বিক্রি হচ্ছে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক

0
3537

বিশেষ প্রতিনিধি : আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের শেয়ার হস্তান্তরে আদালতের আর নিষেধাজ্ঞা নেই। ফাউন্ডার ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডও মামলা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। এতে ব্যাংকটি বিক্রির সব আইনি বাধা কাটল। ব্যাংকটির মূল প্রতিষ্ঠান আইসিবি ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপ হোল্ডিং এখন ব্যাংকটি বিক্রি করতে পারবে।

এদিকে ব্যাংকটি কিনতে আইসিবি গ্রুপকে সামিট গ্রুপ যে ১০ মিলিয়ন ডলার অগ্রিম দিয়েছিল, তা ফেরত নিয়েছে। ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) ব্যাংকটি কেনার ব্যাপারে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিলেও আর্থিক ভিত্তি দুর্বল থাকায় এখনো তা চূড়ান্ত করতে পারেনি। ফলে ব্যাংকটি কিনতে নতুন করে ক্রেতা খুঁজছে আইসিবি গ্রুপ।

ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে বেশি শেয়ার ধারণ করায় ফাউন্ডার ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ শেয়ার বাজেয়াপ্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফাউন্ডার ইন্টারন্যাশনাল ২০১০ সালে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট আবেদন করে। আদালত ফাউন্ডার ইন্টারন্যাশনালের কাছে শেয়ার কেনার অর্থের উত্স ও বাংলাদেশে অর্থ আনার প্রমাণপত্র চাইলে আইনজীবীরা তা সরবরাহ করতে পারেননি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ জানুয়ারি বিচারপতি কাজী রেজা উল হক ও বিচারপতি এবিএম আলতাফ হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে আবেদনটি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

ফাউন্ডার ইন্টারন্যাশনালের আইনজীবী আহসানুল করিম  বলেন, আমি যে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আবেদন করেছিলাম তার আবেদন করার যোগ্যতা নেই। এ কারণে আবেদনটি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। আবেদনটি উচ্চ আদালতে যাওয়ার সম্ভাবনাও নেই।

মামলায় আইসিবি গ্রুপের পক্ষের আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম (অ্যাটর্নি জেনারেল)। তিনি বলেন, ব্যাংকটির শেয়ার হস্তান্তরে কোনো বাধা নেই। এছাড়া শেয়ার বাজেয়াপ্তের বিরুদ্ধে করা আবেদনও প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। ফলে যেকোনো সময় ব্যাংকটি বিক্রি হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ওরিয়ন গ্রুপের কর্ণধার ওবায়দুল করিম ও কয়েকজন পরিচালকের নিকটাত্মীয় ওরিয়েন্টাল ব্যাংক থেকে ৫৯৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকটির পর্ষদ বাতিল ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ করে ২০০৬ সালের ১৯ জুন ওরিয়েন্টাল ব্যাংক অধিগ্রহণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালের ২ আগস্ট ব্যাংকটি পুনর্গঠনের জন্য দি ওরিয়েন্টাল ব্যাংক পুনর্গঠন স্কিম ২০০৭ প্রণয়ন করা হয়। স্কিমে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ৭০০ কোটি ও অনুমোদিত মূলধন ১ হাজার কোটি নির্ধারণ করা হয়। ব্যাংকটি বিক্রির জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করলে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আইসিবি ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপ হোল্ডিং এজি ৫২ দশমিক ৭৬ শতাংশ শেয়ার কিনে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। ২০০৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে গ্রুপটির শেয়ার ক্রয়-বিক্রির চুক্তি হয় এবং ২০০৮ সালের ৫ মে ব্যাংকটি ব্যবসা চালুর অনুমতি পায়। এ সময় ব্যাংকটির নামকরণ করা হয় আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক।

