বিদেশি ঋণের প্রতি দেশি উদ্যোক্তাদের ঝোঁক বেড়েছে

0
419

বিশেষ প্রতিনিধি : রেট অব ইন্টারেস্ট কম হওয়ায় বিদেশি ঋণের প্রতি দেশি উদ্যোক্তাদের ঝোঁক বেড়েছে। যে উৎস থেকে কম সুদে ঋণ পাওয়া যাবে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা সেখানে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক -ড. সালেহ উদ্দিন .ব্যাংকিং সেক্টরে সুদের অসম প্রতিযোগিতার কারণে বিদেশি ঋণে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে। যে কারণে ব্যাংকগুলোতে জমেছে অলস টাকার পাহাড়। ফলে দেশি ব্যাংকগুলো ব্যবসা হারাচ্ছে। তবে বিদেশি ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র মতে, এক সময় বিদেশ থেকে বেসরকারি খাতে ৫০০ টাকা ঋণ নেয়া বেশ কঠিন ছিল। দেশীয় ব্যাংকে তারল্য সঙ্কট ও বৈদেশিক মুদ্রা স্বল্পতার কারণে ২০১০ সাল থেকে বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেয়া সহজ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১১ সালে সেই সুযোগকে আরো বিস্তৃত করা হয়েছে। এখন আর দেশে বৈদেশিক মুদ্রা কিংবা টাকার সঙ্কট নেই। এরপরও একের পর এক বিদেশি ঋণ নিয়ে আসছেন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা। ফলে দেশি ব্যাংকগুলো ব্যবসা হারাচ্ছে। এমনিতেই বিনিয়োগের চাহিদা কম। এর ওপর বিদেশি উৎসের ঋণ বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে ব্যাংকিং খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১০-এর সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ২৮ হাজার কোটি টাকা ঋণের অনুমোদন দিয়েছে সরকারের এ-সংক্রান্ত বাছাই কমিটি। এর মধ্যে ২০১২ সালে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বিদেশি ঋণ নিয়েছেন দেশি উদ্যোক্তারা। আর ২০১১ সালে নিয়েছিলেন প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি খাতে ২৪ কোটি ৩৩ লাখ ডলারের (১ হাজার ৯৪৬ কোটি ৪ লাখ টাকা) বিদেশি ঋণ অনুমোদন করেছে এ-সংক্রান্ত বাছাই কমিটি। কমিটির ৮৩তম সভায় ১২টি প্রকল্পের জন্য এই ঋণ ছাড় করা হয়। এই ঋণের সুদের হার হবে লাইবর প্লাস সাড়ে চার শতাংশ। ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়েছে মেঘনা ঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্র লিমিটেডকে ৬ কোটি ৪৮ লাখ ডলার, সামিট বিনিয়ান-২ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডকে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার, সিয়েট কোম্পানি লিমিটেডকে ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার, এয়ারটেল বাংলাদেশকে ৫ কোটি ডলার, এডিভর ওয়েল লিমিটেডকে ৯০ লাখ ডলার, ইউনাইটেড আশুগঞ্জ লিমিটেডকে ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার, গ্লোবাল এটিরেল লিমিটেডকে ৯৬ লাখ ৪০ হাজার ডলার, নিপনন পয়েন্ট বাংলাদেশ লিমিটেডকে ৪৬ লাখ ডলার, দেশ এনার্জি লিমিটেডকে ১ কোটি ৪ হাজার ডলার। এ ছাড়া আরো অনেক প্রকল্পে বিদেশি ঋণ অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে কমিটির ৮৩তম বৈঠকে জানানো হয়।

অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বৈদেশিক উৎস থেকে পাওয়া ঋণের সুদহার আপাতদৃষ্টিতে কম ও সাশ্রয়ী মনে হলেও বাস্তবে সুদের কার্যকর হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, এসব ঋণের সুদ নির্ধারণ হয় বাজার রেটের ওপর ভিত্তি করে। আর আসলসহ সুদ পরিশোধ করতে হবে বৈদেশিক মুদ্রায়। ফলে এই ঋণ বেশি হলে রিজার্ভ তথা দেশের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এসব কারণে উদ্যোক্তাদের ঋণের ওপর পুরোপুরি ঝুঁকে পড়া ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ যায়যায়দিনকে বলেন, আমার মনে হয়, রেট অব ইন্টারেস্ট কম হওয়ায় বিদেশি ঋণের প্রতি দেশি উদ্যোক্তাদের ঝোঁক বেড়েছে। তবে যে উৎস থেকে কম সুদে ঋণ পাওয়া যাবে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা সেখানে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক। তবে এই ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আছে কিনা সেটিও দেখা উচিত। যেসব উদ্যোক্তার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষমতা আছে, তারা এসব ঋণ নিলে ক্ষতি নেই। কারণ, তাদের রিজার্ভের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না। কিন্তু যাদের এই ক্ষমতা নেই, তাদের এই ঋণের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়া ঠিক হবে না। কারণ, বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করেই তাকে এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে। বাজার থেকে ডলার কিনে ঋণ পরিশোধ করলে তার চাপ শেষমেষ রিজার্ভের ওপর গিয়েই পড়বে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে বা পরিশোধ পিরিয়ডে এসব ঋণের সুদহার বাড়তে পারে এমন আশঙ্কাও রয়েছে। কারণ, ডলারের দাম তথা বিনিময় হারও স্থিতিশীল নয়। ডলারের দাম বেড়ে গেলে সুদের হারও বেড়ে যাবে। এসব কারণে উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বিবেচনা করেই বিদেশি ঋণের ওপর ঝোঁকার পরামর্শ দেন তিনি। শুধু তাই নয়, বিনিয়োগ বোর্ডকেও এই ঋণ অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা আছে কিনা, তা যাচাই করে দেখা উচিত। তার মতে, বিদেশিদের ওপর যতটা সম্ভব নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশি সম্পদ ও সঞ্চয়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। বিদেশি ঋণের সাশ্রয়ী সুদহার দেশি সুদহার কমাতে কতটুকু সহায়ক হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর প্রভাবে ব্যাংকের সুদহার কমার কথা। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এরকম লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

একই প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যায়যায়দিনকে বলেন, দেশি ঋণের চেয়ে বিদেশি ঋণ অনেক নমনীয় বা ঋণের সুদের হার কম তাই উদ্যোক্তারা বিদেশি ঋণের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। আমাদের দেশে যেখানে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৫-২০ শতাংশ, সেখানে বিদেশি ঋণের সুদের হার সাধারণত ৩-৪ শতাংশের ঘরে থাকে। স্বভাবতই কম সুদের দিকে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বেশি থাকবে। তবে এর ঝুঁকিও রয়েছে। যেহেতু এই ঋণ বৈদেশিক মুদ্রায় নিতে হয়, তাই মুদ্রার মান বাড়া-কমার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। আবার সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে ফোর্সড ঋণ বেড়ে যাবে। তখন তা উদ্যোক্তার জন্য লাভজনক নাও হতে পারে।
তিনি আরো বলেন, উদ্যোক্তারা চাইলেও বিদেশি লোন নিতে পারে না। এ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। তারা যাচাই-বাছাই করে ঋণের অনুমোদন দেয়। তবে বিদেশি ঋণ বা বিনিয়োগ সে অর্থে বাড়ছে না বলে মত দিয়ে তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে দেশের যে পরিস্থিতি ছিল তাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সে অর্থে ছিল না বললেই চলে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা এ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। আশা করা যায়, আগামী ২-১ মাসের মধ্যে দেশের পরিস্থিতি আরো বিনিয়োগানুকুল হয়ে উঠবে। তখন দেশি ব্যাংক থেকেও বিনিয়োগ বাড়বে।
এ বিষয়ে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দেশে এখন তারল্য সঙ্কট নেই। তাই বিদেশি ঋণেরও প্রয়োজন নেই। ব্যাংকগুলোতে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকার মতো তারল্য রয়েছে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় আমাদের মুনাফা কমে যাচ্ছে। এর ওপর বিদেশি ঋণ দেশি ব্যাংকগুলোকে আরো চাপে ফেলবে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত বিদেশি ঋণের সর্বোচ্চসীমা নির্ধারণ করা। তিনি বলেন, বিদেশি ঋণের সুদহার কম বলে (৫ থেকে ৬ শতাংশ) উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বেশি। তবে ঝুঁকিও আছে। যথাসময় ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ফোর্সড ঋণ বেড়ে যাবে। এ জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করে, সেসব প্রতিষ্ঠানকে বিদেশি ঋণ অনুমোদন দেয়া উচিত।
এদিকে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি এফবিসিসিআই আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বিদেশের বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নেয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। দেশের তুলনায় বিদেশে সুদহার কম হওয়ায় সে ঋণ নিতে বলেন তিনি। এফবিসিসিআইয়ের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা ব্যাংক ঋণের সুদ কমানোর দাবি জানালে এরই পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রী এই পরামর্শ দেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here