না করি, তাহলে বিদেশী বিনিয়োগ লাভের ক্ষেত্রে এ ইস্যুটাও বাধা হয়ে রয়ে যাবে।

আশা করি, কর্তৃপক্ষ বৃহত্তর অর্থনৈতিক লাভের কথা বিবেচনা করে ট্যাক্স হারকে কমানোর পক্ষে অবস্থান নেবে। একটা কথা ইদানীং বেশ আলোচনা হচ্ছে, সেটা হচ্ছে একই আয়ের ওপর দুবার ট্যাক্স বসানো। জনগণ কোম্পানির শেয়ার কিনে যে মুনাফা বা ডিভিডেন্ড পায়, তার ওপর আবার আয়কর দিতে হয়। তারাই তো শেয়ারহোল্ডার হিসেবে করপোরেট ট্যাক্স প্রদানের মাধ্যমে একবার ট্যাক্স দিয়েছেই। কোম্পানির যে নিট আয় হয়েছে, সেটা তো শেয়ারহোল্ডাদেরই আয়। এবং সে নিট আয় থেকে রাজস্ব বোর্ড ২৫ শতাংশ, ক্ষেত্রবিশেষে ৪০-৪৫ শতাংশ ট্যাক্স নিয়েছে।

তারপর থেকে যাওয়া আয় থেকে বিনিয়োগকারীরা যে বণ্টিত মুনাফাটা পেল, তার ওপর আবার কেন ট্যাক্স দিতে হবে? কিন্তু বাস্তবতা হলো তারা দিয়েই যাচ্ছে। এ ব্যাপারে রাজস্ব বোর্ডের ব্যাখ্যা শুনতে পারলে ভালো হতো। একটা নীতি অন্তত এমন করা যেতে পারে, দেশের পুঁজিবাজারকে পুঁজি সংকটের জন্য ভালো উৎস হওয়ার লক্ষ্যে প্রণোদনা হিসেবে ডিভিডেন্ড আয়ের ওপর ট্যাক্স হার কমিয়ে ১০ শতাংশ বা এর নিচে নির্ধারণ করা উচিত। এতে অনেক লোক শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারে।

অন্য যে বিষয়টা বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অতি জরুরি, সেটা হলো বিরোধ মীমাংসার জন্য সহজ ও দ্রুত পদ্ধতি। বিদেশীরা যদি দেখেন আমাদের কোর্টে বিরোধ মীমাংসা হতে অনেক সময় নেয়, তাহলে তারা আমাদের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করতে উৎসাহ বোধ করবেন না। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাবিত করে, এমন উপাদানগুলো অন্য সব দেশে প্রায় একই। বাংলাদেশ দেখতে পারে অন্য দেশ এক্ষেত্রে কী করছে।

  • আবু আহমেদ। অর্থনীতিবিদ, অনারারি প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here