স্টাফ রিপোর্টার : ২০১৭ সালে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে গতি পেলেও চলতি বছরে পিছুটান নিয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। আর শেয়ার বিক্রিতে মূলধন তুলে নেওয়ায় বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ কমছে। মন্দাবস্থায় বাজারে ঢুকে এখন বিদেশিদের শেয়ার বিক্রি বেড়েছে। ডলারের দাম বৃদ্ধিতে বাজার প্রভাবিত হওয়ার শঙ্কায় শেয়ার বিক্রি বেড়েছে বলে মন্তব্য পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টদের।

তাদের মতে, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি পেলেও টাকার দাম অপরিবর্তিতই রয়েছে। কাজেই বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করে এখন আগের দামে ডলার কিনতে পারছে না। ডলারের দাম আরো বাড়লে লোকসান হওয়ার শঙ্কা করছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। পুঁজিবাজার স্থিতিশীল ও ডলারের দাম কমলে বিদেশিরা আবারও পুঁজিবাজারে আসবে বলেও মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।

ডিএসইর তথ্যানুযায়ী, জুন মাসে বিদেশিদের ১০৭২ কোটি টাকার শেয়ার হাতবদলে নিট বিনিয়োগ দাঁড়ায় ৩৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ জুনে বিদেশিরা শেয়ার বিক্রির চেয়ে কিনেছিল বেশি। জুলাই মাসে নিট বিনিয়োগ ছিল ২০০ কোটি, আগস্টে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, সেপ্টেম্বরে নিট বিনিয়োগ ছিল ১৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

২০১৮ সালের গত ৫ মাসের তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারি ও মার্চে পুঁজিবাজারে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর ফেব্রুয়ারি, এপ্রিল ও মে মাসে শেয়ার বিক্রি বেশি থাকায় নিট বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে কমে ৯৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা, আর এপ্রিলে ২৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা কমেছে।

সর্বশেষ গত মে মাসে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ কমেছে প্রায় তিন শ কোটি টাকা। মে মাসে বিদেশিদের মোট লেনদেন হয় ৯৬৬ কোটি টাকা। যার মধ্যে শেয়ার কিনেছে ৩৪১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা আর শেয়ার বিক্রি করেছে ৬২৪ কোটি ১৭ লাখ টাকার। সেই হিসাবে এই মাসে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ কমেছে ২৮২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, ব্যাংকে সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় সঞ্চয়ে সুদের হার বৃদ্ধি পাবে। আর এটি বাড়লে পুঁজিবাজারও প্রভাবিত হবে এমন শঙ্কা থেকেই বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করছে। শেয়ার বিক্রি করলেও তারা একদম বেরিয়ে যাচ্ছে না। স্থিতিশীল হলে তারা আবারও বাজারে আসবে।

বিদেশিদের শেয়ার বিক্রিতে পুঁজিবাজারের অস্থিতিশীলতা বেড়েছে। ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কমানোয় তারল্যপ্রবাহ কমার সংকট সিআরআর কমালেও কাটেনি। উচ্চ হারে আমানত সংগ্রহ করছে ব্যাংক।

এদিকে নিজেদের কিছু দাবিদাওয়া নিয়ে পুঁজিবাজার বিমুখ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কম্পানির লভ্যাংশে প্রত্যাশার প্রতিফলন না পাওয়ায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি করছে। আর সব পক্ষের শেয়ার বিক্রিতে অস্থির হয়ে উঠেছে পুঁজিবাজার।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্র জানিয়েছে, গত মে মাসে ২১ কার্যদিবসের মধ্যে ১৮ দিনই পতন ঘটেছে। আর তিন কার্যদিবস ঊর্ধ্বমুখিতায় সূচক বাড়ে ১১৭ পয়েন্ট আর সূচক কমেছে ৫১২ পয়েন্ট। অর্থাৎ মে মাসে ডিএসই থেকে সূচক কমে গেছে ৩৯৫ পয়েন্ট। আর বাজার মূলধন কমে প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা।

অক্টোবর থেকে পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির পরিমাণ বেশি। এতে শেয়ার হাতবদলের পরিমাণও কমেছে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত এক বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালের মে থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনাবেচা বা সক্রিয়তায় পুঁজিবাজার গতিশীল হয়। ২০১৭ সালের মে-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। ‘কম’ দামে কেনায় শেয়ার অক্টোবর থেকে বিক্রি করে মুনাফা তুললে নিট বিনিয়োগ কমে।

নভেম্বর ও ডিসেম্বরে শেয়ার কেনা বাড়ে। চলতি বছরের পাঁচ মাসের মধ্যে তিন মাসেই নিট বিনিয়োগ কমেছে। অর্থাৎ দেশের পুঁজিবাজার থেকে বিদেশিরা শেয়ার বিক্রি করে মূলধন তুলে নিচ্ছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারের ক্রমাগত নিম্নমুখিতায় কয়েকটি কারণের মধ্যে বিদেশিদের শেয়ার বিক্রি অন্যতম কারণ। পুঁজিবাজারে বিদেশিদের বিনিয়োগ দেশীয় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়িয়ে তোলে। আর তাদের (বিদেশি) শেয়ার বিক্রি বাড়লে দেশের বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি করতে থাকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here