অর্থ আত্মসাতের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে বেরিয়ে আসে, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৯৯১-এর ১৪ ক(১) ধারা লঙ্ঘন করে ওরিয়ন গ্রুপের কর্ণধার ওবায়দুল করিম ও বেঙ্গল গ্রুপের আবুল খায়ের লিটু ৮৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ শেয়ার ধারণ করেন। পরে তা বাজেয়াপ্ত করা হয়। ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৪(ক) ধারায় বলা আছে, কোনো পরিবার বা ব্যক্তি বা কোনো কোম্পানি অন্য কোনো কোম্পানিতে মোট শেয়ারের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিক হতে পারবে না। এর মধ্যে ওবায়দুল করিমের পরিবার ও তাদের মালিকানাধীন চারটি প্রতিষ্ঠান ৬৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ ধারণ করে। এর মধ্যে চার বিদেশী প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে ৩৪ দশমিক ৪৪ ধারণ করে, যা বাজেয়াপ্ত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে ফাউন্ডার ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের শেয়ার ৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ বা ৪৫ হাজার।

মামলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে আজমালুল হোসেন কিউসি, এবিএম সিদ্দিকুর রহমান খান ও সাইফুল্লাহ মামুন, ফাউন্ডার ইন্টারন্যাশনালের পক্ষে আহসানুল করিম ও আইসিবি গ্রুপের পক্ষে মাহবুবে আলম (বর্তমানে অ্যাটর্নি জেনারেল) ও একরামুল হক অংশগ্রহণ করেন।

জানা গেছে, ৩৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ শেয়ার ধারণকারী চার প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডার ইন্টারন্যাশনাল, সান অ্যাসেন্ট হোল্ডিং, অনব্রাইট করপোরেশন ও ঈগল ওয়ে ইনভেস্টমেন্ট গঠন করা হয় একই দিনে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ঠিকানাও এক। একটি দেশে চালুর নিয়ম থাকলেও প্রতিষ্ঠান চারটি একই সঙ্গে হংকং ও সিঙ্গাপুরে চালু দেখানো হয়। সিঙ্গাপুরে ২০০৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর ফাউন্ডার ইন্টারন্যাশনাল বিলুপ্ত হয়ে যায়। বিলুপ্ত হয় হংকংয়েও। কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়ায় প্রতিষ্ঠানটি মামলার অধিকার হারায়। এসব কারণে আইনজীবীরা আবেদন প্রত্যাহার করে নেয়।

আইসিবি গ্রুপ ব্যাংকটি বিক্রির জন্য বাংলাদেশের কয়েকটি গ্রুপের সঙ্গে চিঠি চালাচালি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংককেও ব্যাংকটি বিক্রির মনোভাবের কথা জানিয়েছে। তবে নতুন করে কেউ ব্যাংকটি কেনার ব্যাপারে আগ্রহী হচ্ছে না। বাংলাদেশের সামিট গ্রুপ ব্যাংকটি কিনতে ১০ মিলিয়ন ডলার অগ্রিম দিলেও তা এরই মধ্যে ফেরত নিয়েছে।

এ বিষয়ে সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খান বলেন, বাংলাদেশে এখন অনেক বেশি ব্যাংক হয়েছে। তাই ব্যাংক কেনার পরিকল্পনা আমাদের নেই। ব্যাংক কিনতে আমাদের বিনিয়োগ করা অর্থও ফেরত নেয়া হয়েছে।

এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আইসিবি এটি কেনার ব্যাপারে গত বছর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে ব্যাংকটির দায়-দেনা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনার পর। বর্তমানে ব্যাংকটির সিংহভাগ শেয়ারের মালিক (৫২ দশমিক ৭৬ শতাংশ) আইসিবি ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপ হোল্ডিং সব শেয়ার বিক্রি করতে চায়। কয়েক দফা আলোচনার পর প্রতিটি শেয়ার আট টাকা মূল্যে বিক্রির ব্যাপারে তারা রাজি হয়েছে বলে জানা গেছে। গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের এ শেয়ারটি সর্বশে৬ টাকা ২০ পয়সায় লেনদেন হয়।

এ প্রসঙ্গে আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এসএম মাহফুজুর রহমান বলেন, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক কেনার একটি প্রস্তাব এসেছে। ব্যাংকটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এতে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। ব্যাংকটির দায় ও সম্পদ যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, এখানে বিনিয়োগ লাভজনক কিনা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here